Scroll painting পটচিত্র এবং পটের গান গাজীর পট সুধীর আচার্য, দুর্জন আলী এবং শিল্পী শম্ভু আচার্য x bfa x fxyz

পটচিত্র এবং পটের গান বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক

পটের মাঝখানের বড় ছবিটি পীর গাজীর। তার দুই পাশে ভাই কালু ও মানিক। গাজী বসে আছেন বাঘের ওপর।

পটচিত্র বাংলাদেশের লোকশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা শুধুমাত্র চিত্রকলার মাধ্যমেই নয়, বরং এর সাথে সম্পৃক্ত সঙ্গীত ও গল্প বলার ঐতিহ্যের মাধ্যমেও লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। পটুয়াদের পটচিত্র আঁকার পাশাপাশি তাদের সঙ্গীত পরিবেশন করার ঐতিহ্য গ্রামের মানুষের বিনোদন ও শিক্ষার অন্যতম উৎস ছিল। এই পটের গান বা পটুয়া সঙ্গীতের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মীয় এবং সামাজিক শিক্ষা প্রদান করা হতো। এটি কেবলমাত্র একটি শিল্প নয়, বরং এটি একটি সমাজ-সংস্কৃতির ধারক বাহকও ছিল।

পটের গান বা পটুয়া সঙ্গীত সাধারণত এমন এক লোকগীতি যার মাধ্যমে পটের ছবি দেখে সুরেলা কণ্ঠে গল্প বা কাহিনী শোনানো হতো। এ ধরনের সঙ্গীত পরিবেশন প্রক্রিয়াটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পটুয়া শিল্পীরা নিজেরাই করতেন। তারা পটে চিত্র অঙ্কন করতেন এবং পরে সেসব চিত্রের বর্ণনা দিয়ে গান তৈরি করতেন। পটুয়া সঙ্গীতের মাধ্যমে মানুষের মনে ছাপ ফেলার পাশাপাশি বিনোদনের একটি বড় উৎস হিসেবে কাজ করত।

পটুয়াদের মধ্যে বেশিরভাগই মুসলিম ধর্মাবলম্বী হলেও, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মধ্যেও পটগানের প্রচলন দেখা যায়। প্রধানত, দুটি ধরণের পটচিত্র পাওয়া যায়: দীর্ঘ জড়ানো পট এবং ছোট চৌকা পট। দীর্ঘ জড়ানো পট, যেমন গাজীর পট, বিশাল আকারের হয় এবং এতে বিস্তারিত কাহিনী চিত্রিত হয়। অন্যদিকে, ছোট চৌকা পট আকারে ছোট এবং একক আয়তাকার হয়।

বাংলাদেশের কয়েকটি এলাকায় এখনও পটচিত্র এবং পটের গানের ঐতিহ্য টিকে আছে, বিশেষ করে খুলনা, নড়াইল, মুন্সিগঞ্জ, এবং নরসিংদী অঞ্চলে। নড়াইলের রূপকথা পটগান এবং মুন্সিগঞ্জের মঙ্গল মিয়ার পটগানের দল এখনও সক্রিয় রয়েছে। মুন্সিগঞ্জের পটশিল্পী সুধীর আচার্যের আঁকা গাজীর পট দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পটচিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।

পটচিত্র এবং পটের গান বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক x bfa x fxyz 19

scroll painting

পটচিত্র

পট শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত “পট্ট” বা কাপড় থেকে, এবং পটের ওপর আঁকা চিত্রকে বলা হয় পটচিত্র (Scroll painting)। পটচিত্র আঁকায় যারা দক্ষ, তাদেরকে অতীতে এবং বর্তমানেও পটুয়া বলা হয়। কাগজ আবিষ্কারের আগে, সকল পটচিত্রই কাপড়ের ওপর আঁকা হতো। মূলত, কাপড়ের ওপর গোবর এবং বেলের আঠার প্রলেপ দিয়ে প্রথমে একটি ভিত্তি বা বেইজ তৈরি করা হতো। এরপর সেই বেইজের ওপর চক পাউডার, তেঁতুল বিচির আঠা এবং ইটের গুঁড়ার মিশ্রণের প্রলেপ দেওয়া হতো। পটটি ভালোভাবে রোদে শুকানোর পর, চিত্রটি কয়েকটি অংশে ভাগ করে সাজানো হতো যাতে গল্পের ধারাবাহিকতা ফুটে ওঠে।

পটচিত্রে ব্যবহৃত রঙগুলো ছিল প্রাকৃতিক ও দেশজ। বিভিন্ন উপকরণ থেকে এসব রঙ তৈরি করা হতো। যেমন, মাটির সরাকে মশালের ওপরে উপুড় করে তৈরি করা কালো কালি, শঙ্খগুঁড়া থেকে সাদা, সিঁদুর থেকে লাল, হলুদগুঁড়া থেকে হলুদ, গোপী মাটি থেকে মেটে হলুদ, এবং নীল গাছ থেকে নীল রং পাওয়া যেত। পটুয়ারা ছাগল বা ভেড়ার লোম দিয়ে তৈরি তুলি ব্যবহার করে এসব রং দিয়ে চিত্র আঁকতেন।

সর্বশেষ পট গায়ক দুর্জন আলী, ছবি: সারাবাংলা.নেট

poter GaAN

পটের গান

পটের গান, যা পটুয়া সঙ্গীত নামেও পরিচিত, একটি প্রাচীন লোকগীতি। অন্যান্য লোকসঙ্গীত থেকে এর মূল পার্থক্য হলো, এই গান পরিবেশনের সময় পট বা কাপড়ের ওপর আঁকা চিত্রগুলো প্রদর্শন করা হয়। পটের গানের মাধ্যমে শিল্পী রং-তুলির আঁচড়ে আঁকা গল্পগুলো সুরের মাধ্যমে সবার সামনে পরিবেশন করেন। এই গানের সাথে চিত্র ও সঙ্গীতের সংমিশ্রণ একে বাংলার লোকজ সংগীতের একটি স্বতন্ত্র ও প্রাচীন ধারা হিসেবে পরিচিত করেছে।

বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে পটের গান হাজার বছরের পুরনো এবং এক সময় গ্রামবাংলায় এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। পটুয়ারা তাদের আঁকা পটচিত্রে ধর্ম, সমাজ এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক কাহিনী ফুটিয়ে তুলতেন, যা পরে সুরেলা গানের মাধ্যমে বর্ণনা করা হতো। পটের গানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল নৃত্য। গায়ক পটচিত্র প্রদর্শন করার পাশাপাশি নেচে নেচে ছবির কাহিনী পরিবেশন করতেন, যা সঙ্গীত ও দৃশ্যমান কাহিনীর এক অনন্য মেলবন্ধন সৃষ্টি করত।

পটের গানের বিষয়বস্তু

পটের গানের প্রাথমিক বিষয়বস্তুতে জন্ম, মৃত্যু এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের সুখ-দুঃখের বর্ণনা ছিল বিশেষভাবে প্রাধান্যপূর্ণ। এই গানগুলোতে স্বর্গের সুখ এবং নরকের শাস্তির চিত্র ফুটিয়ে তোলা হতো। এছাড়াও, পটের গানে বৌদ্ধ জাতক কাহিনী, রামকাহিনী, কৃষ্ণকাহিনী, সিন্ধুবধ, এবং গাজী পীরের উপাখ্যানের মতো জনপ্রিয় ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গল্পগুলিও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিল। এসব বিষয়বস্তুর মাধ্যমে মানুষের নৈতিক শিক্ষা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের চর্চা করা হতো, যা পটের গানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

GAjir pot

গাজীর পট:

বাংলার লোকশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো গাজীর পট। গাজীর পট ও গাজীর গান একসময় ভাটি অঞ্চলের মানুষের নীতিশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে পট দেখিয়ে গাজীর গান পরিবেশন করতেন। তারা ধান, চাল বা টাকার বিনিময়ে এই গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সাধারণত পাঁচ থেকে দশজনের একটি দল একসাথে পটের গান পরিবেশন করতো। ঢাক-ঢোল, হারমনিয়াম, মন্দিরা ইত্যাদি বাজিয়ে নাচের সাথে গানের তালে তালে কাহিনী বর্ণনা করা হতো। দলের একজন পটের ছবি ধরে রাখতেন, আর একজন গায়ক ছোট একটি লাঠি দিয়ে সেই ছবি দেখিয়ে সুরের তালে নেচে নেচে গল্পটি শোনাতেন।

গাজীর পটের বর্ণনায় তিনটি মূল বিষয়ের সংমিশ্রণ দেখা যায়:

ক) গাজী পীরের মাহাত্ম্য ও অলৌকিক ক্ষমতার বর্ণনা,

খ) কৌতুক মিশ্রিত হিতোপদেশ,

গ) মৃত্যু ও যমরাজের ভয়ের চিত্রায়ণ।

এই উপাদানগুলো মিলে গাজীর গানকে একটি শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলেছিল।

গাজীর পটের কেন্দ্রে পীর গাজীর একটি বড় চিত্র থাকে, যেখানে তাকে বাঘের ওপর বসে থাকতে দেখা যায়। তার দুই পাশে তার ভাই কালু ও মানিকের চিত্র অঙ্কিত থাকে। পটের ওপর থেকে দ্বিতীয় সারির মাঝখানে নাকাড়া বাজানো ছাওয়াল ফকির, তৃতীয় সারির মাঝখানে কেরামতি শিমুল গাছ এবং ডান পাশে গাজীর গুণকীর্তনরত দুই মহিলার ছবি দেখা যায়। কেন্দ্রীয় প্যানেলের নিচের সারিতে গাজী পীরের বোন লক্ষ্মী এবং তার বাহন পেঁচা অঙ্কিত থাকে।

দ্বিতীয় সারির ডান পাশের প্যানেলে মকর মাছের পিঠে উপবিষ্ট গঙ্গা দেবীর চিত্র থাকে, আর সর্বনিম্ন সারির বামদিকে থাকে যমদূত, ডানদিকে কালদূত এবং মাঝখানে যমরাজের মা, যিনি মানুষের মাথা রান্না করছেন। পটের প্রতিটি ফ্রেমের চারপাশে সাদা পটভূমির ওপর খয়েরি রঙের শেকলের নকশা করা থাকে, যা পটের একটি ঐতিহ্যবাহী শৈলী।

গাজীর পটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো রঙের ব্যবহার। এতে লাল ও নীল রঙের বিভিন্ন শেড যেমন রক্তের মতো লাল ও গোলাপি, এবং শ্যাম ও আকাশি নীল ব্যবহার করা হয়। খুলনা, নড়াইলসহ বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে এখনও গাজীর পট ও গাজীর গান চর্চা করা হয়, যা এই ঐতিহ্যকে জীবন্ত রেখেছে।



পট দেখিয়ে যে গান গাওয়া হয়

হরদম গাজীর নাম লইয়ো পাষাণ মন রে, হরদমে গাজীর নাম লইয়ো।
দমে দমে লইয়া নাম, জিরানী না দিয়ো পাষাণ মন রে, হরদমে গাজীর নাম লইয়ো।।

আশা হাতে তাজ মাথে সোনার খড়ম পায়
আল্লা আল্লা বলে গাজী ফকির হইয়া যায়।
সুন্দরবন যাইয়া গাজী খুলিলেন কালাম
আসিয়া বনের বাঘ জানায় ছালাম।।

‘রান্ধিয়া-বান্ধিয়া অন্ন পুরুষের আগে খায়,
ভরানা কলসের পানি তিরাসে শুকায়।
দুবদুবাইয়া হাঁটে নারী চোখ ঘোরাইয়া চায়,
অলক্ষ্মীরে দিয়া ঘরে লক্ষ্মী লইয়া যায়।।

যমদূত কালদূত ডাইনে আরো বায়
মধ্যখানে বইসা আছে যমরাজের মায়যমদূত কালদূত দেইখ্যা লইবেন তারে
দুই হাতে দুই লোহার গদা যমের মতো ফিরে
যমরাজের মায় বইছে তামার ডেকচি লইয়া
পাপী মানুষের কল্লা দিছে সে ডেগেতে ফালাইয়া৷

এই পর্যন্ত বইলা আমি ইতি দিয়া যাই,
আল্লায় বাঁচাইলে আবার আরেক দিন গাই।

আলোকচিত্রী : মোহাম্মদ আসাদ

সুধীর আচার্য, দুর্জন আলী এবং শিল্পী শম্ভু আচার্য

১৯৭৭ সালে লোকগবেষক তোফায়েল আহমেদ আশুতোষ মিউজিয়ামে দেখতে পান এটি পাজীর পট। তার সঙ্গে লেখা ছিল ‘দুই বাংলার একমাত্র গাজীর পট’। সেটি করেছেন বাংলাদেশের শিল্পী সুধীর আচার্য। তোফায়েল আহমেদ নিজেই অবাক-বাংলাদেশে কোনো পটচিত্রী আছেন, সেটা জানা ছিল না তাঁর। দেশে ফিরে তোফায়েল আহমেদ খোঁজখবর নিলেন। খুঁজতে থাকেন সুধীর আচার্যকে। জানতে পারেন যে গায়েন দুর্জন আলী নামে একজন সুধীন আচার্যের আঁকা পট দিয়ে গ্রামে গ্রামে গাজীর গান শুনাতেন। নরসিংদীতে খুঁজে পান গায়েন দুর্জন আলীকে। তাঁর কাছ থেকে সন্ধান পান মুন্সীগঞ্জের সুধীর আচার্যের। সুধীর আচার্য হলেন শম্ভু আচার্যের বাবা। সেই থেকে আচার্য পরিবারের পটচিত্রের গৌরবের প্রচার শুরু।

সুধীর আচার্যর বাস মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার কালিন্দীপাড়ায়। ১৯৮৯ সালে কারুশিল্প পরিষদ সুধীর আচার্যকে কারুশিল্প পদক দেয়ার জন্য নির্বাচিত করা হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি তাঁর হাতে তুলে দেয়া হবে পুরস্কার, সে চিঠি পৌঁছায় ৬ ফেব্রুয়ারি সকালে। সেদিনই বিকেলে শিল্পী সুধীর আচার্য মৃত্যুবরণ করেন। তারপর থেকে ঐতিহ্যবাহী গাজীর পট এঁকে চলেছেন তাঁর সুযোগ্য সন্তান শম্ভু আচার্য।

বাংলা ১৩৬২ সালের ২৮ পৌষ মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার কালিন্দীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শম্ভু আচার্য। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। শম্ভু আচার্যের বাবা স্বর্গীয় সুধীর চন্দ্র আচার্য। মা স্বর্গীয় কমলা বালা আচার্য। স্ত্রী পপি আচার্য। তিন মেয়ে সেতু আচার্য, ঋতু আচার্য, সৃষ্টি আচার্য এবং এক ছেলে অভিষেক আচার্য।

শম্ভু আচার্য এই পরিবারের নবম পুরুষ। ৪০ বছরের অধিক সময় ধরে তিনি পটচিত্র এঁকে চলেছেন। শম্ভু বংশপরম্পরায় আঁকাআঁকিতে এলেও বাবার সঙ্গে সামান্য তফাত আছে ছেলের। বাবা আঁকতেন গামছায়, শম্ভু আঁকেন ক্যানভাসে। আঁকার ক্যানভাসটি বিশেষভাবে প্রস্তুত করেন নিজেই। ইটের গুঁড়া ও চক পাউডারের সঙ্গে তেঁতুলবিচির আঠা মিশিয়ে তৈরি হয় মিশ্রণ। এ মিশ্রণ মার্কিন কাপড়ে লেপে দিয়ে তৈরি হয় আঁকার জমিন। তাঁর আঁকা পটচিত্র আমাদের ঐতিহ্যবাহী এক শিল্পকলা।

১৯৭২ সালে কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৭৪ সালে রিকাবী বাজারে গড়ে তুলেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘শিল্পালয়’। সেখানে পটচিত্রের পাশাপাশি দেয়াল চিত্র, নাটকের সেট, নাটকের মেকআপ ছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তার এ কার্যক্রম চলে। তারপর আবার শিল্পী সত্ত্বা খুঁজতে থাকে ভিন্নতা। অনুভব আর উপলব্ধির ভেতর দিয়ে পটচিত্রের দিকে ঝুঁকে গেলেন।

শম্ভু আচার্যের পটচিত্রের ধরণ বাংলা পটের নিজস্ব। তাঁর ক্যানভাসে উঠে এসেছে সমসাময়িক গ্রামীণ ও নাগরিক জীবন। ফুল, পাখি, জেলে, কামার, কুমার, লক্ষ্মী-সরস্বতী, কালী, তাঁতির সরল জীবন যেমন উঠে এসেছে, তেমনি বারবার এসেছে রাসলীলা, মহররম পর্ব, ময়ূরপঙ্খি, কৃষ্ণের নৌকাবিলাস, নানা ভঙ্গিতে ঘোড়ার গাড়ি

শম্ভু আচার্য ২০০৩ সালে ঢাকার গ্যালারি চিত্রক, ২০০৬ সালে ঢাকার কায়া ও ২০০৭ সালে আলিয়ঁস ফ্রঁসেস গ্যালারিতে একক চিত্র প্রদর্শনী করেছেন। এছাড়া ১৯৯৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার সুরাবায়া সেমিনারে ১৯৯৯ সালে লন্ডনের স্পিটজ গ্যালারি, ২০০৮ সালে চীনের সাংহাই শহরে, আমেরিকার নিউইয়র্ক এবং বেলজিয়ামের ব্রাসেলস-এ বিভিন্ন সেমিনার ও যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নেন। শিল্পী হিসাবে তিনি একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। একদিকে বাবার শিল্পকর্ম যেমন স্থান পেয়েছে লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপল আর্ট ও কলকাতার মিউজিয়ামে তেমনি শম্ভু আচার্যের শিল্পকর্ম ব্রিটিশ মিউজিয়াম, চীনের কুবিং মিউজিয়াম ও জাপানের ফুকুওকা মিউজিয়ামে। দেশ-বিদেশে বয়ে এনেছেন বিরল সম্মান।

পটচিত্র এবং পটের গান

পটচিত্র নিয়ে করা টি-শার্ট

BY Nitya Upahar

potua Nazir Hossain

পটুয়া নাজির হোসেন । নিভৃতচারী একজন শিল্পী

নাজির হোসেন, যিনি “বাঘ মামা” বা “টাইগার নাজির” নামে পরিচিত, প্রায় দুই দশক ধরে পটশিল্পকে নগরের মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। তার সিগনেচার পটচিত্রে বাঘকে বিভিন্ন রূপে দেখা যায়—কখনো ঢাকঢোল পেটাচ্ছে, কখনো গায়েন হিসেবে গান গাইছে, আবার কখনো জমিতে হাল চাষ করছে বা নৌকা, রিকশা, রেলগাড়ি ও বিমান চালাচ্ছে। এ পর্যন্ত তিনি ৩০ হাজারেরও বেশি পটচিত্র এঁকেছেন, যেখানে বাঘ প্রধান চরিত্র।

তার শিল্পীসত্তা গড়ে উঠেছে তার মায়ের অনুপ্রেরণায়, যিনি ভালো নকশীকাঁথা সেলাই করতেন। ছোটবেলায় মায়ের কাজ দেখে নাজির মাটিতে কাঠি দিয়ে নিজের মতো ছবি আঁকতে শুরু করেন। তার পটচিত্রে নকশীকাঁথার ছোঁয়া এবং মায়ের তৈরি মাটির লেপন ও হাতপাখার নকশার প্রভাবও স্পষ্ট।

টাইগার নাজির – হালূম

পহেলা বৈশাখে ১০০ ফুট দীর্ঘ পটচিত্র:
ঐতিহ্যের এক নতুন মাত্রা
.

এবারের পহেলা বৈশাখের আনন্দ শোভাযাত্রায় যুক্ত হলো একটি অনন্য সংযোজন—১০০ ফুট দীর্ঘ পটচিত্র। এ আয়োজনে বাঙালির ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরতে আঁকা হয়েছে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন পটচিত্র। প্রতিটি পটচিত্র ছিল ২০ ফুট দীর্ঘ, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল “পটচিত্র আকবর”, “পটচিত্র বাংলাদেশ”, “পটচিত্র বেহুলা”, “পটচিত্র বনবিবি” এবং “গাজীর পট”। প্রতিটি চিত্রই বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের নানা দিককে জীবন্ত করে তোলে।

এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশিষ্ট পটুয়া নাজির হোসেন, যিনি “বাঘ মামা” বা “টাইগার নাজির” নামে সুপরিচিত। তার সিগনেচার পটচিত্রগুলোতে বাঘকে দেখা যায় নানা আকর্ষণীয় রূপে—কখনো ঢাকঢোল পেটাতে, কখনো গায়েনের ভূমিকায় গান গাইতে, আবার কখনো জমিতে হাল চাষ বা নৌকা, রিকশা, রেলগাড়ি, এমনকি বিমান চালাতে। তার হাতে বাঘ চরিত্রটি এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে ওঠে।

নাজির হোসেনের পটচিত্রের সৃজনশীলতা তাকে দেশের শীর্ষ পটুয়াদের মধ্যে অন্যতম করে তুলেছে। এখন পর্যন্ত তিনি ৩০ হাজারেরও বেশি পটচিত্র এঁকেছেন, যেগুলোর প্রত্যেকটিতে বাঘ কোনো না কোনো ভাবে প্রধান চরিত্র। এবারের ১০০ ফুট দীর্ঘ পটচিত্রে তার দক্ষতা ও উদ্ভাবনশীলতা আবারও প্রকাশ পেয়েছে।

প্রতিটি পটচিত্র ছিল ২০ ফুট দীর্ঘ, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল “পটচিত্র আকবর”, “পটচিত্র বাংলাদেশ”, “পটচিত্র বেহুলা”, “পটচিত্র বনবিবি” এবং “গাজীর পট”।

নাজির হোসেনের তুলির আঁচড়

নাজির হোসেন ১৯৮২ সালে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার রুস্তম নগর নতুন বাজার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সালে মায়ের সঞ্চিত অর্থ নিয়ে তিনি ঢাকায় আসেন, উদ্দেশ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সামনে নিজের শিল্পপ্রতিভা তুলে ধরা। তিনি চারুকলার আশেপাশে ঘোরাফেরা করতেন এবং তার আঁকা ছবি দেখে শিক্ষার্থীরা ও শিক্ষকরা তাকে উৎসাহ দিতেন। এতে তার আগ্রহ আরও বেড়ে গেলেও প্রথম দিকে তিনি ঢাকায় স্থায়ী হতে পারেননি।

মাঝেমধ্যে পার্বতীপুরে ফিরে গিয়ে কিছুদিন কাটিয়ে আবার ঢাকায় আসতেন, সঙ্গে আনতেন তার আঁকা ছবি। কখনও ছবির হাটে, কখনও চারুকলার দেয়ালে তার নিজের আঁকা ছবির প্রদর্শনী করতেন। অনেক চড়াই-উতরাই পার করে ২০০০ সাল থেকে তিনি ঢাকায় স্থায়ী হন। ২০১২ সালে তিনি ঢাকার আদাবরে নিজের স্টুডিও গড়ে তোলেন, যেখানে তিনি তার স্ত্রী শামীমা হোসেন এবং দুই সন্তানকে নিয়ে থাকেন। তার স্ত্রী একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক।

নাজির হোসেন তার শিল্পকর্ম গণমানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ফুটপাতকে বেছে নিয়েছেন, কারণ তার মতে, ফুটপাতই হলো সাধারণ মানুষের গ্যালারি। ২০০০ সাল থেকে তিনি ঢাকার পাবলিক লাইব্রেরির সামনে ফুটপাতে বসে ছবি আঁকছেন। তার মতে, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষেরা এখানে এসে তার শিল্পকর্ম দেখার সুযোগ পাচ্ছেন, এটিই তার সবচেয়ে বড় অর্জন।

এখন পর্যন্ত নাজিরের ৫৯টি একক প্রদর্শনী হয়েছে। এর মধ্যে একাধিকবার হয়েছে শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ এবং বেঙ্গল গ্যালারিতে।


তথ্যসূত্র :
১. বাংলাপিডিয়া : গাজীর পট
২. সমকাল : প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০১৬
৩. ক্যানভাস : গাজীর পট ও দুর্জন আলী 

৪. বিবিসি নিউজ বাংলা: পটুয়া সঙ্গীত বা পটের গান সম্পর্কে কতটা জানেন আপনি?

৫. মুন্সিগঞ্জ জেলা: বাংলার পট আঁকিয়ে শম্ভু আচার্য

৬. প্রথম আলো: লোকজ শিল্পের দুই বিশ্বযাত্রী

৭. bangla.bdnews24.com : টাইগার নাজির


আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম লিংক


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Instagram did not return a 200.
Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial

Warning: Undefined array key "sfsi_threadsIcon_order" in /home/bdfashio/public_html/wp-content/plugins/ultimate-social-media-icons/libs/controllers/sfsi_frontpopUp.php on line 165

Warning: Undefined array key "sfsi_blueskyIcon_order" in /home/bdfashio/public_html/wp-content/plugins/ultimate-social-media-icons/libs/controllers/sfsi_frontpopUp.php on line 170

Warning: Undefined array key "sfsi_bluesky_display" in /home/bdfashio/public_html/wp-content/plugins/ultimate-social-media-icons/libs/controllers/sfsi_frontpopUp.php on line 266
error

Your share and comment are an inspiration to us

X (Twitter)
Post on X
Pinterest
fb-share-icon
Instagram
FbMessenger
Copy link
URL has been copied successfully!