জানা–অজানার
অদ্বৈত মল্লবর্মণ
●
অদ্বৈত মল্লবর্মণের বিখ্যাত উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম তাঁর জীবৎকালে প্রকাশিত হয়নি। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, এখন আমরা তিতাস একটি নদীর নাম–এর যে রূপ দেখতে পাই, সেটি পুরো উপন্যাস নয়, অদ্বৈতের মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধু এবং পুঁথিঘর প্রাইভেট লিমিটেডের কর্ণধার সুবোধ চৌধুরী উপন্যাসটির সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি না-ছেপে, বাহুল্য ভেবে সম্পাদনা করে, এমনকি কিছু কিছু বাদ দিয়ে এটি প্রকাশ করেন।
●
অদ্বৈত মল্লবর্মণের পিতা অধরচন্দ্র মল্লবর্মণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার তিতাস নদসংলগ্ন গোকর্ণ গ্রামের হতদরিদ্র জেলে পরিবারে জন্মগ্রহণ করা এই লেখকের কোনো ছবি পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর যে ছবিটি সব জায়গায় এখন ছাপা হয়, সেটি হাতে আঁকা স্কেচ।
●
অদ্বৈত মল্লবর্মণেরা ছিলেন তিন ভাই ও এক বোন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর আগেই সবাই মারা যান। আর তিনি মারা যান অবিবাহিত অবস্থায়। ফলে এখন তাঁর কোনো উত্তরাধিকার বা বংশধর জীবিত নেই।
●
পুরো জীবনটাই অদ্বৈত কাটিয়েছেন ক্ষুধার যন্ত্রণা ও অসুস্থতা নিয়ে। উপোস থেকে খালি পেটে, খালি পায়ে কয়েক মাইল হেঁটে স্কুলে গিয়ে নিম্ন শ্রেণির জন্য নির্দিষ্ট স্থানটিতে বসে ক্লাস করতেন। কিন্তু বরাবর ভালো রেজাল্ট ছিল তাঁর। ম্যাট্রিকুলেশনে প্রথম শ্রেণি (১৯৩৩) পেয়েছিলেন। কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হলেও দারিদ্র্যের জন্য আইএ পাস করা হয়নি। এরপর কলকাতায় যান ভাগ্যান্বেষণে। প্রথমে মাসিক ত্রিপুরা, পরে জাতীয়তাবাদী সাপ্তাহিক নবশক্তি, মাসিক মোহাম্মদী, দৈনিক আজাদ, নবযুগ, কৃষক ও সাপ্তাহিক দেশ প্রভৃতি পত্রিকায় কাজ করেছেন।
●
অদ্বৈতর জন্মস্থান গোকর্ণ গ্রামের সবাই ছিলেন ভয়ানক দরিদ্র। তবু গ্রামবাসীরা মেধাবী বলে চাঁদা তুলে অদ্বৈতকে শিক্ষাগ্রহণের জন্য পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, শিক্ষিত হয়ে অদ্বৈত তাঁদের সমষ্টিগত দুঃখ-দুর্দশা নিরসনে ভূমিকা রাখবেন। অদ্বৈতও তাঁদের হতাশ করেননি, স্ব–শ্রেণির দুঃখ–জর্জরিত মানুষের জীবনকাহিনি তিনি লিখে গিয়েছেন মৃত্যুর হাত বেঁধে রেখে।
●
১৯৪৮ সাল থেকেই গুরুতরভাবে যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হন অদ্বৈত। সে সময় সবার আগে দেশ কার্যালয়ে গিয়ে কাজ শেষ করে বেরিয়ে আসতেন তিনি। যক্ষ্মারোগের কারণে পারতপক্ষে কারও সামনেই পড়তে চাইতেন না এ লেখক।
●
জীবদ্দশায় অধিকাংশ বর্ণহিন্দু বড় কবি-সাহিত্যিকই অদ্বৈত মল্লবর্মণকে হীন চোখে দেখতেন। তাঁকে দিয়ে অনুবাদ, ফিচার রচনা—এসব কাজ করাতেন। কিন্তু মৃত্যুর পরে তাঁর সাংবাদিক, অনুবাদক, প্রুফ-সংশোধক পরিচয়ের মৃত্যু ঘটে। তিনি জাগরূক হন ‘কথাশিল্পী’ রূপে।
●
ভারতের চিঠি—পার্লবাককে (১৯৪৪)—এটি ছাড়া আর কোনো বই দেখে যেতে পারেননি অদ্বৈত। এটিও একটি চিঠি, মাত্র ২৫ পৃষ্ঠার ছোট বই। অদ্বৈতর সব রচনাই ছড়িয়ে–ছিটিয়ে ছিল বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। তাঁর মৃত্যুর পর তিতাস একটি নদীর নাম এবং অন্য দুটি ছোট্ট উপন্যাস (রাঙামাটি ও সাদা হাওয়া), ৫টি গল্প, ১৪টি কবিতা, ১৩টি প্রবন্ধ–নিবন্ধ–ভূমিকা-টীকা ও নবশক্তির কয়েকটি সস্পাদকীয় প্রভৃতি নিয়ে হাজার পৃষ্ঠার রচনাবলি প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু এসব রচনার বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য ব্যতিরেকে কেবল তাঁর তিতাস একটি নদীর নাম–এর লেখকসত্তাই সুপরিচিত।
●
বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক আরভিংস্টোনের উপন্যাস লাস্ট ফর লাইফ–এর অনুবাদ জীবন–তৃষা নামে অদ্বৈতকে দিয়ে অনুবাদ করিয়ে নিয়েছিল দেশ কর্তৃপক্ষ। বলা ভালো, আরভিংস্টোনের এই উপন্যাস ছিল ফরাসি বিপ্লবের সময়ের খনিশ্রমিকদের জীবনকাহিনি নিয়ে।