ব্যতিক্রমী এক প্রত্নসম্পদ রাজশাহীর বাঘা উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই শাহী বাঘা মসজিদ । আমার মতো দর্শনার্থীদের মনে অপার বিস্ময় জাগায় শত শত বছর আগের এই মসজিদের শিল্পনিদর্শন, নির্মানশৈলীর কারুকাজের ধারকত্ব।
আমের স্বর্গরাজ্য রাজশাহীতে মে মাস বা গ্রীষ্মকাল, যখন আমের বড়ো হয়ে ওঠার সময়, তখন যেন তাপমাত্রার পারদ তুঙ্গে উঠে থাকে। এমন একটা খাঁ খাঁ দিনেই পুঠিয়া থেকে বাঘায় রওয়ানা দিলাম আশ্চর্য এই পুরাকীর্তিকে কাছে থেকে দেখার জন্য।
মসজিদের ইতিহাস :
জনশ্রুতি বলে এক সময় এই এলাকায় নাকি বাঘের আনাগোনা ছিল বেশ, এজন্যই কালের পরিক্রমায় ভূখন্ডের নাম হলো ‘বাঘা’। এ সূত্রে মসজিদের ইতিহাস ও বেশ পুরনো ও সমৃদ্ধ। মাওলানা শাহ দৌলার দরবেশী সুখ্যাতির কারণে এখানে তার শিষ্য-সাগরেদের আনাগোনা হতো। তার মৃত্যুর পর উনার মাওলানা আব্দুল হামিদ দানিশমন্দ এখানে স্থলাভিষিক্ত হন। সে সময়টাতেই হিজরী ৯৩০ সনে( ইং ১৫২৩ -২৪ সালে) বাংলার সুলতান নাসির উদ্দীন নুসরাত শাহ এখানে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি মসজিদের সম্মুখে একটি শিলালিপি স্থাপন করেন। বর্তমানে তা করাচী যাদুঘরে আছে বলে জানা গেছে।
একসময় দেশের ৫০ টাকার নোট ও ১০ টাকার স্মারক ডাকটিকিটে দেখা মিলতো পাঁচশো বছরের প্রাচীন স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার শাহী বাঘা মসজিদ।
স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যাদি ও টেরাকোটা:
প্রাচিন এ মসজিদ ইট দিয়ে তৈরি। মুল মসজিদের চারপাশে চারটি এবং মাঝখানে দুই সারিতে পাচঁটি করে মোট ১০টি গম্বুজ আছে। ২৫৬ বিঘা জমির উপর এই মসজিদের অবস্থান।
মসজিদটি নির্মাণের সময় মসজিদের পূর্ব পাশে একটি দীঘি খনন করা হয়। উত্তর ও দক্ষিণ বেষ্টনী প্রাচীরে একটি করে প্রবেশপথ আছে। দক্ষিণ দেওয়ালের প্রবেশ পথে অষ্টকোণাকৃতির স্তম্ভ, খিলান ও উপরে একটি গম্বুজ আছে।
মসজিদের ভেতরে এবং বাহিরে রয়েছে প্রচুর পোড়া মাটির লতাপাতা, ফুল প্রতিকৃতির সূক্ষ টেরাকোটার কাজ। যা এ মসজিদের প্রধান বৈশিষ্ট।
১৮৯৭ সালে প্রবল ভূমিকম্পে মসজিদের ছাদ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ১৯৮০ সালে গম্বুজগুলো পুনরায় বসানো হয়েছে। টেরাকোটা শিল্পের অতুলনীয় নিদর্শন মসজিদের দেয়ালের বাইরের দিকেও আছে। এককথায় পোড়ামাটির চিত্রফলক শিল্পের অপূর্ব ও অতুলনীয় নিদর্শন মসজিদের বাইরে ও ভিতরে ছিলো এবং এখনও কিছু কিছু আছে।


সংযুক্তি:
আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশগুলো সংরক্ষনে প্রত্নরত্ন বিভাগ অনুরুপ নকশা প্রতিস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেয় ২০০৭ সালে। সিরাজগঞ্জের টেরাকোটা শিল্পি মদন পাল টেরাকোটার কাজটি করেন।
প্রাচীর ঘেরা মসজিদ প্রাঙ্গনের উত্তর পূর্ব কোণে শাহ্দৌলা, তাঁর পাঁচজন সঙ্গী ও নাম না জানা আরও অনেকের সমাধি আছে। শাহ্ আবদুল হামিদ দানিশমন্দ ও মাওলানা শের আলীর সমাধিও এখানে আছে। আছে প্রসিদ্ধ একটি মাজার শরীফ।
যাতায়াত ব্যবস্থা :
ঢাকা থেকে ট্রেন, বাস বা উড়োজাহাজে কিংবা দেশের যেকোনো স্থান থেকে রাজশাহী শহরে এসে ব্যক্তিগত বা স্থানীয় পরিবহনে করে দক্ষিণ-পূর্ব উপজেলা বাঘা’য় এসে প্রশাসনিক দপ্তরেই দেখা মিলবে এই পুরাকীর্তিটি বাঘা মসজিদ এর।

BFA
