যশোরের গদখালীতে ফুলের বাজার flower haat godkhali jessor x bfa x fxyz

ফুলই যেখানে ফসল | যশোর জেলার গদখালী

যত্নে বেড়ে ওঠা  ফুল গুলো পৌছে যায় কোন ভালোবাসার মানুষের হাতে ভালবাসা হয়ে কিংবা কারো শ্রদ্ধার বাহন হয়ে।

দিগন্তজুড়ে লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি আর সাদা রঙের এক বিশাল চাদর। কোথাও পুরো মাঠ জুড়ে শুধু নীল, কোথাও আবার বাসন্তি রঙে ঢেকে আছে সবটা। বাতাসে ফুলের মিষ্টি গন্ধ, চারপাশে মৌমাছির গুঞ্জন, ধীরে ধীরে প্রজাপতি উড়ে যাচ্ছে এক ফুল থেকে আরেক ফুলে।

এই জন্যই তো বলা হয়—ছবির মতো সুন্দর। আসলেই পুরো গ্রামটাই ছবির মতো।
বলছি যশোর জেলার গদখালীর কথা।

এখানে ফুল শুধু বাড়ির আঙিনার শখের বাগান নয়। হাজার হাজার বিঘা জমিতে স্থানীয় কৃষকরা ফুল চাষ করেন। তাদের যত্নে ফোটা ফুলগুলো পৌঁছে যায় প্রিয় মানুষের হাতে ভালোবাসা হয়ে, আবার কারও কাছে যায় শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে। সামনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বসন্ত উৎসব আর ভ্যালেন্টাইনস ডে। এই সময় ফুল বেচা-কেনায় ব্যস্ত গদখালীর কৃষক আর ক্রেতারা। দেশের মোট ফুলের চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশই আসে যশোর থেকে।

ফুলের রাজ্য যশোরের
গদখালী শুরুর ইতিহাস
.

জানা যায় ১৯৮৩ সালে প্রথম যশোরের ঝিকরগাছা থানার পানিসরা গ্রামের শের আলী ব্যবসায়ী ভিত্তিতে রজনীগন্ধা ফুলের চাষ শুরু করেন। শের আলীর বাবা আব্দুর রহমান সর্দার নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নার্সারি ‘সর্দার নার্সারি’-এর মালিক ছিলেন তিনি। আব্দুর রহমান দীর্ঘ ৩০ বছর নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকে বিভিন্ন রকম ফলজ ও বনজ বৃক্ষের চারা উৎপাদন করতেন। শের আলী বাবার সাথে ব্যবসায় যুক্ত হন এবং গাছের চারা সংগ্রহ করার জন্য বেশ কয়েকবার ভারতে যান চারা উৎপাদনের কলা-কৌশল শিখতে। সেই সময় ভারত থেকে আসা ফুলের চাহিদা বেশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই তিনি চিন্তা করলেন চশ্চিমবঙ্গে যদি এসব ফুলের চাষ হয় তবে আমাদের মাটিতে নয় কেনো। সেই চিন্তা থেকেই তিনি রজনীগন্ধার চাষ শিখে আসেন। সঙ্গে করে নিয়ে আসেন রজনীগন্ধার বীজ। তারপর তিনি ১৯৮৪ সালে নিজ গ্রামে এক বিঘা জমিতে শুরু করেন রজনীগন্ধার চাষ।

প্রথম বছরেই অন্যান্য ফসলের তুলনায় ফুলচাষ লাভজনক হয়। এক বিঘা জমি থেকে তিনি তিন বিঘা জমিতে চাষ শুরু করেন। এবং লাভজনক হওয়ায় পানিসরা ছাড়াও আশপাশের গ্রামের অনেক চাষী ফুল চাষে উঠেপড়ে লাগেন। ব্যপক ভিত্তিতে রজনীগন্ধা ফুল উৎপাদন শুরু করেন। যা আজকের ফুলের রাজ্যে পরিনত হয়েছে।

ফুলের রাজ্য যশোরের গদখালী (12)

যশোরের গদখালীতে ফুলের বাজার

শুরুর দিকে এখানে ফুলের কোন বাজার ছিল না। ঢাকার ব্যবসায়ীরা লোক মারফত সরাসরি এখান থেকে ফুল বাকিতে কিনে নিয়ে যেতো। কোন কোন ক্ষেত্রে কৃষকরাও ফুল ঢাকায় পৌছে দিতো। ঝামেলা বাধে যখন বাকির অঙ্ক বাড়তে থাকে এবং মহাজনরা টাকা প্রদানে গড়িমসি শুরু করে। তাতে এলাকার ফুল চাষী বিদ্রেহ শুরু করে এবং ঘোষনা দেয় যে ফুল আর বাকিতে বিক্রি হবে না এবং ফুলের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে।

যার পেক্ষিতে ১৯৯৫ সালে স্থানীয় ফুল চাষীদের নিয়ে গড়ে উঠলো ফুল চাষী কল্যাণ সমিতি। এবং ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু হয় ঝিকরগাছা থানার গদখালি রহিম মার্কেট পাশে ফুলের বাজার। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এ বাজারে ফুল কেনাবেচা হয়। 

সারাবছর কমবেশি ফুল বেচাকেনা হলেও মূলত ১৩ ফেব্রুয়ারি বসন্তবরণ উৎসব,
পরদিন ভ্যালেন্টাইনস ডে আর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সামনে রেখেই
জমজমাট হয়ে ওঠে এ ফুলের বাজার।



ফুলের বাজারে কি কি ধরনের ফুল পাওয়া যায়?

গদখালি ও পানিসারা এলাকায় সাড়ে ৬ হাজারের বেশি কৃষক বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন রজনীগন্ধ্যা, গোলাপ, রডস্টিক, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, জিপসি, কেলেনডোলা, চন্দ্রমল্লিকা, টিউলিপসহ ১২ ধরনের ফুল।  যা এই ফুলের বাজারে পাইকারি এবং খুচরো বিক্রি করা হয়। পাইকাররা এ ফুল ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, বরিশাল, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ছাড়াও দেশের নানা স্থানে চালান করে। সারাদেশ তো বটেই, যশোরের গদখালী গ্রামের ফুল যাচ্ছে বিদেশেও।

সাম্প্রতি শীত প্রধান দেশের ফুল টিউলিপ চাষের মাধ্যমে গদখালিতে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। শীতপ্রধান দেশের দামি টিউলিপ ফুল চাষ করে সকলকে অবাক করে দিয়েছেন পানিসারার ফুলচাষি ইসমাইল হোসেন। তার পাঁচশতক জমিতে ফুটেছে বিভিন্ন রঙের সাত প্রকারের টিউলিপ ফুল।

যশোরে কোথায় কোথায় ফুলের চাষ হয়?

গদখালি, পানিসারা, হাড়িয়া, নীলকন্ঠ নগর, চাওরা, কৃষ্ণচন্দ্রপুর, চাঁদপুর, বাইশা,পাটুয়াপাড়া, নারানজালি গ্রামসহ আশেপাশে এলাকাজুড়ে প্রায় ৫০টি গ্রামে ফুল চাষ হয়ে থাকে।

ফুলের রাজ্য যশোরের গদখালী (1)

পর্যটন সম্ভাবনার কথা বলতে চাই:

গদখালীতে ফুলচাষের সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটন বিকাশের উদ্যোগ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। প্রতি বছর শীতকালীন মৌসুমে বিশেষ করে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে এখানে “ফুল উৎসব” আয়োজন করা হয়, যা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই উৎসব মূলত চার দিনব্যাপী চলমান থাকে এবং এতে ফুলের প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, এবং স্থানীয় পণ্যসামগ্রীর মেলা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে বাউল গান, লোকনৃত্য এবং নাট্য প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, যা এলাকার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে।

ফুল উৎসবের মাধ্যমে গদখালীতে প্রতিবছর হাজারো পর্যটক আসেন, যা স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতে আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে। পাশাপাশি, ফুলচাষীরা সরাসরি ক্রেতার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন, যা তাদের আয়ের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

পর্যটকদের আগমন স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গ্রামীণ সৌন্দর্য এবং ফুলের বাগান ঘিরে পর্যটকদের আকর্ষণের কারণে গ্রামবাসীরা নিজেদের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও আকর্ষণীয় রাখতে উদ্যোগী হয়েছে।

ফুল উৎসবের এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ কেবল গদখালীর নয়, বরং দেশের পর্যটন শিল্পের জন্য একটি নতুন মাইলফলক হতে পারে। এটি ফুলচাষের সাথে গ্রামীণ সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের একটি অনন্য পরিচিতি গড়ে তোলার সম্ভাবনা রাখে।


আমাদের সাথে সংযুক্ত হতে পারেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম


তথ্যসূত্র:

somewhereinblog.net

bangla.thedailystar.net

www.bssnews.net

www.tbsnews.net


December 9, 2025
pabna jora bangla mandir পাবনার জোড়বাংলা মন্দির x bfa x fxyz

পাবনার জোড়বাংলা মন্দির—এক ঐতিহাসিক স্থাপনা

বাংলার জোড়বাংলা মন্দির বলতেই মনে আসে— দিনাজপুরের কান্তনগর/কান্তজীউ মন্দির, পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর জোড়বাংলা মন্দির। পাবনার এই মন্দির সেই ঐতিহ্যের…
December 9, 2025

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial