Ruby Ghuznavi রুবি গজনবী natural color master x bfa x fxyz V2

রুবি গজনবী ✿ প্রাকৃতিক রঙের জাদুকর

রুবি গজনবী সবসময়ই ভাবতেন কিভাবে প্রাকৃতিক রং এর পরীক্ষা নিরিক্ষা করা যায়। গাছের গুড়া, ফুল, পাতা, পেয়াজের খোঁসা এমন হেন কোন সবজি নেই যা দিয়ে তিনি পরীক্ষা নিরীক্ষা করেননি। 

রুবি গজনবী: কারুশিল্পের এক অনন্য পথিকৃৎ

Ruby
Ghuznavi

বাংলাদেশের কারুশিল্প আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন রুবি গজনবী। তাঁর জীবন ও কর্ম দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সংরক্ষণ ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনিই প্রথম এদেশের মানুষের কাছে প্রাকৃতিক রং পরিচিত করে তোলেন। ১৯৭৯ সালে ভারতের একটি কারুশিল্পের ওয়ার্কশপে যান প্রাকৃতিক রঙ এর বিষয়টা কি দেখার জন্য। সেখানে কমলা দেবি তাকে প্রাকৃতিক রঙ নিয়ে কাজ করতে বলেন। ঢাকায় এসে জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান, রশিদ চৌধুরীদের সঙ্গে একটি কারুশিল্পের ন্যাশনাল এক্সিবিশন করেছিলেন ১৯৮২ সালে। এরপর ভাবেন কিভাবে প্রাকৃতিক রং এর পরীক্ষা নিরিক্ষা করা যায়। গাছের গুড়া, ফুল, পাতা, পেয়াজের খোঁসা এমন হেন কোন সবজি নেই যা দিয়ে তিনি পরীক্ষা নিরীক্ষা করেননি। ভারত থেকে শিখে আসেন ৬টি রং তৈরির কৌশল। এখানে তিনি তৈরি করেন আরও ৯টি রং। মোট ১৫টি প্রাকৃতিক রং। এরপর আবার ইউএনডিপির একটি ফান্ড নিয়ে শুরু করেন গবেষণা। এবার আবার দুই বছরের মাথায় তৈরি করেন আরো ১৫টি রং। মোট তৈরি হয় ৩০টি প্রধান রং। দেশের প্রতি একটা দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করেন প্রাকৃতিক রঙ দিয়ে। তাঁর প্রচেষ্টায় প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার শুধু টেকসই শিল্পের দিকেই নয়, বরং বাংলাদেশি কারুশিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

শৈশব ও শিক্ষা: স্বপ্নবুননের শুরু

১৯৩৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ফরিদপুরে জন্ম হলেও আইসিএস বাবা এ এফ মুজিবুর রহমানের চাকরির সুবাদে কলকাতায় কেটেছে তাঁর স্কুলজীবন। পড়েছেন লরেটো স্কুলে। যা ছিল তাঁর সৃজনশীল বিকাশের ভিত্তি। দেশভাগের পর পরিবারসহ বাংলাদেশে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে অর্থনীতিতে অনার্স এবং মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন তাঁকে কারুশিল্পের অর্থনৈতিক দিকগুলো নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়ের কাজ দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন এবং বাংলাদেশের কারুশিল্প উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত করার প্রতিজ্ঞা করেন।

অরণ্য ক্র্যাফট’ প্রতিষ্ঠা

রুবি গজনবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রাকৃতিক রঙের পুনরুজ্জীবন। ১৯৮২ সালে তিনি এই প্রকল্প শুরু করেন এবং মাত্র ছয়টি রঙ নিয়ে কাজ শুরু করলেও, পরে তা আরও প্রসারিত হয়। প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার নিয়ে তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় মাইলফলক ছিল ১৯৯০ সালে ‘অরণ্য ক্র্যাফট’ প্রতিষ্ঠা। এই প্রতিষ্ঠান ভেজিটেবল ডাই ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব পোশাক তৈরির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তাঁর প্রচেষ্টায় প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার শুধু টেকসই শিল্পের দিকেই নয়, বরং বাংলাদেশি কারুশিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এরই মাঝে ১৯৮৫ সালে পটুয়া কামরুল হাসানসহ সমমনা ব্যক্তিরা বাংলাদেশের কারুশিল্প ও কারুশিল্পীদের উন্নয়নে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ।

কারুশিল্পের উন্নয়ন ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব

বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রুবি গজনবী কারুশিল্পের উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে পরিষদের প্রেসিডেন্ট ও নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সংগঠকসুলভ দক্ষতার ফলে ২০১৮ সালের জামদানি উৎসবটি স্মরণীয় হয়ে ওঠে। এই উৎসবের মাধ্যমে জামদানিকে সোনারগাঁওয়ে ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফট সিটির স্বীকৃতি এনে দেন। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে জামদানির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।



O

উত্তরাধিকার: স্মৃতি ও অনুপ্রেরণা

২০২৩ সালের ১৪ জানুয়ারি রুবি গজনবী ৮৮ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। তাঁর জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের কারুশিল্প আন্দোলনকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকবে।

রুবি গজনবীর অবদান শুধু শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর কাজ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং পরিবেশ সচেতনতার ক্ষেত্রেও গভীর ছাপ রেখে গেছে। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায়, তিনি বাংলাদেশের কারুশিল্পের এক অনন্য পথিকৃৎ, যিনি তাঁর কর্মের মাধ্যমে দেশের গৌরবগাথা রচনা করেছেন।

Aranya | অরণ্য
Aranya

অরণ্য

অরণ্য একটি দর্শন, যার মূলে রয়েছে প্রাকৃতিক নান্দনিকতা এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপন। রুবি গজনবী হাতেই ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত অরণ্য যা পরবর্তিতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের কাছে বিক্রি করে দেন। বলা হয়  ‘অরণ্য ক্রাফট’ বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে পোশাকে ভেজিটেবল রং ব্যবহার করা হয়।




তথ্যসূত্র:

প্রথম আলো

হাল ফ্যাশন

ক্যানভাস

আজকের পত্রিকা


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial