SHOTRANJI শতরঞ্জি, রংপুরের ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প x bfa x fxyz web

weaving technique of the Rangpur region of Bangladesh. GI product of Bangladesh

শতরঞ্জি, রংপুরের ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প

রংপুরের ঘাঘট নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার জলবায়ু এবং ঘাঘট নদীর পানি শতরঞ্জি বুননের উপযোগী। যেমন জামদানির জন্য উপযোগী শীতলক্ষ্যা নদীর পানি।

শতরঞ্জি বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী কারুপণ্য। প্রায় ৭০০ বছরের প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে এই কারুপণ্যের। জানা যায়, রংপুর জেলার তাঁতিরা ৭০০ বছর আগে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে একধরনের মোটা কাপড় তৈরি করতেন যা ওই সময়ে অভিজাত শ্রেণির গৃহে বা খাজাঞ্চিখানায় বিশেষ আসন হিসেবে ব্যবহৃত হতো যা বিবর্তনের মধ্যো দিয়ে আজ রংপুরের শতরঞ্জি নামে পরিচিত।

শতরঞ্জি বা ডুরি মূলত একপ্রকার কার্পেট। যা এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন বুনন পদ্ধতি হিসেবে বিদ্যমান। শতরঞ্জি  বয়ন কৌশলের দিক দিয়ে আধুনিক ট্যাপেস্ট্রির অনুরূপ একটি শিল্প। এখনও শতরঞ্জি উৎপাদন করতে যন্ত্রের দরকার হয়না। বাঁশ ও রশি ব্যাবহার করে মাটির উপর সুতা দিয়ে টানা তৈরি করা হয়। এরপর প্রতিটি সুতা গননা করে হাত দিয়ে নকশা করা হয়। 

রংপুরের শতরঞ্জি ও প্রাচীন ইতিহাস

History of Rangpur Sataranji

রংপুরের ঘাঘট নদীর তীরে নিসবেতগঞ্জ নামে একটি গ্রাম আছে। এর আগের নাম ছিল পীরপুর। শতবছর আগে এই গ্রামের মানুষ বাঁশ দিয়ে একটি তাঁত যন্ত্র তৈরি করে। এই যন্ত্র দিয়ে তারা মোটা সুতি কাপড় ও উল দিয়ে এক ধরনের পাটি জাতীয় বস্তু তৈরি করে। একে বলা হত মালুদা। শিল্পীরা গ্রামের সুন্দর দৃশ্য নিয়ে এসব মাদুলা তৈরী করত। এই সুন্দর মালুদা রাজা-বাদশারাও পছন্দ করতেন। এবং এর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পরে।

১৯১২ সালে প্রকাশিত রংপুর গেজেটিয়ারে ইতিহাসবিদ উইলিয়াম হান্টার উল্লেখ করেন ১৮৩০ সালে নিসবেত নামে একজন ব্রিটিশ কালেক্টর আসেন রংপুরে। তিনি এই মালুদার সৌন্দর্য দেখে অনেক অভিভূত হন। এবং তিনি এই শিল্পটির মান উন্নয়ন এবং এর প্রচার চালাতে সাহায্য করেন। তাঁর নাম অনুসারে এই গ্রামের নাম পীরপুর এর বদলে হয় নিসবেতগঞ্জ। এবং মালুদা নামটিও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে শতরঞ্জি হয়।

শতরঞ্জি তৈরির প্রধান উপকরণ সুতা। রংপুরের ঘাঘট নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার জলবায়ু এবং ঘাঘট নদীর পানি শতরঞ্জি বুননের উপযোগী। যেমন জামদানির জন্য উপযোগী শীতলক্ষ্যা নদীর পানি। বিশ্বের অন্য কোথাও এ শতরঞ্জি বুনন হয় না। ঘাঘট নদীর পানির সঙ্গে রং মিশিয়ে কটন সুতা ও পাটের সুতা রং করা হয়, যার ফলে সৌন্দর্য, উজ্জ্বলতা এবং রং এর স্থায়ীত্ব অনেক বেশি থাকে। তাইতো রংপুরের আবহাওয়া ও জলবায়ু তথ্য প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণেই রংপুরে শতরঞ্জি শিল্পের কারুশিল্প গড়ে উঠেছে শত শত বছর পূর্বে।

শতরঞ্জিপাড়ায় বর্তমানে ৮০/৯০টি পরিবার শতরঞ্জি শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

রংপুরের শতরঞ্জি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত।  

জিআই পণ্য হিসেবে রংপুরের শতরঞ্জি নিবন্ধনের জন্য ২০১৯ সালের ১১ জুলাই বিসিক পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক্স অধিদপ্তরে আবেদন করে। পরে ২০২০ সালের নভেম্বরে ‘বাংলাদেশ ফর্মস এন্ড পাবলিকেশন্স অফিস’ এ “রংপুরের শতরঞ্জি”র জার্নাল প্রকাশিত হয় এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে শতরঞ্জির ভৌগোলিক নির্দেশক সনদ দেয় ডিপিডিটি।  

SHOTRANJI শতরঞ্জি nisbedgonj, রংপুরের ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প x bfa x fxyz n
SHOTRANJI শতরঞ্জি, রংপুরের ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প x bfa x fxyz 1

শতরঞ্জির নামকরন

Different name of sataranji

বলা হয় শতরঞ্জি শব্দটি ফার্সি শব্দ শতরঞ্জ থেকে এসেছে। শতরঞ্জ হল দাবা খেলার ছক। দাবা খেলার ছকের সাথে শতরঞ্জির নকশার মিল আছে। সেখান থেকেই শতরঞ্জি নামটি হয়েছে। আবার কারও কারও মতে শতরঞ্জি শব্দের অর্থ শত রঙের বাহার বা সতের রঙের সুতা ব্যবহারের কারণে এর নাম শতরঞ্জি।

শতরঞ্জির বুনন কৌশল

Weaving technique of Shataranji

শতরঞ্জি তৈরির প্রধান উপকরণ সুতলি। এছাড়া বাঁশ, পাঞ্জা, কঞ্চি, ফিতা ইত্যাদি শতরঞ্জি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। মূলত স্থানীয় বাজার থেকে কটন সুতা, পাট, শ্যানালসহ (উল জাতীয়) বিভিন্ন ধরণের ফাইবার কিনে প্রয়োজনমত রং করে শুকিয়ে নেয় তাঁতীরা। শতরঞ্জি তৈরিতে সুতা রং করা উৎপাদন প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। রংপুরের ঘাঘট নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার জলবায়ু এবং ঘাঘট নদীর পানি সুতার রঙের উজ্জ্বলতা এবং রঙ এর স্থায়ীত্ব অনেক বেশি থাকে।

সেই রঙ করা সুতা চরকায় বসানো হয় বান্ডিল তৈরি করার জন্য। এবং ডিজাইন অনুযায়ী সুতা টানা দেওয়া হয় বাঁশের ফ্রেমে। টানার দৈর্ঘ্য সাধারণত দশ থেকে পয়ত্রিশ ফুট হয়ে থাকে। তারপর তাঁতে বা মেঝেতে বিছিয়ে ডিজাইন অনুযায়ী হাতে বোনা হয় শতরঞ্জি। হাতের কৌশলই শতরঞ্জি নির্মাণের মূলভিত্তি তবে সুতার গাথুঁনি শক্ত করার জন্য পাঞ্জা (চিরুনীর মতো দেখতে বিশেষ যন্ত্র) ব্যবহার করা হয়। তৈরি শেষে শতরঞ্জির বাঁশকে ছাড়িয়ে নেয়ার পর দুই প্রান্তে সুতা মুড়িয়ে দেয়া হয়। তারপর কাঁচি দিয়ে সুতা কেটে শতরঞ্জিটি হালকা রোদে শুকানো হয়। এরপর ব্রাশ ও বান্ডিল করে শোরুমে অথবা গ্রাহকের কাছে বাজারজাত করা হয়।

শতরঞ্জি তৈরিতে প্রয়োজন অনুযায়ী এক বা একাধিক কারিগর কাজ করে থাকেন। একজন শ্রমিকের ১ বর্গফুট শতরঞ্জি নির্মাণে সময় লাগে ১ থেকে ৩ ঘণ্টা। সময়ের বিবর্তনে একই বুনন পদ্ধতিতে শতরঞ্জির ওয়ালম্যাট, টেবিলম্যাট, কুশন কভার, সোফার রুমাল, জায়নামাজ, পাপোশও তৈরি হচ্ছে।

SHOTRANJI শতরঞ্জি, রংপুরের ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প x bfa x fxyz 2

শতরঞ্জির নকশা

Design of Shataranji

গ্রামীণ কারুশিল্পীরা কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই কেবল মাত্র নিজস্ব মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বংশ পরম্পরায় তৈরি করছে বিভিন্ন ধরনের শতরঞ্জি। শতরঞ্জি তৈরিতে সাধারণতঃ দুই ধরনের মোটিভ নকশায় ব্যবহার করা হয়। একটি প্রাচীন বা ঐতিহ্যবাহী নকশা এবং অপরটি আধুনিক নকশা।

প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত নানা ধরনের বাহারি নকশা শতরঞ্জি শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রাচীন নকশাগুলোর মধ্যে হাতির পা, জাফরি, ইটকাঠি, নাটাই, রাজা-রাণী, দেব-দেবী, প্রজাপতি, ঘুড়ি, নারীর মুখ, রাখাল বালক, কলসী কাঁখে রমণী, বাঘবন্ধি, পালকি, মোড়া ফুল, জামরুল পাতা, রথ পাড়ি, দাবারঘর, লাইট, পৌরাণিক চরিত্র, নবান্ন, পৌষপার্বণ, গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্য ইত্যাদি।

আধুনিক মোটিভে আছে উর্বরতা ও প্রবৃদ্ধির প্রতীক, পুষ্পিতপাতা, পানপাতা, ধর্মীয় অনুভূতি ও চেতনার স্বাক্ষর স্বরূপ কাবাঘর, মসজিদ-মিনার ইত্যাদি। এছাড়াও জীবন-জীবিকার প্রতীক মাছ, পাখি, নৌকা, গ্রামের দৃশ্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদির চিত্র বুননশিল্পীরা শতরঞ্জি বুননের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন।

শতরঞ্জির নকশা হাতে বুনা হয় যার ফলে দুই পাশ থেকে নকশা দেখতে একই রকম হয় এবং এর কোনো উল্টো-সোজা নেই।

শতরঞ্জির রঙের ব্যবহার

The use of color in Shataranji

শতরঞ্জি তৈরিতে সুতা রং করা উৎপাদন প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। যা রংপুরের ঘাঘট নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার জলবায়ু এবং ঘাঘট নদীর পানি সুতার রঙের উজ্জ্বলতা এবং রঙ এর স্থায়ীত্ব অনেক বেশি থাকে। শতরঞ্জিতে নকশায় সাধারনত লাল, কালো বা নীল রঙের প্রাধান্য দেয়া হয়। তবে এখন বিশ্ববাজার চিন্তা করে রঙের অনেক বৈচিত্রতা দেখা যাচ্ছে।

বর্তমানে সুতা রংকরণ প্রক্রিয়া শুধুমাত্র পাটের সুতার বেলায় প্রয়োগ করা হয়। কেননা বিভিন্ন রঙের সুতি ও মখমল সুতা বাজারে পাওয়া যায়। এতদিন ভেষজ রঙ বেশি ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে রাসায়নিক রঙ বেশি ব্যবহার করা হয়।

শতরঞ্জির বাণিজ্য

The trade of Shataranji

রংপুর শহরের উপকণ্ঠে ঘাঘট নদীর তীরে কয়েকটি গ্রামে এই শতরঞ্জির উৎপাদন হয়। এছাড়া রংপুরে রবার্টসন এলাকায় ‘কারুপণ্য রংপুর লি.’ মিলে বৃহৎ পরিসরে শতরঞ্জি কারুপল্লী স্থাপিত হয়েছে। চাহিদা বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ‘আইকা’ ও ‘বিবি রাসেল’ এর উদ্যোগে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার মাছকুটি গ্রামে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শতরঞ্জি কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়।

অবাধ বাণিজ্য ও তুমুল প্রতিযোগিতার বাজারে রংপুরের শতরঞ্জি বর্তমানে বিশ্বের ৫০টির অধিক দেশে রপ্তানী হচ্ছে। শতরঞ্জি রপ্তানি থেকে এখন প্রতি বছর বাংলাদেশ প্রায় ৪০ লাখ ডলার আয় করে থাকে। 

SHOTRANJI শতরঞ্জি, রংপুরের ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প x bfa x fxyz 3

শতরঞ্জি পাওয়া যাবে

Shatranji will be available

রংপুরে রয়েছে শতরঞ্জির প্রায় ৩০টি দোকান। শতরঞ্জি পাওয়া যাবে ঢাকার শুক্রাবাদ, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, রাজধানী সুপার মার্কেট, গুলশান-২ ডিসিসি মার্কেট, গুলশান-১ নম্বরে। ফ্যাশন হাউস আড়ং ও যাত্রাতেও পাওয়া যাবে এসব সুতা ও মখমলের তৈরি শতরঞ্জি।

সময়ের বিবর্তনে একই বুননে শতরঞ্জির ওয়ালম্যাট, টেবিলম্যাট, কুশন কভার, সোফার রুমাল, জায়নামাজ, পাপোশও তৈরি হচ্ছে।


mzamin.com

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

nagorik.prothomalo.com

bn.banglapedia.org


February 12, 2023
Traditional art of Shital Pati

শীতল পাটি | SHITAL PATI

fayze hassan
শীতল পাটি একই সঙ্গে  বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প ও লোকশিল্প। এটি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্প। মুরতা…
February 12, 2023

About Post Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

আপনার একটি শেয়ার আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা

X (Twitter)
Post on X
Pinterest
fb-share-icon
Instagram
FbMessenger
Open chat
1
Scan the code
Hello
How can i help you?
Skip to content