টানা-পোড়েনের-তাঁত-তত্ত্ব-weaving-life-tat-tati-x-bfa-x-fxyz

টানা-পোড়েনের তাঁত তত্ত্ব

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সবচেয়ে আদি উৎস হচ্ছে তাঁত। তাঁতের সুতোয় বোনা আছে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের ফ্যাশন।

তাঁতের কথা, তাঁতীর কথা

তাঁতশিল্পের একটি পণ্য, অর্থাৎ তাঁতের সুতি শাড়িকেই বেশিরভাগ মানুষ তাঁতের কাপড় বলে জানলেও এ শিল্পের রয়েছে বহু ভিন্নতা, বহু বাহারি পণ্যের পসরা। এসব বস্ত্রের মধ্যে রয়েছে দেবদাস, জরিপাড়, ইক্কাত, মণিপুরি, কটকি, কুমকুম, নীলাম্বরী, সানন্দা, গ্রামীণ চেকসহ আরো অনেক ধরনের কাপড়। এমনকি শুধু কাপড়ই নয়, তাঁতে বোনা হয় কম্বল, কার্পেট। নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তাঁতে বোনা পাপোশও রয়েছে। সবটাই নির্ভর করে তাঁতীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার উপর। তাঁতে কাপড় বা অন্য পণ্য বোনার বিষয়টি বেশ জটিল। একটু ভুল হলেই পুরোটা গোলমাল। তাঁতে সাধারণত লম্বা করে টানটান করে রাখা সুতার মধ্য দিয়ে আড়াআড়ি বা আনুভূমিক সুতা প্রবেশ করিয়ে কাপড় তৈরি করতে হয়। লম্বালম্বি সুতোগুলোকে বলা হয় ‘টানা’, আর এর মধ্য দিয়ে প্রবেশ করানো আড়াআড়ি সুতোগুলোর নাম ‘পোড়েন’।

একেকটি তাঁতের শাড়ির দাম সাধারণত চারশো থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে ফ্যাশন হাউজগুলো যখন তাঁতীদের কাছ থেকে অনেকটা কম দামে শাড়ি নিয়ে আসেন, ঝলমলে শো-রুমে অন্যান্য হরেক পণ্যের মতো দাম বেড়ে যায় তাঁতের শাড়িরও। এছাড়া ঢালাওভাবে বাণিজ্যিকীকরণের জন্য অনেকসময় তাঁতের সেই আদি রূপটি কিছুটা হলেও হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। কিন্তু এই বদলটাও সময়েরই প্রয়োজন বলে তাঁতী, বিক্রেতা ও ক্রেতা– সব পক্ষই মেনে নেয়।

একসময় যেমন শুধু হাতে চালানো তাঁতই ছিল এ শিল্পের কারিগরি। পরবর্তীতে তাতে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম তাঁতের ব্যবহার। হস্তচালিত এবং পাওয়ারলুম– এই দুই ধরনের সমন্বয়ে তাঁতশিল্প আরো বেশি বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছেএবং আধুনিক পোশাক চাহিদার সাথেও তাল মেলাতে পেরেছে। অন্য যেকোনো শিল্পের মতোই তাঁতশিল্প যত সামনে এগিয়েছে, তত এতে সময়ের সাথে সাথে এসেছে পরিবর্তন। যোগ হয়েছে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য। যেমন আগেরকার তাঁতীরা শাড়ির পাড়ে ব্যবহার করতেন মাধবীলতা, তেরবী, মরবী, লতাপাতা, পদ্মপাড়, কুঞ্জলতা ইত্যাদি নকশা। এখন সেগুলো প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। এখন তাঁতের পাড়েও যোগ হয় অধুনা সব উপাদান, রঙ ও নকশার সংযোজন। তবে এখনো বহাল আছে তাঁতের শাড়িতে ফুল, লতাপাতা, পাখি ইত্যাদি সব প্রাকৃতিক উপাদান। প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই তাঁতীরা এ নকশা বুনে আসছেন বছরের পর বছর ধরে।

কিন্তু তাঁতের কদর অনেক বেশি বেড়েও তাঁতীদের সুদিন খুব একটা ফেরেনি। তারা অনেকেই তাঁত চালানোর পাশাপাশিও রিকশা-ভ্যান চালানোর মতো পেশায়ও যুক্ত হচ্ছেন। মূল্যমান হোক বা সম্মান, কোনোটাতেই তাঁতীদের পাল্লা ভারি হয় না। ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের প্রকোপে অনেক তাঁতীর ঘরেই চুলা জ্বলেনি। অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা এখন অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন, কমে যাচ্ছে তাঁত ও তাঁতীর সংখ্যা। যারা টিকে আছেন, তারা হস্তচালিত তাঁতের জায়গায় চেষ্টা করছেন পাওয়ারলুম তাঁত ক্রয়ের। এতে উৎপাদনের হার অন্তত বৃদ্ধি পায়। ‘টানা’ আর ‘পোড়েন’-এর মাঝে ভারসাম্য রাখতে রাখতে তাঁতীদের জীবন কেটে যায় নিজস্ব টানা-পোড়েনে, যার ভারসাম্য রক্ষা তাঁতের সুতা বোনার চেয়েও বহুগুণ কঠিন।

আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের ফ্যাশন।

পরনের আরাম

সম্প্রতি টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেল। এতে করে তাঁতশিল্পের আরেকটা নব উত্থান যে ঘটতে যাচ্ছে, সে আশা করাই যায়। এবারকার ঈদ ফ্যাশনেও তাঁতের শাড়ির বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি বাজারকে করে রেখেছে আমেজপূর্ণ।

গরমকালে তাঁতের সুতি কাপড়ের মতো আরাম আর কিছুতে হয় না। শুধু শাড়ি নয়, তাঁতের ওড়না, কুর্তি, ফতুয়া, টপস ইত্যাদি পরে আরামসে সারাদিন কাটিয়ে দেয়া যায়। নিত্যদিনের পোশাক হিসেবে তাঁতের আবেদন কখনোই কমে না। চাহিদা মোতাবেক তাঁতের মতো প্রাচীন সব দেশীয় শিল্পের আদিরূপ থেকে কিছুটা বেরিয়ে নিজের মতো করে ব্যবহার করতে শিখলেই দেশী পণ্যের মান বাড়বে, নিজেদের শিকড়ের সাথে সংযোগটাও থেকে যাবে বহাল তবিয়তে।

ছবিসূত্র: Khut খুঁত
খুঁতের শাড়ি কিনতে পারেন এই লিংকে 

চলনের ফ্যাশন
.
.

তাঁতশিল্পের আরেকটি অনেকটা হাল জমানার পছন্দের পোশাক হচ্ছে জুম বা কোটা শাড়ি। এই শাড়ি পুরোপুরি দেশীয় বলা যায় না, তবে তৈরির পদ্ধতিটা সেই আমাদের চিরচেনা তাঁতকলের। এতে ব্যবহৃত সুতা আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। সুতা রপ্তানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে কোরিয়া। এই শাড়ি যেকোনো ঋতুতেই অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য দেয়, আর সেইসাথে এর ফ্যাশনেবল চেহারা তো রয়েছেই। শহুরে নারীদের মধ্যে জুম শাড়ির জনপ্রিয়তা বেশ তুঙ্গে।

আরও পড়ুন

চায়ের দেশ সিলেটের শ্রীমঙ্গলে জুম শাড়ি পাওয়া যায় বধ্যভূমির বিক্রয় কর্নারে। ঘুরতে গেলে তাই দুয়েকটা জুম শাড়িও জুটতে পারে খরিদ্দারির তালিকায়। মণিপুরি শাড়ির জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চল। এখান থেকে পাইকারি দরে শাড়ি কিনে এনে অনেকেই ব্যবসা করেন। মজার বিষয় হচ্ছে, অন্যান্য তাঁতের শাড়িতে অনেক বদল দেখা গেলেও মণিপুরি শাড়ির নকশা কখনো বদলাতে দেখা যায়নি। সেই নানী-দাদি কিংবা মা-খালারা যে শাড়ি খায়েশ করে পরতেন, আমাদের প্রজন্মের কাছেও তা একইভাবে বিশেষ– একই রূপের জন্য বিশেষ। এ শাড়ির সবচেয়ে লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, শাড়ির জমিন যে ধরনের রঙেরই হোক না কেন পাড় হবে একেবারে গাঢ় রঙের। এবং পাড়ে থাকা নকশার ধরন হয় জ্যামিতিক– ত্রিভুজাকৃতির। ভেতরের জমিনে জ্যামিতির সাথে কখনো কখনো দেখা মেলে ফুল, লতাপাতারও। উৎসব আনন্দ হোক বা দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারে– মণিপুরি শাড়ি নারীমহলে ভীষণ জনপ্রিয় একটি তাঁতের শাড়ি।

টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি

টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি

TANGAIL SAREE

তাঁতশিল্প বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো কুটিরশিল্প। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি তারই ঐতিহ্য বহন করে। টাঙ্গাইলের দক্ষ কারিগররা তাদের বংশ পরম্পরায় তৈরি করছেন এ শাড়ি। 


March 9, 2024
Khadi-Weaving-খাদি-পুরাণ-x-bfa-x-fxyz-web

খাদি পুরাণ

ANINDETA CHOWDHURY
দেখতে যেন বাঙালির অন্দরমহলের মতোই। সিদেসাধা, আটপৌরে– তবু একটা মায়া লেগে আছে এর প্রতিটি কোণে।…
March 9, 2024

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

আপনার একটি শেয়ার আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা

X (Twitter)
Post on X
Pinterest
fb-share-icon
Instagram
FbMessenger
Open chat
1
Scan the code
Hello
How can i help you?
Skip to content