তামা কাসাঁ রঞ্জিত

তামা কাসাঁ রঞ্জিত

Spread the love
  • 6
    Shares

৪০০ বছরের পুরাতন ঢাকার ঐতিহ্য ও নিজস্বতা বলতে কি আছে? বিরিয়ানী? বাকরখানী? না না…… বাঙালী খাদ্যরসিক সে সকলেই জানি মানি, খাবারের বাইরে কি আছে? এই যেমন শিল্প জীবনবিধি ইত্যাদি  ইত্যাদি? ঠিক ঠাওর করা যাচ্ছেনা তাইতো? ঠিক আছে তাহলে একটা গল্প বলি……… তামা কাসাঁ রঞ্জিত গল্প ।

এক ছিল শহর, সেই শহরের প্রাণ ছিল, তাতে নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যেতো, কোলাহলের মাতম পাওয়া যেতো। ক্রম বিকাশমান সেই শহর যে দেশের প্রাণকেন্দ্র সে দেশে হঠাৎ দাঙ্গা হলো, মহামারী হলো, দুর্ভিক্ষ হলো, শোষণ হলো অবশেষে প্রানের তাগিদে যুদ্ধ হলো। শহর বেচে থাকলো ঠিকই কিন্তু স্মৃতিভ্রষ্ট হলো দেশ। জীবন যেখানে ওষ্ঠাগত সেখানে ঐশ্বর্য্যের দাপট প্রায় থাকেইনা বলতে গেলে।

রাধিকার নামে ধামরাই

সেই স্মৃতিবিধ্বস্ত দেশে এখনো বেচে আছে দেশীয় পরিচয়বহনকারী কিছু প্রাচীন শিল্প। তামা কাসা পিতল তেমনি একটি। আধুনিক ঢাকা জেলার উত্তরে প্রায় সীমানা ঘেষা হয়ে আছে বৃহত্তম ধামরাই উপজেলা। কবে কখন এই বসতির গোড়াপত্তন তা আন্দাজ করা যায় সেখানের সনাতনী প্রাচীন মন্দিরের বাসুদেব বিগ্রহ দেখে। এই বিগ্রহের ধরণটি অধুনা নয় বরং পাল আমলের নির্মাণশিল্পে খোদিত। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায় নবাবী আমলের প্রাক্কাল থেকেই এখানে নগর সভ্যতার পত্তন। নবাব লালিত শহর হবার পুর্বেও ধামরাই ছিল বংশী নদী বিধৌত সমৃদ্ধ গ্রাম। পুর্বে ধামরাইয়ের নাম ছিল বৌদ্ধপীঠ ধর্মরাজিয়া, কালবিবর্তনে বৈষ্ণব অধ্যুষিতহয়ে কৃষ্ণপ্রেয়সী রাধিকার নামে ধামরাই। ৯০০ হিজরীর কোন এক সময়ে ৫ জন সুফী দরবেশ আগমন করেন। আজও তাদের নামানুসারে ধামরাই পাঠান টোলায় অবস্থিত হযরত পাঁচ পীরশাহ মাজার।

নবাবদের সময়ে এই ভুভাগে ব্যাপক ভাবে তামা-কাসা পিতলের জনপ্রিয়তা ছিল। তৈজসপত্র নির্মান শিল্প গৃহসজ্জা তো ছিলই অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণেও তামা কাসার যোগদান ছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক নির্দেশনার ক্ষেত্রেও তাম্রলিপি ব্যবহার হতো ( তখন কাগজ আবিষ্কার হলেও টেকসই মাধ্যম হিসেবে তামার পাত ব্যবহার হতো )। তামা কাসাঁ -র ব্যাপক চাহিদার ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেমন শিমুলিয়া, বগুড়ার শিববাড়ি, টাঙ্গাইলের কাগমারী, জামাল্পুরের ইসলামপুর মুন্সীগঞ্জের লৌহজংগড়ে উঠেছিল তামা-কাসা-পিতলের কারখানা। ঢাকার ধামরাই তার মধ্যে অন্যতম। ব্রিটিশ আমলে যুদ্ধ সরঞ্জাম ছাপিয়ে তৈরি হতে থাকে নিত্যব্যবহার্য পণ্যসামগ্রী, প্রদীপ, বিভিন্ন দেব দেবীরমূর্তি, সংগীত সাধনার যন্ত্র ইত্যাদি।

তামা কাসাঁ
ধামরাই সদর হাইওয়ে সুউচ্চ রথ

ধামরাই উপজেলা সদর

ধামরাই সদর হাইওয়ে থেকে ইজিবাইকে রথখোলা গেলেই চোখ জুড়িয়ে দেয় রাস্তার মাঝে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ রথ। তার থেকেও বেশী চোখ জুড়ায় তামা কাসার পাশাপাশি দুটি ওয়ার্কশপ। প্রাচীনত্বের ছাপ রেখে দুইটি ওয়ার্কশপই ১৮শতকে নির্মিত ভবনের ভেতর, প্রসঙ্গত এ রাস্তা ধরে পরপর বেশ কয়েকটি পুরনো বাড়ি বহাল তবিয়তেই আছে, যেন অন্য ভুবনে নিয়ে যায়।

সুকান্ত’স ধামরাই মেটাল ক্রাফট। নিভু নিভু করে যে শিল্প এখনো টিকে আছে তার মধ্যে এ কারখানাটি উজ্জ্বলতার ছাপ রেখেছে মেধায়, প্রজ্ঞায়। পিতৃপুরুষ থেকে এ ব্যবসা তাদের প্রায় ২০০ বছরের পুরনো যার বর্তমান স্বত্ব সুকান্ত বণিকের। ধামরাই উপজেলা সদরে ইনোটা, ঘটি, হাঁড়ি-পাতিল, থালা, গ্লাস, বদনি ও বিভিন্ন শোপিচ, দেব দেবী ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতি জিনিসপত্র তৈরির জন্য স্বাধীনতার আগেও প্রায় ৩০-৪০ টি কারখানা ছিল। বর্তমানে একারখানাসংখ্যা ৪-৫ টিতে কেবল। প্রচলিত জিনিসের বাইরে নব্য সংযোজন প্রাচীন আমলের অনুকরণে গুপ্ত পাল সেন আমলের মূর্তির অনুবয়ব। তাছাড়া হাল আমলের নিত্যনতুন ডিজাইনের পণ্যও ওয়ার্কশপে পাওয়া যায়। যাকে বলা যায় ফিউশন, প্রাচীন মিডিয়ামের সাথে আধুনিকের মেলবন্ধন।

মুর্তি বা অবয়ব নির্মান ও প্রকৌশলে রয়েছে ধামরাইয়ের নিজস্বতা

ধামরাইয়ের তামা কাসার তৈরী মুর্তিতে রয়েছে অভিনবত্ব। ধারণা অনুযায়ী মুর্তি বা অবয়ব নির্মান ও প্রকৌশলে রয়েছে ধামরাইয়ের নিজস্বতা যা অন্যান্য জায়গা থেকে ভিন্ন। প্রচলিত ধাতুর মুর্তিনির্মাণে সেন্ড কাস্টিং প্রক্রিয়ার প্রয়োগ হয় যেখানে একই ছাচে অনেক মুর্তি বা অবয়ব নির্মাণ সম্ভব। ভারতে তামা কাসা পিতলের মুর্তি নির্মাণে এই রকম ইন্ডাস্ট্রিয়াল পদ্ধতিই ব্যবহার হয়। কিন্তু ধামরাই এখনো সনাতনী পদ্ধতিতে মুর্তি নির্মাণ শিল্পকে লালন করছে। এই পদ্ধতিতে একটি ছাচে একটি মুর্তিই নির্মাণ সম্ভব। মুর্তি কেমন হবে তা গলিত নরম মোমের দ্বারা প্রথমে হাতে তৈরী করা হয়। মোমের তৈরি এমডেলের ওপর প্রথমে মাটির প্রলেপ দেয়, যখন শক্ত আকার ধারণ করে তখন দেয়া হয় উত্তাপ। এরপর মোম গলে ভেতরটা ফাঁপা হয় আর সেখানে গলিত কাঁসা ঢেলে দেয়া হয়। তারপর ঠান্ডা হলে মাটির আবরণ ভেঙে মুর্তি বের করে হাতে বা মেশিনে মসৃণ করা হয়। পলিশ করা হয় ‘এন্টিকলুক’ আনার জন্য। যার কারণে এখানের প্রতিমা যেমন সাবলীল তেমনি একই ডিজাইনের দ্বিতীয়টি পা্ওয়া  যাবেনা।

তামা কাসাঁ রঞ্জিত

ক্রেতা

মুলত এর ক্রেতা কারা? জানা যায়, হিন্দু বিয়ের উপলক্ষ  কিংবা সৌখিন ক্রেতা। ২০০০ সালের দিকেও এখানে ছিল ২০টি কারখানা। ধীরেধীরে সব বন্ধ হয়ে গেছে। হাতেগোনা যা আছে তাও তেমন লাভের মুখ দেখছে না। চাহিদা কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে প্রথমত জানান বিকল্প তৈরী হওয়া। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে প্লাস্টিক, লোহা ও স্টিলের তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হওয়ায় কাঁসা-পিতল কেনায় ভাটা পড়েছে। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো রক্ষণাবেক্ষণ। তামা কাসার পণ্য পরিষ্কারের ঝক্কি নিতে চায়না অনেকেই। তাই দৃষ্টি প্রশান্তিকর হলেও একে নিত্যব্যবহার্যে রুপান্তরে অনেকেই রাজী নন। আবার বর্তমানে বিশ্ব বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকার পরও সঠিক প্রচারণা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাজার পাচ্ছেনা এই শিল্প। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্প বিদেশে রপ্তানীর গলার কাটা তামা কাসার পণ্যকে এন্টিক ঘোষণা করা। পুরাতাত্ত্বিক বস্তু ভেবে এর নান্দনিক মুর্তিসমুহ কাস্টমসে বাজেয়াপ্ত হবার ঘটনাও রয়েছে।

২০১৬ সালের গুলশান হামলার ঘটনার পর থেকে বিদেশী ক্রেতা একেবারেই কমে গেছে। তামাকাঁসা শিল্পে সহজ শর্তে ঋণপ্রদান করতে পারলে এবং তাদের তৈরি দ্রব্যসামগ্রী বিদেশে রফতানি করার ব্যবস্থা করলে এ শিল্প থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

শিল্প শ্রমিক সংকট

ধ্রূপদী কাসা শিল্পের কাচামাল ব্যয়বৃদ্ধি, যোগান, বাজারজাতকরণ, ক্রেতা সঙ্কোচণ তো রয়েছেই আরেকটি বড় বাধা হলো শিল্প শ্রমিক সংকট। একজন দক্ষ শ্রমিক ধ্রূপদী পর্যায়ের কাজ করতে জানতে হলে বেশ কয়েক বছরের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হয়। সাধারণত বংশানুক্রমিক ভাবেই এসব শিক্ষায় দীক্ষিত হতেন শিল্পীরা। অর্থাভাবে, অনেকেই বংশপরম্পরাগত এই কাজ ছেড়ে দিয়েছেন, ভিড়েছেন পেট চালানোর দায়ে অন্য পেশায়। তাই দক্ষ শ্রমিকের অভাবে শীঘ্রই এই শিল্প ম্রিয়মাণ হবে বলে শঙ্কিত সংশ্লিষ্টরা।

ধামরাইয়ের বিখ্যাত রথটির ডান দিকে রয়েছে রাশেদা মোশাররফের পিতলের শোরুম। দোকানে ঢুকলেই নান্দনিক ভাষ্কর্য তৈজস ও গৃহসজ্জাসামগ্রী চোখে পড়ে। তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে বাঁচাতে হলে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে এবং সহজ শর্তে করতে হবে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা। তিনি আরো বলেন, আমাদের এসব জিনিস তৈরিতে প্রচুর টাকা প্রয়োজন হয়। আবার দেখা যায়, ব্যবসা কখনো ভালো আবার কখনো খারাপ হয়। অথচ ব্যাংক চড়া সুদে লোন দিতে আগ্রহী হয়। আবার ব্যাংক লোন নিলে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। রাশেদা বলেন, এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকার যদি সর্বোচ্চ ৫শতাংশ সুদে ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করে তাহলে অনেক ভালো হবে।

কাঁসা শিল্পের প্রসারে করনীয়

দেশীয় লাইফস্টাইল হাউজগুলোতে প্রথমদিকে ধামরাই থেকে পণ্যসামগী নিলেও এখন তার পরিমাণ অনেক কমে গেছে। সাবলীল রুচিসম্পন্ন ক্রেতার অভাবে  তাদের পৃষ্ঠপোষকতাও দুরহ হয়ে উঠছে।

সরকারী বা বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ব্যাপকভাবে দরকার ঢাকা তথা বাংলাদেশের এই শিল্পকে বাচিয়ে রাখতে। মাঝে ২০১৮ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘এসডিআই’ ধামরাইয়ের কাঁসা শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য আছেন। সর্বনিম্ন ৭০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ পর্যন্ত ঋণের ব্যবস্থা করেছেন। সাহা মেটাল, রাশেদা মেটাল সহ আরও অনেকে তাঁদের কাছ থেকে পুঁজির জোগান পেয়েছেন। তবে শুধু পুঁজির জোগানই এই শিল্প এগিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়; ক্রেতাদের রুচির বিষয়টিও এখানে জরুরি। ঐতিহ্য ধরে রাখায় ক্রেতার আগ্রহ কাঁসা শিল্পের প্রসারে ভূমিকা রাখবে।

তামা  কাসার ঝলক স্তিমিত হয়ে মলিন হয়ে আসে, তবে তাদের ধারণ করে যাদের জীবিকা যাদের সংগ্রাম তারা এখনো স্বপ্ন দেখেন ধীরে ধীরে আবার সমুজ্জল হয়ে উঠবে এই শিল্প আবার আসবে শ্রী সমৃদ্ধি। এই করেই হচ্ছে সংগ্রাম, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম।


Spread the love
  • 6
    Shares

Leave a Reply

%d bloggers like this: