কেন আবার ফিরছে ৮০-এর দশক? AI ছবি থেকে ফ্যাশন—নস্টালজিয়ার নতুন ট্রেন্ড

হঠাৎ করে সবাই ৮০-এর দশকে ফিরে যাচ্ছে কেন?
পুরোনো অ্যালবাম থেকে ছবি বের হচ্ছে, নতুন ছবিতে ৮০-এর দশকের ফিল্টার, গ্রেইন, রঙ—সব মিলিয়ে যেন হারিয়ে যাওয়া একটা সময়কে আবার ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা।

কিন্তু কেন ৮০?
আমরা কি কিছু হাতড়ে বেড়াচ্ছি, নাকি নিছক ট্রেন্ডিং?
নাকি আমরা আসলে এমন একটা সময়ের ছবি খুঁজছি—
যেখানে জীবনটা একটু ধীর ছিল,
ছবিগুলো পারফেক্ট ছিল না,
আর স্মৃতিগুলোও এত সহজে স্ক্রল করে হারিয়ে যেত না?

কিন্তু কেন ৮০?

গত কয়েকদিন ধরেই ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামের ফিডে চোখ রাখলে ব্যাপারটা বেশ স্পষ্ট। অনেকেই নিজেদের বর্তমান ছবি এআই দিয়ে এমনভাবে বদলে নিচ্ছেন, যেন ছবিটা ৪০ বছর আগে কোনো অ্যানালগ ক্যামেরায় তোলা। কেউ বানাচ্ছেন পারিবারিক অ্যালবামের ছবি, কেউ পুরোনো বলিউড বা হলিউড স্টুডিও পোর্ট্রেট, কেউ আবার ৮০-এর দশকের শহুরে জীবনের কোনো দৃশ্য।

প্রথম আলোর একটি সাম্প্রতিক ফিচারেও এই ট্রেন্ডের বেশ কিছু উদাহরণ উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কেউ শাড়ি আর বড় কোঁকড়ানো চুলে, কেউ হাই-ওয়েস্ট ট্রাউজার, শার্ট আর গোঁফে—নিজেদের এমন এক সময়ে নিয়ে যাচ্ছেন, যে সময়টাকে হয়তো তারা নিজেরাও সরাসরি দেখেননি।
মজার ব্যাপার হলো, এই ছবিগুলো বানাতেও খুব বেশি কারিগরি জ্ঞান লাগছে না। নিজের একটা ছবি আপলোড করে চুল, পোশাক, গয়না, আলো, ব্যাকগ্রাউন্ড কিংবা ছবির টেক্সচার সম্পর্কে কয়েকটা নির্দেশনা দিলেই এআই বাকিটা করে দিচ্ছে।

তাহলে কি আমরা শুধু একটা ট্রেন্ড অনুসরণ করছি?
সম্ভবত হ্যাঁ। কিন্তু ব্যাপারটা বোধহয় শুধু ট্রেন্ডে আটকে নেই।

৮০-এর দশকের লুকটা আসলে কেমন?

৮০-এর দশকের ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজটা আজকের মিনিমাল, ক্লিন, নিখুঁত ছবির একেবারে উল্টো।
উষ্ণ আলো, একটু সফট ফোকাস, ফিল্ম গ্রেইন, উজ্জ্বল কিন্তু খানিকটা বিবর্ণ রঙ—ছবিগুলোতে একটা অসম্পূর্ণতা থাকে। আর সেই অসম্পূর্ণতাটাই এখন নতুন করে সুন্দর লাগছে।
ফ্যাশনেও ব্যাপারটা একই।
ওভারসাইজড শোল্ডার, পাওয়ার স্যুট, বোল্ড কালার, বড় প্রিন্ট, ডেনিম, হাই-ওয়েস্টেড ট্রাউজার, পাফড স্লিভ, বড় চুল, স্টেটমেন্ট জুয়েলারি—সবকিছুতেই একটা “আমাকে একটু দেখো” ধরনের আত্মবিশ্বাস ছিল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ৮০-এর দশকের ছবিগুলোতে আবার রঙিন শাড়ি, বড় চুল, মানানসই গয়না, পুরুষদের শার্ট, হাই-ওয়েস্টেড ট্রাউজার, গোঁফ ও পরিপাটি চুলের উপস্থিতিও বেশ চোখে পড়ে। প্রথম আলোর ফিচারে এই ভিজ্যুয়াল বৈশিষ্ট্যগুলোর কথাও উঠে এসেছে।
অর্থাৎ ৮০-এর দশকের ফ্যাশন শুধু একটা নির্দিষ্ট পোশাকের ব্যাপার ছিল না। নিজের উপস্থিতিটাকে একটু বোল্ডলি উপস্থাপন করার একটা চেষ্টা ছিল।

আর এখন?

মজার ব্যাপার হলো, এই পুরোনো লুক ফিরিয়ে আনছে সবচেয়ে নতুন প্রযুক্তি—AI।
যে ছবিগুলো একসময় তৈরি করতে ক্যামেরা, স্টুডিও, পোশাক, মেকআপ, লোকেশন আর পুরো একটা প্রোডাকশন টিম লাগত, এখন সেগুলোর অনেকটাই কয়েক লাইনের প্রম্পট দিয়ে তৈরি করা যাচ্ছে।
এখানেই হয়তো এই ট্রেন্ডের আসল মজাটা।
আমরা পুরোনো একটা সময়কে ফিরিয়ে আনছি সবচেয়ে নতুন প্রযুক্তি দিয়ে।
আর এই নস্টালজিয়া শুধু ব্যক্তিগত ছবিতে আটকে থাকছে না। মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির নায়ক-নায়িকাদের পাশাপাশি ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডগুলোর ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশনেও ৮০-এর দশকের এই ভাষা দেখা যাচ্ছে। আড়ং এবং তাদের সাব-ব্র্যান্ড তাগা ম্যান-এর সাম্প্রতিক ক্যাম্পেইন শুটেও AI-generated ৮০-এর দশকের লুক ব্যবহার করা হয়েছে—মানে ব্যক্তিগত নস্টালজিয়া থেকে বিষয়টা এখন ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনেও ঢুকে পড়ছে।

এটা খুব একটা অস্বাভাবিকও না।
কারণ আড়ং নিজেই এমন একটি ব্র্যান্ড, যার সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাক, কারুশিল্প, ঐতিহ্য আর সময়ের পরিবর্তনের একটা দীর্ঘ সম্পর্ক আছে। ১৯৭৮ সালে যাত্রা শুরু করা আড়ং আশির দশকেই ধীরে ধীরে ফ্যাশন ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করে; সে সময় থেকেই ফ্যাশন শো, ফটোশুট ও বিভিন্ন মিডিয়া-কেন্দ্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের ব্র্যান্ড পরিচয় তৈরি করেছিল।
তাই আজকের AI দিয়ে তৈরি ৮০-এর দশকের ভিজ্যুয়ালকে একেবারে আলাদা কোনো জিনিসও মনে হয় না। বরং একটা মজার সার্কেল তৈরি হয়—
৮০-এর দশকে যে ফ্যাশন ও ভিজ্যুয়াল কালচার তৈরি হয়েছিল, আজকের প্রযুক্তি সেটাকেই আবার নতুন করে দেখাচ্ছে।

কিন্তু আমরা আসলে কী খুঁজছি?

এই জায়গাটাই বোধহয় সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং।

প্রথম আলোর ফিচারে মিডিয়া ও যোগাযোগবিষয়ক শিক্ষক শরিফুল ইসলামের ব্যাখ্যায়,
এই ট্রেন্ডের মধ্যে নস্টালজিয়া এবং নতুন কিছু দেখার আগ্রহ—দুটোই কাজ করছে।
একই সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও সতর্ক করেছেন, কারণ এ ধরনের AI ব্যবহারে ব্যবহারকারীর ছবি ও তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটাও একটা প্রশ্ন। তবে নস্টালজিয়ার ব্যাপারটা আমার কাছে আরও ইন্টারেস্টিং লাগে।
আমরা এমন একটা সময়কে খুব সুন্দর করে দেখছি, যেটা হয়তো আমাদের অনেকের নিজের স্মৃতিও নয়।
কারও কাছে এটা বাবা-মায়ের পুরোনো অ্যালবাম। কারও কাছে শৈশবের কোনো অস্পষ্ট ছবি।
কারও কাছে পুরোনো সিনেমা। আবার কারও কাছে নিছক একটা সুন্দর ফ্যাশন লুক।

তাহলে কি আমরা সত্যিই ৮০-এর দশকে ফিরতে চাই?

নাকি আমরা এমন একটা সময়ের অনুভূতি খুঁজছি, যেটাকে
আমরা আজকের ডিজিটাল জীবনে কোথাও হারিয়ে ফেলেছি?
যেখানে একটা ছবি তুলতে ২০টা ছবি তোলার দরকার হতো না।
একটা অ্যালবাম মানেই ছিল স্মৃতি। আর ছবির একটু দাগ, একটু গ্রেইন, একটু ভুল—
সেটাই ছবিটাকে আরও নিজের করে তুলত।


আপনার একটি শেয়ার এবং মন্তব্য আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা ❤️

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া লিংক


Email
The form has been submitted successfully!
There has been some error while submitting the form. Please verify all form fields again.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial