নারিকেলের মালার ( বরিশালে নারিকেলের আইচা নামে পরিচিত) শোপিসের সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল যখন আমি ক্লাস এইট কি নাইনে পড়ি—বয়সটা ১৩-১৪ হবে। বরিশালে বৈশাখী মেলার ভিড়ে ঘুরছি, হঠাৎ একটা স্টলের সামনে পা আটকে যায়। স্টলের নামটা মনে নেই, কিন্তু যা দেখলাম, সেটা আমার মাথায় গেঁথে গেছে। নারিকেলের মালা দিয়ে বানানো কুড়ে ঘর, নারিকেলের মালার ভিতর গ্রামের দৃশ্য, ফুলদানি, গহনা, ল্যাম্প শেড—একেকটা জিনিস যেন চোখের সামনে জাদু ফুটিয়ে তুলছিল। “এটাও কী সম্ভব?” কেন এত অবাক হলাম? কারণ, আমার মাথায় এই আইডিয়া আগেও ঘুরেছে। বাসায় দেখেছি, ডাল-উঠানোর জন্য নারিকেলের মালা দিয়ে চামচ বানানো (উড়ি টাইপ কিছু একটা নামে ডাকা হত) , লবণ তুলছে নারিকেলের আইচা দিয়ে। এমনকি আমি নিজেও একবার শিক গরম করে মালায় ফুটো করে একটা কাঁচা-পাকা ল্যাম্প শেড বানিয়েছিলাম—যদিও সেটা দেখতে বেশি হাস্যকর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মেলায় যা দেখলাম, সেটা ছিল অন্য লেভেল—যেন কেউ আমার ছোট ছোট ভাবনা গুলো বাস্তবে দেখা যাচ্ছে।
মুগ্ধতা থেকে কৌতূহল জাগল। স্টলের লোকদের কাছ থেকে কারখানার ঠিকানা জোগাড় করলাম—“হাসিনা কুটির শিল্প”। একদিন দুপুরে, সাইকেলে প্যাডেল ঠেলে সেখানে হাজির। গিয়ে দেখি একটা ছোট্ট ঘর, চারপাশে নারিকেলের আইচার পাহাড়। এক কোণে কাটার মেশিন গর্জাচ্ছে, ধুলো উড়ছে, আর কয়েকজন কর্মী হাতে হ্যাকসো ব্লেড নিয়ে মালা কাটছে। গন্ধটা ছিল কাঠ আর নারিকেল মেশানো, একদম আপন আপন। মনে হচ্ছিল, আমি এখানে বসে পড়ি আর এদের সাথে কাটাকাটি শুরু করি। মালিকের সাথে দুয়েকটা কথা হলো—কী বলেছিলাম, ভুলে গেছি। তবে তিনি আমার হাতে কিছু ভাঙা শোপিসের টুকরো ধরিয়ে দিলেন, টাকা নিলেন না। ফেরার পথে একটা হ্যাকসো ব্লেড কিনে ফেললাম—ভাবলাম, বাড়ি গিয়ে কিছু একটা বানাবই। কী বানিয়েছিলাম, সেটা মনে নেই, তবে হাত কেটে ফেলার ভয়ে কাটাকাটি বেশি দূর এগোয়নি।
স্টলে আরেকটা জিনিস চোখে পড়েছিল। আমার থেকে দুই-তিন বছরের বড় একটা ছেলে, আরিফ নাম তার। কারখানায় গিয়েও তার সাথে দেখা। পরে জানলাম, সে মালিকের ছেলে। তারপর অনেক গুলো বছর কেটে গেল। ২০১২/১৩ সালের কথা, তখন আমি কালের স্রোতে আড়ং-এ ডিজাইনার হিসেবে কাজ শুরু করি। একদিন আড়ং-এ অফিসে হঠাৎ আরিফ ভাইকে দেখি। ১৫-২০ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু তার চেহারাটা মাথায় ছিল—এক নজরে চিনে ফেললাম। কথা হলো। জানলাম, “হাসিনা কুটির শিল্প” প্রায় ৩০ বছর ধরে আড়ং-এর সাথে যুক্ত। তাদের বানানো শোপিস এখন দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। সেদিন বুঝলাম, আমার ছোট্ট মুগ্ধতা শুধু স্বপ্ন ছিল না—এটা একটা বড় সম্ভাবনার শুরু ছিল।
নারিকেলের মালা নিয়ে আমার ছোট্ট স্বপ্নগুলো যেন আরিফদের কারখানায় গিয়ে বাস্তব হয়ে উঠেছিল। আর এই অভিজ্ঞতার শেষে আমি যোগ করতে চাই “হাসিনা কুটির শিল্প” নিয়ে লেখা একটি আর্টিকেলের অংশ। এটি ২০১৪ সালে কালের কণ্ঠ-এ প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে মালিক আনোয়ার হোসেন মন্টুর গল্প ফুটে উঠেছে আর কিছু তথ্য আরিফ ভাইয়ের কাছ থেকে জানা।