দরিয়া ই নূর হীরা Daria-i-Noor sea of Light x bfa x fxyz

কোথায় আছে ঢাকার নবাব পরিবারের দরিয়া-ই-নূর?

১১৭ বছর পর প্যাকেট খোলার উদ্যোগ

দরিয়া-ই-নূর

Daria-i-Noor

—ফারসি এই নামের অর্থ “আলোর সমুদ্র”
২৬ ক্যারেটের এই টেবিল-কাট হীরাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত মূল্যবান রত্নগুলোর একটি।

মুঘলদের রত্নভান্ডার নিয়ে আমাদের দীর্ঘ আলোচনায় আমরা দেখেছি—একটি রত্ন কখনো শুধু একটি পাথর নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাজদরবার, ক্ষমতা, শিল্প, বাণিজ্য আর মানুষের ইতিহাস।

দরিয়া-ই-নূর সেই গল্পেরই বাংলাদেশের একটি অধ্যায়।

২৬ ক্যারেটের এই table-cut diamond-কে দীর্ঘদিন ধরে কোহিনূরের আত্মীয় হীরা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সরকারি নথিতে এটি ঢাকার নবাব পরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত; ১৯০৮ সালে এর মূল্য ধরা হয়েছিল লাখ রুপি

কিন্তু আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন



দরিয়া-ই-নূর আসলে কোথায়?

ঢাকায় আসার আগে দরিয়া-ই-নূরের ইতিহাস

দরিয়া-ই-নূরের ইতিহাস ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন রাজদরবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, এটি দক্ষিণ ভারতের গোলকোন্ডা অঞ্চলের খনি থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে পাঞ্জাবের রাজদরবার ও ব্রিটিশ শাসনের মধ্য দিয়ে হীরাটি কলকাতায় আসে।



সাল ১৯০৮

ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ আর্থিক সংকটে পড়লে ১৯০৮ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও আসাম সরকারের কাছ থেকে ১৪ লাখ রুপি ঋণ নেন।

এই ঋণের বিপরীতে দরিয়া-ই-নূরসহ নবাব পরিবারের মোট ১০৯ ধরনের রত্ন অলংকার বন্ধক রাখা হয়। সরকারি নথি অনুযায়ী, তখন শুধু দরিয়া-ই-নূরের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল লাখ রুপি। পুরো ১০৯টি রত্নের মূল্য ধরা হয়েছিল ১০ লাখ ৯ হাজার ৮৩৫ রুপি।

সেখান থেকেই শুরু হয় রত্নগুলোর দীর্ঘ ভল্ট-জীবন।


দেশভাগের আগে রত্নগুলো রাখা ছিল Imperial Bank of India-এর হেফাজতে। পরে যায় State Bank of Pakistan-এর কাছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেগুলো আসে সোনালী ব্যাংকের ভল্টে

সরকারি নথি অনুযায়ী, সেখানেই দরিয়া-ই-নূরসহ ১০৯টি রত্ন সংরক্ষিত থাকার কথা। এভাবেই কেটে যায় বছর, দশক—তারপর এক শতাব্দীরও বেশি সময়।

কিন্তু এখানেই গল্পের সবচেয়ে অদ্ভুত অংশটি শুরু।

ভল্টে আছে—কিন্তু নিশ্চিত কে?

২০২৫ সালে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা যায়, সোনালী ব্যাংকের ভল্টে দরিয়া-ই-নূর লেখা একটি সিলগালা প্যাকেট থাকার কথা। কিন্তু ব্যাংক কর্মকর্তারাও নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি প্যাকেটের ভেতরে হীরাটি রয়েছে কি না। ভূমি সংস্কার বোর্ডও তখন এর অস্তিত্বের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। অর্থাৎ—

নথিতে হীরা আছে।
প্যাকেট
আছে।
কিন্তু
প্যাকেট খুলে হীরাটি দেখা হয়নি।

এই জায়গাটিই দরিয়া-ই-নূরের গল্পকে ইতিহাস থেকে রহস্যে পরিণত করেছে।

১১৭ বছর পর প্যাকেট খোলার উদ্যোগ

বিষয়টি সামনে আসার পর ২০২৫ সালে সরকার দরিয়া-ই-নূরসহ নবাব পরিবারের ১০৯টি রত্নের প্যাকেট যাচাইয়ের জন্য ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। উদ্দেশ্য ছিল রত্নগুলোর বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে যাচাই করা এবং নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।

কিন্তু সেই যাচাইও শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি।

২০২৫ সালের অক্টোবরে সোনালী ব্যাংকের ভল্টে গিয়ে প্যাকেট খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সব প্রস্তুতি নেওয়ার পরও কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। ফলে হীরাটি সত্যিই ভল্টের ভেতরে আছে কি না—সেই প্রশ্নের উত্তর আবারও অনিশ্চিত থেকে যায়।

দরিয়া-ই-নূরের সঙ্গে ১০৯টি রত্নের তালিকা

·  ৯৬টি মুক্তাখচিত একটি হীরার তারা

·  পান্না হীরার বাজুবন্ধ

·  রুবি হীরার নারীদের মাথার অলংকার

·  হীরা পান্নাখচিত পাগড়ির অলংকার

·  পান্না হীরার সোনার বেল্ট

·  মুক্তা হীরার ফেজ টুপি

·  এমনকি হীরাখচিত একটি তরবারি



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial