কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ

‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই,আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে- এদেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?’

Rudra
Mohammad
Shahidullah

আশির দশকে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠে যে কয়জন কবি বাংলাদেশী শ্রোতাদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠে ছিলেন তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাঁর জনপ্রিয় কবিতার মধ্যে অন্যতম কবিতা ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’। ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন’– এই নির্মম সত্য বারবার স্পর্ধায় তিনি উচ্চারণ করেছেন। সাহস ও স্বপ্নে, শিল্প ও সংগ্রামে আপাদমস্তক নিজেকে মিলিয়ে নিয়েছিলেন আপামর নির্যাতিত মানুষের আত্মার সঙ্গে। বাংলাদেশের কবিতায় এক অবিসস্মরণীয় নাম রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। তারুণ্যের দীপ্ত প্রতীক

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

কবির জন্ম ১৯৫৬ সালে পিতার কর্মস্থল বরিশাল জেলায়। ১৬ই অক্টোবর তিনি বরিশালের আমানতগঞ্জ রেডক্রস হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন।

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সত্তর ও আশির দশকে তার আধুনিক লেখনি ও উপস্থাপনার গুণে তারুণ্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন। এ দেশের তরুণ প্রজন্ম আজও তার কাব্যের মধ্যে দ্রোহের এবং মুক্তির বাণী খুঁজে পায়। তিনি বাংলা সাহিত্যের দ্রোহ ও প্রেমের কবি, স্বপ্ন ও সংগ্রামের কবি।

যৌবনে রুদ্র ছিলেন প্রাণবন্ত এবং কিছুটা উচ্ছন্ন। খেয়ালীপনা তার মধ্যে ছিল না। তার চুল ছিল কোঁকরা। তার মুখে ছিল খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। জিন্স পরতেন প্রায় সময়ই। সবসময় আড্ডা দিতে ভালোবাসতেন। তবে কবিতার ক্ষেত্রে তিনি অনেক মনোযোগী থাকতেন। তার এই অস্থির ভাব নিয়ে কবি শামসুল হক বলেছিলেন, “তার মধ্যে যে বাউন্ডুলেপনা ছিল তা তাকে সুস্থির হতে দেয়নি।”

১৯৮১ সালের ২৯ জানুয়ারি বিয়ে করেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন-কে।
১৯৮৬  তার বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে।

১৯৯১ সালে ২১ জুন শুক্রবার (০৭ আষাঢ় ১৩৯৮) সকাল সাড়ে সাতটায় দাঁত ব্রাশ করার সময়ে Sudden cardiac Arrest – এ আক্রান্ত হন। এর মাত্র ১০/১৫ মিনিট পর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে, ঢাকার ৫৮/এফ পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা ভাষায় অসামান্য কবি রুদ্র।

মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি মারা যান। স্বল্পসময়ে অসংখ্য কবিতা রচনা করেছেন রুদ্র।  ‘সোনালি শিশির’ তার একমাত্র গল্পের বই। তার ‘বিষ বিরিক্ষির বীজ’ নামক একটি নাট্যকাব্য রয়েছে। এছাড়া উপদ্রুত উপকূল (১৯৭৯), ফিরে পাই স্বর্ণগ্রাম ১৯৮২, মানুষের মানচিত্র (১৯৮৪), ছোবল (১৯৮৬), গল্প (১৯৮৭), দিয়েছিলে সকল আকাশ (১৯৮৮), মৌলিক মুখোশ (১৯৯০) কাব্যগ্রন্থগুলোও ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। তার বিখ্যাত “ভালো আছি ভালো থেকো” গানটির জন্য বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি ১৯৯৭ সালে তাকে শ্রেষ্ঠ গীতিকারের (মরণোত্তর) সম্মাননা প্রদান করে। ২০২৪ সালে ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য মৃত্যুর ৩২ বছর পরে একুশে পদক পান দ্রোহের কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।  

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ

হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে যায় ঋণে
অথচ আমার শস্যের মাঠ ভরা।

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা

Rudra Muhammad Shahidullah’s poetry

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ

হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে যায় ঋণে
অথচ আমার শস্যের মাঠ ভরা।
রোদ্দুর খুঁজে পাই না কখনো দিনে,
আলোতে ভাসায় রাতের বসুন্ধরা।
টোকা দিলে ঝরে পচা আঙুলের ঘাম,
ধস্ত তখন মগজের মাস্তুল
নাবিকেরা ভোলে নিজেদের ডাক নাম
চোখ জুড়ে ফোটে রক্তজবার ফুল।
ডেকে ওঠো যদি স্মৃতিভেজা ম্লান স্বরে,
উড়াও নীরবে নিভৃত রুমালখানা
পাখিরা ফিরবে পথ চিনে চিনে ঘরে
আমারি কেবল থাকবে না পথ জানা–
টোকা দিলে ঝরে পড়বে পুরনো ধুলো
চোখের কোণায় জমা একফোঁটা জল।
কার্পাস ফেটে বাতাসে ভাসবে তুলো
থাকবে না শুধু নিবেদিত তরুতল
জাগবে না বনভূমির সিথানে চাঁদ
বালির শরীরে সফেদ ফেনার ছোঁয়া
পড়বে না মনে অমীমাংসিত ফাঁদ
অবিকল রবে রয়েছে যেমন শোয়া
হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে যায় প্রেমে
অথচ আমার ব্যাপক বিরহভূমি
ছুটে যেতে চাই– পথ যায় পায়ে থেমে
ঢেকে দাও চোখ আঙুলের নখে তুমি।

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ

আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই,
আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে-
এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?
বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে,
মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ।
এই রক্তমাখা মটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিলো।
জীর্ণ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আঁধার।
আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়।
এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আড়ষ্ট কুমারী জননী,
স্বাধীনতা, -একি তবে নষ্ট জন্ম?
একি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল?

জাতির পতাকা খামচে ধরেছে আজ সেই পুরোনো শকুন।
বাতাশে লাশের গন্ধ-
নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দোলে মাংসের তুফান।
মাটিতে রক্তের দাগ-
চালের গুদামে তবু জমা হয় অনাহারী মানুষের হাড়।
এ চোখে ঘুম আসে না। সারারাত আমার ঘুম আসে না-
তন্দ্রার ভেতরে আমি শুনি ধর্ষিতার করুণ চিৎকার,
নদীতে পানার মতো ভেসে থাকা মানুষের পচা লাশ,
মুন্ডহীন বালিকার কুকুরে খাওয়া বিভৎস শরীর
ভেসে ওঠে চোখের ভেতরে। আমি ঘুমুতে পারিনা, আমি
ঘুমোতে পারিনা-
রক্তের কাফনে মোড়া কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে
সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা।
স্বাধীনতা, সে আমার স্বজন, হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন-
স্বাধীনতা, সে আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল।
ধর্ষিতা বোনের শাড়ী ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ

এতো সহজেই ভালোবেসে ফেলি কেন!
বুঝি না আমার রক্তে কি আছে নেশা-
দেবদারু-চুলে উদাসী বাতাস মেখে
স্বপ্নের চোখে অনিদ্রা লিখি আমি,
কোন বেদনার
বেনোজলে ভাসি সারাটি স্নিগ্ধ রাত?
সহজেই আমি ভালোবেসে ফেলি,
সহজে ভুলিনা কিছু-
না-বলা কথায় তন্ত্রে তনুতে পুড়ি,
যেন লাল ঘুড়ি একটু বাতাস পেয়ে
উড়াই নিজেকে আকাশের পাশাপাশি।

সহজে যদিও ভালোবেসে ফেলি
সহজে থাকি না কাছে,
পাছে বাঁধা পড়ে যাই।
বিস্মিত তুমি যতোবার টানো বন্ধন-
সুতো ধ’রে,
আমি শুধু যাই দূরে।
আমি দূরে যাই-
স্বপ্নের চোখে তুমি মেখে নাও ব্যথা-
চন্দন চুয়া,
সারাটি রাত্রি ভাসো উদাসীন
বেদনার বেনোজলে…
এতো সহজেই ভালোবেসে ফ্যালো কেন?

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ

চিরদিন যে রমনী গভীর বিশ্বাসে
খুলে দিয়েছে শরীরের যাবতীয় পোশাক
সময়ে_অসময়ে, কালে-অকালে
বার বার মেতেছে নিষিদ্ধ অবৈধ সংগমে,
প্রতিবার এক উষ্ম প্রত্যয়ে হয়েছে অন্তসত্ত্বা ।

যে রমনী শুয়ে আছে স্নেহের অশ্লীল ভঙ্গিতে
তার তপ্ত ঘামের সোঁদা ঘ্রাণে একদিন অবক্ষয় ছেড়ে
আমি জ্বলন্ত যুবক হয়ে শুয়ে ছিলাম বিপরীতে ।
বায়ান্নর অবৈধ প্রসব তার স্বপুরুষ আজ
একাত্তরের সন্তান তার যক্ষাক্রান্ত হলো ।
সে যক্ষা একাত্তরের নয়- সে যক্ষা আমার-
সে কঠিন যক্ষা আমাদের সমস্ত শরীরে ।

বিদেশী নোতুন মডেলের দুরন্ত চাকায়
মুছে গেছে জন্মের রক্ত, কিশোরী আকাংখা ।
আমার আধগতি দেখে বন্ধুরা হাসে বলে ‘এ কেমন সন্তান হলো!’

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ

খুব কাছে এসো না কোন দিন
যতটা কাছে এলে কাছে আসা বলে লোকে
এ চোখ থেকে ঐ চোখের কাছে থাকা
এক পা বাড়ানো থেকে অন্য পায়ের সাথে চলা
কিংবা ধরো রেল লাইনের পাশাপাশি শুয়ে
অবিরাম বয়ে চলা ।
যে কাছাকাছির মাঝে বিন্দু খানেক দূরত্বও আছে
মেঘের মেয়ে অতো কাছে এসোনা কোন দিন
দিব্যি দিলাম মেঘের বাড়ীর, আকাশ কিংবা আলোর সারির।

তার চেয়ে বরং দূরেই থেকো
যেমন দূরে থাকে ছোঁয়া, থেকে স্পর্শ
রোদ্দুরের বু্‌ক, থেকে উত্তাপ
শীতলতা, থেকে উষ্ণতা
প্রেমে্‌র, খুব গভীর ম্যাপে যেমন লুকিয়ে থাকে ভালোবাসা
তেমন দূরেত্বেই থেকে যেও-
এক ইঞ্চিতেও কভু বলতে পারবে না কেউ
কতটা কাছা কাছি এসেছিলে বলে দূরত্বের পরিমাপ দিতে পারেনি পৃথিবী।

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ

সারারাত স্বপ্ন দেখি, সারাদিন স্বপ্ন দেখি
যে-রকম আকাশ পৃথিবী দ্যাখে, পৃথিবী আকাশ,
একবার অন্ধকারে, একবার আলোর ছায়ায়
একবার কুয়াশা-কাতর চোখে, একবার গোধুলির ক্লান্ত রোদে-
সারারাত স্বপ্ন দেখি-সারাদিন স্বপ্ন দেখি।
একখানি সুদূরের মুখ জ্ব’লে থাকে চেতনার নীলে,
কে যেন বাদক সেই স্বপ্নের ভেতরে তোলে বিষাদের ধ্বনি
আঁকে সেই প্রিয়মুখে-সুদূরের মুখে
বর্ণময় রঙিন বিষাদ।

ফিরে আয় বোলে ডাকি- সে বাদক উদাসিন থামে না তবুও…
সারারাত স্বপ্ন দেখি, সারাদিন স্বপ্ন দেখি-
স্বপ্নের ভেতরে তুমি হে আমার বিষণ্ন সুন্দর
চোখের সমুখে আজ কেন এসে দাঁড়ালে নিঠুর!
কেন ওই রক্তে-মাংসে, কেন ওই নশ্বর ত্বকের আবরণে
এসে আজ শুধোলে কুশল?

হে আমার বিষণ্ন সুন্দর
হৃদয়ের কূল ভেঙে কেন আজ এতো জল ছড়ালো শরীরে
কেন আজ বাতাসে বসন্ত দিন ফিরে এলো কুয়াশার শীতে!

কে  সেই বংশীবাদক স্বপ্নের শিয়রে বসে বাজাতেন বাঁশি
বেদনার ধ্বনি তুলে রাত্রি দিন, সে আজ হারালো কোথায়?

বেদনার রঙ দিয়ে আমি যারে আঁকি
হৃদয়ের রক্ত দিয়ে আমি যারে আঁকি
আমার কষ্ট দিয়ে, আমার স্বপ্ন দিয়ে যে আমার নিভৃত নির্মাণ
সেই তুমি- হে আমার বিষণ্ন সুন্দর
মর্মমূল ছিঁড়ে এসে ঠাঁই নিলে কেন এই মাংসের বুকে!
কেন ওই বৃক্ষতলে, কেন ওই নদীর নিকটে এসে বোলে গেলে
তোমার ঠিকানা!

আমি তো প্রার্থনাগুলো শস্যের বীজের মতো দিয়েছি ছড়িয়ে
জল তাকে পুষ্টি দেবে, মাটি তাকে ভূমি দেবে, তুমি তার গভীর ফসল-
বাতাসে তুলোর মতো তুমি তবে উড়ে এলে কেন!
কেন আজ পোড়া তুষের গন্ধে শুধু জন্মের কথা মনে পড়ে!
শৈশব কৈশোর এসে মিশে থাকে ফাল্গুনের তুমুল হাওয়ায়
একটি রাত্রি কেন হয়ে ওঠে এতো দীর্ঘ দীর্ঘ রাত?

হে আমার বিষণ্ন সুন্দর
দু’চোখে ভাঙন নিয়ে কেন এই রুক্ষ দুঃসময়ে এলে
কেন সমস্ত আরতির শেষে আজ এলে শূন্য দুখানি হাত!
কেন এলে, বিষণ্ন সুন্দর, তুমি কেন এলে?

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ

চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।

জানি চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে-
জীবন সুন্দর
আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র
সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর
আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা
তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়!
বিদায়ের সেহনাই বাজে
নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে
সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে
এই যে বেঁচে ছিলাম
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয়
সবাইকে
অজানা গন্তব্যে
হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি
অজান্তেই চমকে ওঠি
জীবন, ফুরালো নাকি!
এমনি করে সবাই যাবে, যেতে হবে…

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ

ভালবাসার সময় তো নেই
ব্যস্ত ভীষণ কাজে,
হাত রেখো না বুকের গাঢ় ভাঁজে।
ঘামের জলে ভিজে সাবাড়
করাল রৌদ্দুরে,
কাছে পাই না, হৃদয়- রোদ দূরে।
কাজের মাঝে দিন কেটে যায়
কাজের কোলাহল
তৃষ্ণাকে ছোঁয় ঘড়ায় তোলা জল।

নদী আমার বয় না পাশে
স্রোতের দেখা নেই,
আটকে রাখে গেরস্থালির লেই।
তোমার দিকে ফিরবো কখন
বন্দী আমার চোখ
পাহারা দেয় খল সামাজিক নখ।



কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ

জন্মদিনের শুভেচ্ছা

পাখিরা ফিরবে পথ চিনে চিনে ঘরে আমারি কেবল থাকবে না পথ জানা

ড. সেলিম জাহান এর ডায়েরি থেকে

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। তবে তাঁর কবিতার ভক্ত আমি চিরদিন। রবীন্দ্রনাথ ভিন্ন আমার লেখালেখিতে যে দু’জন কবির কবিতার পংক্তিমালা আমি সবচেয়ে বেশী ব্যবহার করেছি, তাঁর একজন বন্ধুবর কবি হেলাল হাফিজ, অন্যজন প্রয়াত কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ। তাঁর ‘আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ এখনও মাঝে মধ্যেই আওড়াই।

মনে আছে, নব্বুইয়ের দশকে কোন একবার বার্লিনে গেলে কবি দাউদ হায়দার আর আমি পুরো একরাত কাটিয়েছিলাম বার্লিনের পথে পথে হেঁটে এবং গল্প করে। সে রাতে রুদ্রের কত কবিতার চরন যে মুখে মুখে আবৃত্তি করেছিলাম দু’জনে। সে সব কবিতার কিছু কিছু আজকের বাংলাদেশের জন্যে বড় বেশী প্রাসঙ্গিক।
‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই,আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে- এদেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?’

কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ প্রয়াত বহুদিন – প্রায় ৩০ বছর। তবু তাঁর কবিতার অঙ্গনে আমার নিত্যদিন ঘোরাফেরা – ‘নয়ন সমুখে’ না থাকলেও হৃদয়ের মাঝখানেই তাঁর ঠাঁই। আজ তাই কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর জন্মদিনে অতল গহীন শুভেচ্ছা।

facebook থেকে নেয়া :

মন্তব্য করেন | 

Saifur Rahmanরুদ্র কি যে বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন নব্বুইয়ের দশকের তরুণদের উপর! অনেকটা হেলাল হাফিজের মতো।

রুদ্র প্রায়শই চলমান স্রোতের বাইরে চলে যেতেন, অভিনবত্ব যেন তার চরিত্রের অন্যতম দিক।আমার মনে পড়ে প্রথম জাতীয় কবিতা উৎসবের কথা। ৮৭ সালের স্বৈরাচারবিরোধী উত্তাল সময়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মঞ্চবিহীন আয়োজনে আমরা জনা পঞ্চাশেক শ্রোতা-দর্শক।

এরশাদ বিরোধী বিবৃতি দেয়ায় কবি শামসুর রাহমানের নাম বাদ দেয়া হয়েছে দৈনিক বাংলার সম্পাদক পদ থেকে। শামসুর রাহমান আসেনি, তার অসাধারণ ‘নাম’ কবিতাটি আবৃত্তি করলেন রুদ্র। সভাস্থল যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলো তার উচ্চারণের তীব্রতায় – ” বললেন তিনি জলদমগ্ন স্বরে সুদুর কালের কোন এক মহারাজ ক্যানুটের মতো- মুছে ফেলো তার নাম “।

তারপর যখন তার স্বরচিত কবিতা পাঠের পালা এলো তিনি শোনালেন বিস্মৃত হতে বসা পুঁথির সুরে তার কবিতা। আমরা আরেক দফা চমৎকৃত। পুরো আয়োজনটা যেন তার হয়ে গেলো।অনেক শ্রদ্ধা তার স্মৃতির উদ্দেশে।

Rafiqul Islam Sarkerরুদ্র রুদ্রই, কেন যেন অসম‌য়ে চ‌লে যাওয়া। ভাল বু‌ঝি ক্ষণকাল মাত্রই। জন্ম‌দি‌নে শু‌ভেচ্ছা শ্রদ্ধা

Zahid Mustafaরুদ্র দা ছিলেন আমাদের বড় আপনজন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্ত্বরে আমাদের আড্ডার মধ্যমণি!

Ashoke Duttaগভীর ভালবাসা ও সমীহ এই অকাল প্রয়াত তেজদীপ্ত শুদ্ধ সত‍্যের মৃত্তিকাশ্রয়ী কবির প্রতি।

Mahfuza A Hassanঠিক বলেছেন সেলিম ভাই – কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ’র কবিতার কিছু কিছু অংশ আজও বড় প্রাসঙ্গিক। ৯০’এর সেসব দিনগুলোতে রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ’র কবিতা খুব আপন ছিল। কবি’র জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

Rezaul Karimরুদ্রভাইকে ঘিরে তরুণ ও উদীয়মান কবি-সাহিত্যিক- শিল্পীদের দিনভর আড্ডার স্মৃতি আজও মনে ভাসে। তাঁর কবিতা আমাদের খুব আলোড়িত ও উদ্দীপ্ত করেছিল। আজও তিনি কত প্রাসঙ্গিক!প্রিয় কবির জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।

Bahauddin Ahmed Mamunজন্ম দিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে শ্রদ্ধাভরে স্মরন করছি ৯০ দশক এর সেই উত্তাল দিনগুলোর কবিকে।

Hemayet Haroonবিনম্র শদ্ধা। কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ।রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, হেলান হাফিজ এরা এক একজন বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। এরা এ দেশের ক্ষনজন্মা পুরুষ।সেই সাথে আরও একজনের নাম উচ্চারণের লোভ সামলাতে পারলাম না। তিনি প্রয়াত আহম্মদ ছফা। এদের যথার্থ মূল্যায়ন করা আমার মত একজন নগন্য লোকের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব।শুধু এই টুকুই বলতে ইচ্ছা করে—— ফুল চিরদিন নিরবে ঝরে যায়—- প্রতিদান সে কি পায় ——।কিন্তু এই ফুল গুলো তো শুধু নিরবে নয়, অকালেই ঝরে গেল———-।

Syed Mohammed Tarekগুড্ডি বানাইয়া রাখিলে উড়াই –কি সুন্দর চিন্তা। অনিন্দ্য সুন্দর চিন্তা ও বাস্তব জীবনের আলোকে লিখিত তাঁর অমর সৃষ্টির প্রতি রইল বিনম্র। শুভ জন্ম দিন।


ডিসেম্বর 13, 2024
Helal Hafiz কবি হেলাল হাফিজ x bfa x fxyz web

কবিতায় আগুন জ্বালিয়ে রাখা এক কবি: হেলাল হাফিজ

bdfashion archive
ব্যক্তিজীবনে খুব শান্ত আর অন্তর্মুখী স্বভাবের মানুষ হলেও তিনি ছিলেন প্রবলভাবে রাজনীতি সচেতন, কিন্তু চরিত্রে…
ডিসেম্বর 13, 2024

সূত্র : ফেসবুক

লেখকের ফেসবুক লিংক : ড. সেলিম জাহান


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial