পোশাক কি কেবলই পোশাক?

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম জাহান

পোশাক কি কেবলই পোশাক?

Spread the love
  • 4
    Shares

পোশাক কি কেবলই পোশাক? আমার ছোটবেলায় আমার পিতামহ একটি কথা প্রায়ই বলতেন,’আপ রুচি খানা, পর্ রুচি পহেন না’। এটা বলেই তিনি এর বাংলা করতেন,

‘নিজের রুচি অনুসারে খাবে, তবে পরবে কিন্তু অন্যের রুচি অনুযায়ী।

একটু গভীরে গিয়ে তলিয়ে দেখলে এর ব্যাখ্যা দাঁড়ায়, ‘খাবার ব্যাপারে পছন্দটি নিজস্ব, কিন্তু পোশাকের ব্যাপারে পছন্দটি আরোপিত’।

প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, এই ‘আরোপটি’ কে করেন? নানান সময়ে ব্যক্তি, কোন কোন ক্ষেত্রে সমাজ, কখনও কখনও সংস্কৃতি এবং ক্ষেত্র বিশেষে ধর্ম। এই যেমন, বিয়ের পর পরই আমার এক বন্ধু তাঁর নব বিবাহিতা বধূকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তুমি কিন্তু আর হাতাকাটা ব্লাউজ পরতে পারবে না’।

আমার এক বুবু বিধবা হন মাত্র ২৭ বছর বয়েসে। তাঁর ওপরে সমাজের অনুশাসন ছিল, ‘রঙ্গীন শাড়ী পরা চলবে না’। এ জাতীয় অনুশাসনের সবটাই অবশ্য নারীর ওপরেই পড়ে, কারন পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরুষেরাই আইন ও অনুশাসনের হর্তা-কর্তা। তা নইলে হয়তো বিপত্নীক পুরুষদের ওপরে অনুশাসন থাকতো যে, ‘স্ত্রী বিয়োগের পরে তাঁদের বাটিছাঁট দিতে হবে, লন্বা কেশদাম পরিত্যাজ্য’।

আমার এক সময়কার সহকর্মী ছিলেন পল ল্যাড – সুদর্শন, সুঠামদেহী। তাঁকে একদিন বলেছিলাম, ‘কিল্ট পরলে তোমাকে যা মানাবে না!’ আমার সে কথায় পল মোটেই প্রীত হয় নি, বরং গম্ভীর মুখে আমাকে বলেছিল, ‘আমি ওয়েলশ, স্কট নই’। অর্থাৎ আমাকে সে মনে করিয়ে দিল যে, কিল্ট স্কটিশ সংস্কৃতির পোশাক, ওয়েলসের নয়।

কট্রর ইহুদীদের পরিধেয় দেখেছেন? নারী পুরুষ নির্বিশেষে তা আরোপিত হয়েছে তাঁদের ধর্মদ্বারা। শুনেছি, কট্টর ইহুদী পুরুষদের কালো বেকাশে, কিপাহ্, জিটজিট পরিধানের নির্দেশ এসেছে তোরাহ্ থেকে। মহিলাদের মিটফাহ্যাট, ব্যারেট, শেইটাল পরার অনুশাসনও ধর্ম-উদ্ভূত।

আরোপিত কোন জিনিসই স্বার্থবিহীন, গূঢ়উদ্দেশ্যবিহীন, নির্দোষ একটি প্রক্রিয়া হতে পারে না। আরোপিত জিনিষের পেছনে একটি স্বার্থ-উৎসারিত বক্তব্য থাকে। পোশাকও তার ব্যতয় নয়।

প্রতিটি পোশাক ও তার আনুসঙ্গিকের পেছনেও তাই একটি বক্তব্য থাকে। তাই পুরুষেরা যখন পাঞ্জাবীর সঙ্গে সোনার বোতাম পরেন, তখন তাঁর পোশাক ও তার আনুসাঙ্গিক বক্তব্য দেয় যে উক্ত ব্যক্তিটি বিত্তবান। একজন মানুষ যখন পৈতে পরেন, তখন তা যে বক্তব্য দেয় যে তিনি একজন বর্ণহিন্দু এবং অন্য শ্রেণীর হিন্দুরা তার চেয়ে নিম্নস্তরের।

ধর্মীয় বহু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অধিকার শুধু তাঁর আছে্য বৌদ্ধ ভিক্ষুদের গেরুয়া বসনের প্রদেয় বক্তব্যটি হচ্ছে, তাঁরা ঈশ্বরের প্রতিনিধি এবং তাই শ্রদ্ধেয়। পোশাকের বক্তব্য যে শুধু সাধারন বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তা কিন্তু নয়। কখনও কখনও তা রাজনৈতিক বক্তব্য হয়ে ওঠে এবং কখনও কখনও তা বক্তব্য হয়ে ওঠে ধর্মীয় বিভাজন ও ধর্মান্ধতারও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যখন নাজী সৈন্যেরা বিশেষ পোশাক-আনুসঙ্গিক ব্যবহার করতে, তার মূল উদ্দেশ্যমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল: জাতিগত কৌলীন্যের দিক থেকে জার্মান জাতি বিশুদ্ধতম রক্তের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। মহাত্মা গান্ধী যে কৌপীন পরিধান করতেন, তার পেছনেও একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল। সে বক্তব্যটি হচ্ছে, যেখানে ভারতবর্ষের কোটি কোটি মানুষ দরিদ্র, বঞ্চিত, নিরন্ন এবং বস্ত্রহীন, সেখানে তাঁদের সঙ্গে একাত্ম হতে হলে তাঁদের মতোই কাপড় পরতে হবে, তাঁদের মতোই জীবনযাপন করতে হবে – ঐশ্বর্যময় জীবন সেখানে পরিত্যাজ্য।

ধর্মীয় বিভাজন চিহ্নিতকরণেও পোশাকের বক্তব্য আছে। ধুতি পরা মানুষ দেখলেই আমরা ভাবি যে তিনি হিন্দু। পাগড়ী ভিন্ন শিখদের কল্পনা করা যায় না। আচকান পরলে ভাবি, মুসলমান না হয়ে যাবেন কোথা?

পোশাক কি কেবলই পোশাক?

শেষের কথা বলি। পোশাককে যারা শুধু চল বা কেতাদুরস্ততা বলে মনে করেন, সেটা বড়ই সরলীকৃত একটি ভাবনা। পোশাক একটি জোরালো বক্তব্য এবং কখনো কখনো একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক বক্তব্যও বটে।

দ্বিতীয়ত: পোশাক নির্বাচনে নিজস্ব স্বাধীনতার কথা যারা বলেন, তারা ভুলে যান যে, সে বাছাইয়ের চয়নের ক্ষেত্রটি আগেই সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে আরোপিত বোধ, বিশ্বাস, ও ধ্যান-ধারণা দিয়ে। সে ক্ষেত্রে আপাত-স্বাধীনতাকে প্রকৃত বা কার্যকর স্বাধীনতা বলে ভুল করা কোন বুদ্ধির কাজ নয়।

মরীচিকা কখনও মরুদ্যান নয়।


লেখকের facebook থেকে নেয়া :

মন্তব্য করেন | 

Nurunnabi Alamতথ্যবহুল চমৎকার লেখা। স্যার, আপনার লেখায় মাদকতা থাকে।পাঠককে শেষ অবধি টেনে নিয়ে যায়।

Mohammad Rabiপোষাক নিয়ে সুন্দর চমৎকার এক বিশ্লেষণ! যদিও সাধারণ মানুষকে নিয়ে! পোষাক যেমন গোত্র বা ধর্মকে প্রকাশ করে, আবার একটি শ্রেণীরও প্রকাশক হয়ে উঠে! প্রফেশনাল শ্রেণি! যেমন সেনাবাহিনী বা পুলিশবাহিনী বা সিকিউরিটি গার্ড বা স্কুলের ছাত্রছাত্রী! হিপ্পিদের পোশাকআশাক দেখে আমরা চিনতে পারি! আবার দেশ বা জাতিকেও উপস্থাপন করে! পোষাক দেখে আমরা বুঝতে পারি কারা মিডলইস্ট গালফের মানুষ! আর যুগযুগ থেকে এ পর্যন্ত ফ্যাশন পোষাকের ব্যাপারটা তো আরো চমৎকৃত করেছে! আর এর লালন করে বেশিরভাগ তরুণ, ভাল লাগুক আর নাই লাগুক!ধন্যবাদ!

Quazi Mahmudur Rahmanআদিতে প্রবাদ ছিল বামুন চেনা যায় তার পৈতা দিয়ে। এখন দল ও দেশপ্রেমিক চেনা হয় মুজিব কোট দিয়ে।

Masud Zaman‘পোশাক একটি জোরালো বক্তব্য এবং কখনো কখনো একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক বক্তব্য বটে’ কথা গুলি বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের সামাজিক জীবনে একেবারে খাঁটি সত্য উপলব্ধি।

Nilufar Momtazবাহ্ এভাবে কখনও ভাবিনি, এতটা তলিয়ে দেখিনি। আপনার প্রতিটি লেখাই একেকটা চমক দিয়ে যায়..! অসাধারন উপলব্ধি, দিন দিন তাই আপনার লেখার ভক্ত হয়ে যাচ্ছি..!ভালো থাকবেন, শুভকামনা রইলো।

Shamsul Alamআপনার প্রতিটি লেখাই ভাবিয়ে তোলে ভাই ।পোশাক অনেক ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে কালচারকে পরিবর্তন করার মানসিকতা কাজ করে।আমাদের মা খালাদের দেখতাম শাড়ি পড়েই চলাফেরা করতে সাচ্ছধ্য বোধ করত।বিশেষ কোনো কারণে কোথাও যেতে হলে এবং জনসমাগম থাকলে হাতে একটি বোরখা নিত।পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিধান করত।হঠাত্ করে হিজাব ও সেলোয়ার কামিজের প্রচলন।কোত্থেকে আসল ? চিন্তার বিষয় ।অবশ্য সেলোয়ার কামিজও কিছু বয়সের জন্য প্রচলন ছিল।এখনকার মত সবাইকে পড়তে দেখিনি।

Mostofa Amin Tonuতাহলে কি স্যার প্রকৃত স্বাধীনতা বলে কিছু নেই? আর আমরা কি সব সময়ই অন্যের বা সমাজের চিন্তা, চেতনা, ভাবনার কাছে পরাধীন?

Giasuddin Talukderস্যার,পোশাক নির্ধারণ যে আরোপিত-এ ধরণের মূল্যবান লেখা এই প্রথম পড়লাম।বয়স হলে যে রঙিণ পোশাক বা টি-শার্ট (হোক পুরুষ বা মহিলা) পড়া যায় না–সেটাও সমাজ, সংস্কৃতি,ধর্ম দ্বারা ক্ষেত্র বিশেষ আরোপিত।

Zinaida Irfatঅনেক ছেলেমেয়েই তো আজকাল পশ্চিমা পোষাক পরিধান করছে,তাদের উপর আরোপিত মূল্যবোধ,বিশ্বাস কি সীমাবদ্ধ ছিল না?কোন কোন ক্ষেত্রে আবহাওয়া,পরিবেশ,আর্থিক অবস্থাও কিন্তু পোষাক নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেয় বলে আমার মনে হয়।


Spread the love
  • 4
    Shares

Leave a Reply

%d bloggers like this: