গ্রীষ্মের-ফুলেরা-summer-flowers-of-Bangladesh-x-bfa-x-fxyz-v2

গ্রীষ্মের ফুলেরা | Summer Flowers of Bangladesh

‘Summer’ এবং বাংলার ‘গ্রীষ্ম’ কে পুরুষ বাচক শব্দ হিসেবে ধরা হয়। কারণ গ্রীষ্মের মধ্যে কোন নারী সূলভ কোমলতা ও স্নিগ্ধতা আছে বলে মনে করা হয় না বরং তার রুদ্রমূর্তি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়।

” ঐ এল বৈশাাখ, ঐ নামে গ্রীষ্ম
খাইখাই রবে যেন ভয়ে কাঁপে বিশ্ব
চোখে যেন দেখি তার ধূলিময় অঙ্গ
বিকট কুটিল জালে ভ্রুকুটির ভঙ্গ।”

কবি সুকুমার রায় এভাবেই গ্রীষ্মের পরিচয় দিচ্ছেন তার কবিতায়। ইংরেজি ভাষায় ‘Summer’ এবং বাংলার ‘গ্রীষ্ম’ কে পুরুষ বাচক শব্দ হিসেবে ধরা হয়। কারণ গ্রীষ্মের মধ্যে কোন নারী সূলভ কোমলতা ও স্নিগ্ধতা আছে বলে মনে করা হয় না বরং তার রুদ্রমূর্তি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। এই পুরুষ গ্রীষ্মের কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে প্রচন্ড তাপ দাহ, মারাত্মক খরা, ভয়ংকর কালবৈশাখী ঝড়, এমন আরও কিছু ভয়াবহ দৃশ্য।

এগুলো ছাড়াও গ্রীষ্মের কিছু অপরূপ দৃশ্য আছে তা হলো, কৃষকের ঘরে নতুন ধান, ঝড়ে আম কুড়ানো, গরমের স্কুল ছুটি,আল্লাহ মেঘ দে পানি দে বলে বৃষ্টি প্রার্থনার ছড়া ইত্যাদি। গ্রীষ্মের এই সকল বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য নিয়ে বাংলার সংস্কৃতিতে চর্চাও কম হয়নি। তবে বেশিরভাগ সময়ই আমরা গ্রীষ্মের প্রচন্ড পৌরুষ নিয়েই আলোচনা করে থাকি। গ্রীষ্মের এই খাণ্ডবদাহন ছাড়াও আরো একটা চরিত্র আছে যা আমরা সর্বক্ষণ দেখি, মুগ্ধ হই কিন্তু সেই মুগ্ধতার কৃতিত্ব গ্রীষ্মকে ফলাও করে দেই না। সেই রূপটি হলো সারা বাংলা জুড়ে গ্রীষ্মে ফোঁটা অগণিত নাম জানা কিংবা না জানা ফুল।


আজকে গ্রীষ্মের অলংকার সে-সব ফুলদের নিয়ে কথা বলবো।

FLAME TREE

কৃষ্ণচূড়া ফুল

বৈশাখ- জৈষ্ঠ্য মাসে পথ চলতে চলতে গাছ ভর্তি যে লাল ফুল দেখে থমকে দাঁড়াতে হয় সেটাই কৃষ্ণচূড়া। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় গাছের মাথায় আগুন লেগে গেছে। বাংলা সাহিত্য, গান ও চিত্রে কৃষ্ণচূড়াকে নিয়ে মাতামাতি হয় প্রচুর পরিমানেই। বাংলাদেশর প্রায় সব গ্রাম ও শহরে এই ফুল দেখতে পাওয়া যায়। মাঝারি উচ্চতার গাছ। ছোট পাতা এবং চারটি পাপড়ি যুক্ত ফুলটি বাঙালিকে মুগ্ধ করে রাখে পুরো গ্রীষ্ম।

কৃষ্ণচূড়া-ফুল

Giant Crape-myrtle

জারুল ফুল

আহসান হাবীব তার ‘স্বদেশ’ কবিতায় লিখেছেন
“মনের মধ্যে যখন খুশি
এই ছবিটি আঁকি
একপাশে তার জারুল গাছ
দুটি হলুদ পাখি”
বাংলাদেশের গ্রামেই বেশি জারুল গাছ দেখা যায়। মাঝারি সাইজের শাখা-প্রশাখা যুক্ত গাছ। ফুলের রং বেগুনি। পুরো গাছ জুড়ে থোকায় থোকায় ফোটে থাকে। দূর থেকে দেখে মনে হয় বেগুনি রঙের উড়নি পড়ে দাড়িয়ে আছে কোন এক গাঁয়ের বধু।
জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন,
” এই পৃথিবীর এক স্থান আছে – সবচেয়ে সুন্দর করুণ
সেখানে সবুজ ডাঙা ভরে আছে মধুকুপী ঘাসে অবিরল
সেখানে গাছের নাম কাঠাল,অশ্বত্থ, বট,জারুল, হিজল।”

জারুলকে বলা হয় বাংলার চেরি।

GOLDEN SHOWER TREE

সোনালু ফুল

সেনালু ফুল যেন গাছের শাখায় ঝুলে থাকা ছোট ছোট হলুদ ঝর্ণা। দেখতে যেমন আকর্ষণীয় তেমনি রয়েছে তার বাহারি নামও। সোনারু, বাঁদরলাঠি, বানর নড়ী, সোদাল ইত্যাদি। অঞ্চল বিশেষ নামগুলোর ব্যবহার হয়। মহান কবি রবীন্দ্রনাথ এই ফুলের নাম দিয়েছিলেন, ” অমলতাস”।

সোনালু থাইল্যান্ডের জাতীয় ফুল এবং কেরেলা প্রদেশের বিষু উৎসবে রীতিগত গুরুত্ব আছে ।  থাইল্যান্ডে সোনালুকে Dok Khuen বলে।

সোনালু বা সোনাইল| GOLDEN SHOWER TREE

barringtonia acutangula

হিজল ফুল

প্রেম ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ” পিছল পথে কুড়িয়ে পেলাম হিজল ফুলের মালা
কি করি এই মালা দিয়ে বল চিকন কালা।”
হিজল গাছ মূলত নদী, নালা, খালবিল, হাওড় অর্থাৎ পানির আশেপাশে বেশি জন্মে। কিশোরীর কানের দুলের মতো ঝুলে থাকে গাছের ডালে। হিজল ফুলের প্রকৃত রূপ দেখা যায় গাছ থেকে ঝড়ে যখন পানিতে পড়ে থাকে তখন। লাল লাল ফুলগুলো যখন পানিতে ভাসে দেখে মনে হয় পানির উপর পৃথিবীর সবচেয়ে সুদৃশ্য গালিচাটি বিছানো রয়েছে।

golden trumpet

অলকানন্দা ফুল

শখের বাগানের ফুল অলকানন্দা। লতা জাতীয় গাছে বড় বড় হলুদ ফুল দেখতে চমৎকার। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং এই অলকানন্দা নামটি রেখেছিলেন।

অলকানন্দা

Arabian Jasmine

বেলী ফুল

যদি কখনো কোন ঝোপ ঝাড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তীব্র কোন ঘ্রাণ পেয়ে দাড়িয়ে যান এবং ঝোপের মধ্যে যদি দেখতে পান নরম পাপড়ি যুক্ত সাদা ফুল ফুটে আছে তাহলে তাকে বেলী বলে চিনতে ভুল করবেন না। বেলী ফুল দেখেছে কিন্তু তুলে হাতে নেয়নি এমন মানুষ দুষ্কর। বেলী ফুল মালা গাঁথার জন্য বিখ্যাত।

‘’বেলি ফুল এনে দাও, চাই না বকুল
চাই না হেনা, আনো আমের মুকুল।।’’

বেলী Arabian Jasmine

Cassia Javanica

লাল সোনাইল ফুল

লালচে গোলাপি ও সাদার মিশ্রণে চোখে প্রশান্তির পরশ দেয় লাল সোনাইল। বাংলার প্রকৃতি থেকে প্রায় লুপ্ত হতে যাওয়া সোনাইলকে প্রায় লোকই আজকাল নামও জানে না। গ্রীষ্মের কালবৈশাখী ঝড়ের বাতাসে যখন গাছভর্তি সোনাইল ফুল দুলতে থাকে তখন দূর থেকে মনে হয় স্বর্গের কোন অপ্সরী বেতালে নৃত্য করছেন।

Spider Tree, Temple Plant, Garlic Pear

বরুণ ফুল/প্রচলিত ভাষায় বৈন্যা

শুধু গ্রাম বাংলায় বিশেষকরে জলাভূমি ও হাওড় এলাকায় বরুণ ফুল বেশি দেখা যায়। সাদা ও হালকা হলুদ রঙের ফুল এই বরুণ। বরুণকে হয়তো আদর করে আমাদের সাজানো বাগানে কখনো স্থান দেইনা কিন্তু তার সৌন্দর্যকে কখনোই কেউ অস্বীকার করতে পারবে না

ভাটি অঞ্চলে ধানকাটার সময় টেপী বোরোর গরম গরম ভাতের সঙ্গে বরুণের কচি ডগা ভর্তা-ভাজি করে গৃহস্থ নারীরা কামলাদের খেতে দেন। চৈত্রসংক্রান্তির দিনে হাওরের নারীরা সংগ্রহ করেন বরুণ ফুল। আসছে বছরটি যাতে পরিবার ও গ্রামসমাজের জন্য মঙ্গলময় হয়, সে জন্য বরুণের ফুল গ্রামময় গেঁথে দেওয়া হয় গোবরের দলায়। হাওরাঞ্চলে এ পর্ব আড়িবিষুসংক্রান্তি নামে পরিচিত।

Frangipani

কাঠ গোলাপ ফুল

বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় কাঠগোলাপ গাছ দেখতে পাওয়া যায়। বড় বড় পাতার ফাঁকে নব বধুর মতো লুকিয়ে থাকে সাদা, হলুদ কিংবা লাল রঙের একগুচ্ছ ফুল।লুকিয় থেকেও নিজের অবস্থান জানান দেয় চারপাশে সুঘ্রাণ ছড়িয়ে।

কাঠ গোলাপ Frangipani

Peacock Flower, Paradise Flower, Barbados Pride, Flower-fence

রাধাচূড়া ফুল

রাধাচূড়া ফুলকে বলা হয় কৃষ্ণচূড়ার প্রেয়সী। গাছ ও ফুলের আকার প্রায় কৃষ্ণচূড়ার মতোই কিন্তু রঙ হলো হলুদ।

রাধাচূড়ার কিন্তু আরও অনেক নাম রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রত্নগণ্ডি, সিদ্ধেশ্বর ও গুলেটুর নামগুলো বেশি শোনা যায়। সুন্দর এ ফুলটির আদি নিবাস ওয়েস্ট ইন্ডিজে। এ গাছটি বাগান, রাস্তার ধারসহ বিভিন্ন জায়গায় শোভাবর্ধনের জন্য লাগানো হয়ে থাকে। ভারত উপমহাদেশে রাধাচূড়ার আগমন আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে।

রাধাচূড়া Peacock Flower, Paradise Flower, Barbados Pride, Flower-fence

উপরে উল্লেখিত ফুলগুলো ছাড়াও হিমচাপা, রঙ্গন, করবি, জিনিয়া, মাধবী লতা, জু্ঁই, দোলনচাঁপা, টগর, গন্ধরাজ, কামিনী, সূর্যমুখী, নয়নতারা, কুন্দ দোপাটি, কাঞ্চন সহ আরো বহু ফুল এই গ্রীষ্মে ফোঁটে। তার সবগুলোর নাম হয়তো আমরা জানি না। কিন্তু প্রকৃতিকে সাজাতে তারাও সমান ভুমিকা রাখে।


আপনার একটি শেয়ার আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

আপনার একটি শেয়ার আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা

X (Twitter)
Post on X
Pinterest
fb-share-icon
Instagram
FbMessenger
Open chat
1
Scan the code
Hello
How can i help you?
Skip to content