কিশোর বয়সে আমি যখন সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলাম, তখন বাংলা সাহিত্যের ‘সপ্তবর্ণা’ নামক বইয়ের ‘একটি অনন্য পুরাকীর্তি ‘ – শিরোনামে একটি গদ্যরচনা ছিল। আবার মাধ্যমিকে এর একটি ইংরেজী ভার্সন-ও পেয়েছিলাম। এখন তো পকেটের বিশ টাকার কাগজী নোটেও ষাট গম্বুজ মসজিদ -এর ছবির মুদ্রণ দেখতে পাই….! কতটা সম্মানজনক এই স্থাপনা, ভাবা যায়!
শুধু সপ্তম শ্রেনীর কথা-ই নয়, বাংলাদেশে জন্মগ্রহনকারী কোনো শিশুর-ই দেশ সম্পর্কিত সাধারণ জ্ঞানের হাতেখড়ি তে বাগেরহাটের ‘ষাটগম্বুজ’ সম্পর্কে না জানার কোনো অবকাশ নেই। অনন্য পুরাকীর্তি বলতে আমিও ঠিক পঞ্চদশ শতাব্দীর গর্ব ষাটগম্বুজ মসজিদের কথা-ই বলছি, বাগেরহাটের নাম শুনলেই চোখ বুজে মানুষ সুন্দরবনের পাশাপাশি যার পরিচয় বা স্বকীয়তাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।

দেশের ২০ টাকা সমমূল্যের কাগজী নোটে ষাটগম্বুজ মসজিদের প্রতীকী মুদ্রন করা আছে।
এপ্রিলে দেশজুড়ে প্রখর তাপপ্রবাহের কিছুদিন পর যখন খোদার রহমতের ঝড়- বৃষ্টির দেখা পেলাম, রোজার ঈদের ছুটিটাকে কাজে লাগিয়ে সফরসঙ্গী মেহেদী সহ দুজন মিলে দিলাম ছুট সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা এই জনপদটিতে৷ ঢাকা থেকে ট্রেনে খুলনা হয়ে যাওয়াতে আমাদের সেখান থেকে বাসে করে ঠিক ষাট গম্বুজের সামনের স্টপেজেই নামতে হলো। নাতিশীতোষ্ণ বৈশাখী প্রভাতের মিষ্টি ঝলমলে রোদে সিক্ত হয়ে নির্জন পরিবেশটিকে উপভোগ করার প্রথম সারির দর্শনার্থী ছিলাম আমরাই। দেশী পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত ২০ টাকার টিকেটিং সেরে এতদিনের তত্ত্বীয়, প্রতিবেদন, নিউজ বা ভ্রমণ ভ্লগে দেখে আসা খাজা খানজাহান আলীর নির্মিত বিশ্ব ঐতিহ্যের সামনাসামনি যখন দাঁড়ালাম, গর্বে বুকটা ফুলে এলো, UNESCO এমনি এমনিই একে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-এর সর্বোচ্চ সম্মানে অধিষ্ঠিত করেনি।
আরও পড়ুন : যত্নে থাকুক আমাদের ঐতিহ্য । WORLD HERITAGE DAY

শুরুতেই যে বিষয়টি সবার ভালোলাগার, সেটি হলো মসজিদের সুবিশাল আয়তন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা আর প্রশাসনিক সহযোগিতা। বছরের বিভিন্ন আবহাওয়ায় চারপাশে সবুজ ঘাসের পরিপাটি হয়ে থাকা মসজিদের বাহ্যিক রূপসৌন্দর্য ঋতুভেদে পরিবর্তন হতে থাকে। প্রবেশ পথে হাতের ডানদিকে থাকা জাদুঘর ঘুরে আসতে পারলে আর কিছু না হোক, খানজাহান আলী (র:) তার অলৌকিক শক্তির নিদর্শন স্বরুপ এই বাগেরহাট শহরটিকে আজ থেকে ৬শ’ বছর আগে কিসে রুপান্তর করতে চেয়েছিলেন তার সম্যক ধারণা এই একবিংশ শতাব্দীর প্রজন্মেরাও পেয়ে থাকবে। অপরদিকে মসজিদের পশ্চিম প্রান্তে সুবিশাল আয়তনের ‘ঘোড়াদিঘী’ নামক দিঘীটির বনায়ন, শীতলতা পর্যটকদের মনে বয়ে আনে এক পরম প্রশান্তি।

ঘোড়াদিঘী
ষাট গম্বুজ নাম হলেও চারপাশের টারেট আকৃতির মিনারের ৪ টি গম্বুজ নিয়ে সর্বমোট ৮১ টি গম্বুজ নিয়ে দন্ডায়মান এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি। আবার অনেকে এ-ও ভাবেন, সাতটি প্রস্তরখন্ডের উপরে মসজিদটির ভিত্তি স্থাপিত বলে এর নাম ‘সাত গম্বুজ’ থেকে মৌখিক পরম্পরায় ‘ষাট গম্বুজ’ হয়। এর চারপাশ ঘুরে আমি এটা নির্দ্বিধায় অনুধাবন করতে পারি, উলুঘ খান জাহান পরম মমতায় আর নিজের প্রখর ও নিখুঁত নজরদারি দিয়ে এই স্থাপনাটি করে রেখে গেছেন। বহু বছর সময় ও বহু অর্থ খরচ করেছেন তিনি এর পেছনে। জনশ্রুতিও আছে এমন, তিনি এই মসজিদ নির্মানের পাথরগুলো সুদূর উড়িষ্যার রাজমহল থেকে নিজের ক্ষমতাবলে জলপথে ভাসিয়ে নিয়ে এসেছিলেন।
মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া। দেয়ালগুলো প্রায় ৮·৫ ফুট পুরু। নান্দনিক শিলালিপিতে স্পষ্টভাবে তুঘলকী ও জৌনপুরী স্থাপত্যশৈলী নজর কাড়ে। মসজিদের ভেতরে পশ্চিম দেয়ালে ১০টি মিহরাব আছে। মাঝের মিহরাবটি আকারে বড় এবং কারুকার্যমন্ডিত। এ মিহরাবের দক্ষিণে ৫টি ও উত্তরে ৪টি মিহরাব আছে।

মসজিদটির বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ঘুরে দেখার পর আমার প্রশান্ত মনে তখন সেই কথাগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছিল, মধ্যযুগীয় সময়ে অবিভক্ত এই উপমহাদেশে ইসলামিক ধ্যানধারণার ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের মহৎ উদ্দেশ্যে খাজা খানজাহান (র:) এই বঙ্গভূমিতে পদচারণ করেছিলেন। তিনি পেরেছিলেন ও বটে। শুধু এই ষাট গম্বুজ-ই নয়, নিজের সুপরিকল্পনায় এই অসাধারণ স্থাপনাটি বাদে আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো মজলিশ খানা, মক্তব ও মসজিদ গড়ে দিয়েছেন। খুঁটি গেড়ে দিয়ে গেলেন ইসলামের; আল্লাহ পাকের অস্তিত্ব, নবী রাসূলের আদর্শের বারতা এই বাংলায় ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার প্রভূত চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন। খুলনা, যশোহর, ঝিনাইদহ সহ দক্ষিণের সুবিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তার খলিফার দায়িত্ব / ইসলাম প্রচারের অসামান্য অবদানের জন্য এই ভূখন্ডের নাম হয়ে যায় প্রাচীন ‘খলিফাতাবাদ’, যুগের পরিক্রমায় ‘খলিফাতাবাদ’-ই আজকের এই আধুনিক ‘বাগেরহাট’।
ষাট গম্বুজ স্থাপত্যশৈলী এবং টেরাকোটা নকশা




খানজাহান আলীর অসামান্য কীর্তি শুধু এই বঙ্গদেশেই গন্ডিবদ্ধ হয়ে থাকেনি৷ পুরো বিশ্বেই তার ইসলাম প্রচারের এই প্রচেষ্টা শতাব্দী অন্তর অন্তর ধরে মানুষ গবেষণা করে এসেছে। ১৯৮৫ সাল থেকে বিশ্ব ঐতিহ্যের নির্ধারক সংস্থা ইউনেস্কো পুরো বাগেরহাট শহরটিকেই বিশ্বের অন্যান্য হারিয়ে যাওয়া শহরগুলোর তালিকায় স্থলাভিষিক্ত করেছে। টিমভিত্তিক পুরাতাত্ত্বিকরা এসে খানজাহান আলীর নিজ হাতে গড়ে তোলা স্থাপনা গুলো মেরামত ও সংরক্ষণের কাজে মনোনিবেশ করে৷ ইসলাম প্রচারের মাধ্যম হিসেবে মধ্যযুগীয় নান্দনিক স্থাপত্যকৌশল ও শিল্পসমৃদ্ধ স্থাপনাগুলো দেখে তারা মুগ্ধ হয়ে ষাট গম্বুজ মসজিদ সহ আশেপাশের বিভিন্ন স্থাপনাগুলোকে ‘ World Heritage Site'( বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান) এর সর্বোচ্চ সম্মাননায় তালিকাভুক্ত করা শুরু করে।


ষাট গম্বুজ মসজিদের ভিতরের ছবি
আমি বলি, প্রত্নতত্ত্ব শেকড়ের সন্ধান দেয়। আর্কিওলজি সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণা না থাকলেও প্রথম আলো’তে একবার ‘ক্রস ডিসিপ্লিন’ সম্পর্কে পড়েছিলাম।
সেখানে লিখা ছিল, জীবনের প্রতিটি অংশই প্রত্নতত্ত্ব। জীবদ্দশা বা এর পরবর্তী সময়গুলো যতই পার হবে সৃষ্টি, কর্মযজ্ঞ ও জীবনবিধান সম্পর্কে প্রত্যেকটি মানুষের জন্য তৈরি হবে আলাদা আলাদা আর্কিওলজি।
এখানে এসে আমি প্রমাণ-ও পেলাম। কীর্তিময়ী খানজাহান আলী(র:) জীবন সঞ্চালনা, বিধান ও কর্মসম্পাদন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বিশ্বাস করতে হয় এসব, মননে অনুরুপ অনুভূতিও জাগে নিজের চোখেই সব দেখার পর।
হা হা… এ পর্যায়ে আমি কিছুটা শক্ত কথা লিখে ফেলেছি মনে হচ্ছে৷ তবে আমার ব্যক্তিগত মত প্রকাশের জায়গা থেকে বলি, প্রত্যেকেরই নিজেদের গোড়াপত্তন নিয়ে গবেষনা করতে হলে পুরাতত্ত্বের কাছাকাছি আসতে হবে।
বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, খুলনা বিভাগের আওতাভুক্ত এই ষাট গম্বুজ মসজিদটি দেশের অন্যতম প্রধান তিনটি স্থাপনার মধ্যে একটি। সকলের জন্য সর্বোচ্চ রেকমেন্ডেশন থাকবে নিজের এবং নিজের পরিবার বা পরবর্তী প্রজন্মকে দেশ, ধর্মের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে অবগাহন করার জন্য।
ষাট গম্বুজ মসজিদের আরও ছবি
more picture of Shat Gombuj Masjid
full free to ask for high resolution images
ধন্যবাদ,
সুন্দরঘোনা, বাগেরহাট হতে,
ফজলে ওয়াহিদ রাব্বি।

