মহান রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতের ছত্রছায়ায় ছিলাম বলেই দেশের অন্যতম সুন্দর ও দু:সাহসিক অভিযানভিত্তিক হামহাম ঝর্ণা দেখার সুযোগ হলো আমাদের। শ্রাবণের শেষ দিনটিতে নাতি-বর্ষাশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় প্রত্যন্ত গ্রাম ‘কলাবনপাড়া’র মনিপুরী আদিবাসী গোষ্ঠীর কোমলমতি বাচ্চাদের মুখের হাসি দেখে যাত্রা শুরু করতে হল আমাদের তিনজনের। বলে রাখি,কমলগঞ্জের একেবারে শেষ গ্রামের নাম কলাবনপাড়া, যেটি তৈলংবাড়ি নামেও পরিচিত। বলতে গেলে এরপর থেকেই আর কোন জনবসতি নেই। আর আমাদের যাত্রা শুরু সেখান থেকেই।
হামহাম যাওয়ার জন্য বনের ভিতরে দুটি পথ আছে। ভ্রমণের সময় পাহাড়ি পথে হাঁটার সুবিধার্থে এবং আত্মরক্ষার জন্য প্রত্যেকের সাথে বাঁশ নেয়া আবশ্যক আমরা স্থানীয়দের থেকে বাঁশ কিনে নিলাম । এছাড়া জোঁকের হাত থেকে রক্ষা পেতে সাথে করে লবণ ও নিয়েছিলাম। বর্ষায় জোঁকের উপদ্রব, জংলী মশা আর ট্রেইলে হাইকিং বা উঠানামা করাটা কষ্টসাধ্য হওয়ায় এই ঝর্না অন্যতম ‘ দূর্গম’ ঝর্না বলে জেনে এসেছিলাম। যদিও মশা কিছুটা বিরক্ত করেছিল,তবে জোঁকের প্রভাব এখন প্রায় নেই বললেই চলে।
ছোট ভাই ও গুরুত্বপূর্ণ সফরসঙ্গী মেহেদীর গত তিনদিন আগে বাইক এক্সিডেন্ট করে হাঁটু,হাতের কনুই ঝলসে জখম হওয়ার পরেও এই ট্রেইলের ফিল নেয়ার সাহস আর ত্যাগ স্বীকার দেখে আমার নিজের স্বাস্থ্যগত ওজন নিয়ে হাঁটার যে একটা ভয় পুষছিলাম তা নিমিষেই উবে গেল। যা বলা যায় স্রেফ এক ধরনের ‘ইন্সপায়ারেশন’। হাঁটা শুরু করে দেয়ার পর অবাক চোখে দেখে যাচ্ছিলাম জারুল, চিকরাশি ও কদম গাছের ফাঁকে ফাঁকে রঙিন ডানা মেলে দেয় হাজারো প্রজাপতি। চশমা বানরের আনাগোনা ডুমুর গাছের শাখায় চারদিকে গাছগাছালি ও প্রাকৃতিক বাঁশবনে ভরপুর এ বনাঞ্চল। ডলু, মুলি, মিটিংগা, কালি ইত্যাদি অদ্ভুত নামের বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ এ বাগানগুলোকে দিয়েছে ভিন্ন এক রূপ। পাথুরে পাহাড়ের ঝিরি পথে হেঁটে যেতে যেতে সুমধুর পাখির কলরব মনকে ভাললাগার অনুভূতিতে ভরিয়ে দিচ্ছিল। দূর থেকে কানে ভেসে আসে বিপন্ন বন মানুষের ডাক।
কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর শুরুতে দুচোখের সামনে ভেসে উঠবে পাহাড় থেকে ধোঁয়ার মতো ঘন কুয়াশা ভেসে উঠার অপূর্ব দৃশ্য। এভাবেই হাঁটতে হাঁটতে একসময় জলপ্রপাতের কাছাকাছি চলে যাই আর গিরিপথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ের পাদদেশ ধরে কিছু দূর গেলেই শুনতে পাই হামহাম জলপ্রপাতের শব্দ। ওখানে গেলে আপনার ইচ্ছে হবে না চোখ সরাতে। মনে হবে অনন্তকাল দুচোখ ভরে দেখে নেই প্রকৃতির এই অপূর্ব সৃষ্টি। এই অদ্ভুত এক রোমাঞ্চকর পরিবেশে আমি ভুলে যাচ্ছিলাম আমি কোথায় আছি, চারদিকে গহীন জঙ্গল, উপরে আকাশ, পায়ের নিচে বয়ে যাওয়া ঝির ঝির স্বচ্ছ পানির ধারা আর সামনে বহমান অপরূপ ঝর্না। বুনো পাহাড়ের ১৫০ ফুট উপর হতে গড়িয়ে পরা স্রোতধারা কলকল শব্দ করে এগিয়ে যাচ্ছে পাথরের পর পাথর কেটে সামনের দিকে তার গন্তব্য।অচিরেই আমাদের সব কষ্ট প্রশান্ত হয়ে গেল যখন হাম হামের মুখোমুখি হই আমরা। আলহামদুলিল্লাহ! গড়িয়ে পড়া পানির প্রশান্তিময় ধারায় গা ভিজিয়ে মনে হলো যেন মাথার মধ্যে দীর্ঘদিনের জং ধরে যাওয়া কিছু স্ট্রেস রিলিফ হলো এই ঝর্নার সান্নিধ্যে এসে।

মোট কথা, পাহাড়ি বনের মধ্য দিয়ে যাওয়া আসায় ৫ ঘন্টা ব্যপ্তির এই ৮ কিলোমিটার পথ জুড়ে এর ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য্যের প্রতিচ্ছবি, রেইন ফরেস্ট্রির মাঝে বিভিন্ন জাতের বাঁশের ‘স্বর্গরাজ্য’ আর একটা লম্বা সময় ট্র্যাকিং করে হামহামের ঝিরিপথের মাঝখানে পায়ে, গায়ে ঠান্ডা পানির স্পর্শে এক ধরনের রোমাঞ্চকর অনুভূতির আস্বাদন পেলাম।
তারপর ফেরবার পালা। ফেরার সময় শরীর যেন আরো এনার্জি গেইন করেছিল। একথা বিশ্বাস করতাম,নতুন জায়গায় একটানা হাঁটলে পথ অনেক দূরের মনে হয়, কিন্তু ফিরে আসার সময় যেন রাস্তার দৈর্ঘ্য একদম কমে যায়। সবার আগে কলাবনপাড়ায় পৌছে গোসল সেরে খেয়ে নিলাম। অতঃপর কিছু সময় বিশ্রাম করে সিএনজিতে চরে পাহাড়ি কন্যাদের পরিশ্রমী জিবন আর প্রাকৃতিক অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ফিরে এলাম আলহামদুলিল্লাহ নির্বিঘ্নে! স্মরণে রয়ে গেল সেই সরু গিরিপথ, ঝিরিপথ,চা বাগান আর ঝর্ণার ঠান্ডা জলরাশি!
প্রত্যেকটা পায়ের কদম আর প্রতিটি ছবি আমার কাছে একেকটি গল্প, যে গল্পগুলো অনুভূতির কথা আজীবন স্মরণ করে দেবে আমাকে।
হামহাম ঝর্ণা কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস/ ট্রেন যোগে সরাসরি চলে আসতে হবে শ্রীমঙ্গল। সেখান থেকে গ্রুপে বা সলো ট্রিপ হলেও রিজার্ভে চান্দের গাড়ী( জীপ) বা সিএনজি করে চলে আসতে হবে কলাবনপাড়া। সেখান থেকে হাইকিং, ট্রেইল ট্র্যাকিং করে পৌছে যাবেন হামহাম ঝর্ণা নৈসর্গিক সৌন্দর্য। আবার একই পথে ফিরে আসতে হবে। সময় নিয়ে আনন্দদায়ক ভ্রমণের জন্য সকালের শুরুতেই বেরিয়ে পড়া উত্তম। এতে করে শ্রীমঙ্গলের আশে পাশের আরো কিছু সুন্দর জায়গায় ঢুঁ মারা যাবে।
হামহাম ঝর্ণা যেতে আনুমানিক খরচ
কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশান থেকে শ্রীমঙ্গল শ্রেনীভেদে ২৪০-৫৫০ টাকা
ট্রেন : পারাবত, জয়ন্তিকা বা উপবন এক্সপ্রেস
সময় : পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ ঘন্টা
শ্রীমঙ্গল থেকে কলাবন পাড়া আপ-ডাউন সিএনজি ভাড়া ১০০০ থেকে ১২০০টাকা
একজন গাইড নিন ২০০/৩০০ টাকার ভিতর
হামহাম ঝর্ণা ভ্রমন টিপস :
এক নজরে হামহাম ঝর্ণা
Hum Hum waterfall
স্থান : মৌলভীবাজার, কমলগঞ্জ, রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্ট,
যে নামে পরিচিত : হাম হাম/ হাম্মাম/ চিতা জলপ্রপাত
ঝর্ণার উচ্চতা : ১৪০ ফিট
জলপ্রপাতটি আবিস্কার : ২০১০ সালে পর্যটন গাইড শ্যামল দেববর্মার সাথে একদল পর্যটক
দুরত্ব : কলাবন পাড়া থেকে ২-৩ ঘন্টা সময় লাগবে।
হামহাম ঝর্ণা ভ্রমনের আরো ছবি দেখেতে এখানে ক্লিক করুন
– অগাস্ট ১৫, ২০২৩
ফযলে ওয়াহিদ রাব্বী।
facebook link : Fazle Wahid Rabbee
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
লেখকের অন্যান্য ভ্রমণ ডায়েরি

পাবনার জোড়বাংলা মন্দির—এক ঐতিহাসিক স্থাপনা
fayze hassan
মুঘল স্থাপত্যের মায়াবি ছোঁয়া: সুরা মসজিদ
bdfashion archive
তারা মসজিদ: পুরান ঢাকার ঝলমলে তারার ঐতিহ্য
bdfashion archiveতারা মসজিদStar Mosque পুরান ঢাকার আরমানিটোলার আবুল খয়রাত সড়কে দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য—তারা মসজিদ।…

কাপ্তাই লেক: বাংলাদেশের প্রকৃতির এক অপরূপ নিদর্শন
bdfashion archiveকাপ্তাই লেকKaptai Lake প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে মোড়ানো রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই লেক এমন একটি স্থান, যেখানে…


