the traditional wedding saree of Bangladesh

Mirpur Benarasi Saree

Spread the love

মিরপুর বেনারসি শাড়ি

বেনারসি শাড়ির মূল উৎপত্তিস্থল হিসেবে ভারতের বেনারশ শহরের নাম শোনা যায়। কিন্তু ঠিক কবে থেকে বেনারসি শাড়ি তৈরি করে আসছেন তা জানা যায় নি। এ নিয়ে একটি গল্প শোনা যায়। তাঁতীদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন আনসারী। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হয়রত মুহাম্মদ (সঃ) যখন মক্কা থেকে মদীনায় যান তখন এই আনসারী সম্প্রদায়ের কাছে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং এর প্রচারেও অংশ নেয়। মনে করা হয়, বেনারস শহরের সিংহভাগ তাঁতী সেই আনসার সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ভারতের বেনারসের প্রায় ৩৭০টি মুসলমান তাঁতি পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় এরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ব্যবসা শুরু করে। এদের বৃহৎ অংশটি ছিল প্রায় ২০০ পরিবারের, তারা মূলত ঢাকার মিরপুর ও পুরান ঢাকায় বসতি স্থাপন করে। তারা তাদের আদি পেশা এই তাঁত শিল্পের কাজ এদেশে এসেও অব্যাহত রাখে। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে স্থানীয়রা এ পেশায় ব্যাপকভাবে জড়িত হবার পরই বেনারসি শিল্পের অগ্রগতির সূচনা ঘটে। ক্রমান্বয়ে তাঁতীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় কারখানাগুলো পুরান ঢাকা থেকে সরিয়ে মিরপুরে নিয়ে আসা হয়।  আগে এখানে কারখানা ছিল বেশি, দোকান ছিল কম। এখন দোকান বেড়েছে, কিন্তু কমেছে কারখানার সংখ্যা।

মিরপুর বেনারসি শাড়ি

বেনারসি শাড়ি কিভাবে তৈরী হয়

এই শাড়ি মানবচালিত একটি যন্ত্রের সাহায্যে তৈরি করা হয়। যাকে বলা হয় তাঁত। আর কারিগরদের বলা হয় তাঁতী। । বেনারসি শাড়ি তৈরি প্রক্রিয়া  কিছুটা জটিল।এই শাড়ি তৈরির মূল উপাদান হলো  কাঁচা রেশম সুতা। এর পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় জরি সুতা। কারিগরেরা প্রথমে নকশা ‍অনুযায়ী সুতা  রং করেন। তারপর সাবান ও গরম পানি দিয়ে ধুয়ে রৌদ্রে শুকান। এরপর কয়েকটা সুতাকে একসঙ্গে করার জন্য পাঠায় অন্য কারখানায়৷ পরবর্তীতে সে সুতা দেয়া হয় তাঁত শ্রমিকদের, তারপর গ্রাফ মাস্টারদের দেয়া ডিজাইন অনুযায়ী বেনারসি শাড়ি তৈরির কাজ শুরু করে৷ এরপর চলে তাঁতে নান্দনিক বুননের কাজ। ডিজাইন ও বুনন সহজ হলে একটি শাড়ি তৈরি করতে একজন তাঁতির সময় লাগে প্রায় এক সপ্তাহ। বর্তমানে দেশী রেশম সুতার দাম বৃদ্ধির কারণে তাঁতীরা সস্তা চায়না সিল্ক সুতা ব্যবহার করে থাকেন।

মিরপুর বেনারসি শাড়ি -র  বিভিন্ন নাম

ধরন বা ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে রাখা হয় শাড়ির নাম। এখানে ২০-৩০ প্রকারের ডিজাইনের শাড়ি পাওয়া যায়। এরমধ্যে  বেনারসি পল্লীতে তৈরি হয় ফুলকলি কাতান, দুলহান কাতান, মিরপুরি রেশমি কাতান, মিলেনিয়াম কাতান, বেনারসি কসমস, অরগন্ডি কাতান, পিরামিড কাতান , ব্রকেট কাতান, বেশমি কাতান, প্রিন্স কাতান, রিমঝিম কাতান, টিসু কাতান, মিরপুরি মিরপুরী রেশমি কাতান গিনি গোল্ড কাতান,মিরপুরী রেশমি কাতান, ব্রোকেট কাতান, বেনারশী কসমস, চুনরি কাতান, প্রিন্স কাতানের মতো শাড়ি ।

বেনারসি শাড়ি র রঙের বৈচিত্র্য

মিরপুর বেনারসি শাড়ি -র রঙের বৈচিত্র্যও লক্ষণীয়। লাল, হলুদ, মেরুন, মেজেন্টা, বেগুনী ইত্যাদি বিভিন্ন রঙের ওপর জমকালো সোনালি-রুপালি জরির কাজের প্রাধান্য বেশি । বর্তমানে ফ্যাশন ট্রেন্ড ফলো করে ডিজাইনাররা নুতন নতুন রং এর উপস্থাপন করতে দেখা যায় 

আসল বেনারসি শাড়ি চেনার উপায়

আসল কিংবা নকল মিরপুর বেনারসি শাড়ি দেখতে গেলে  আপনাকে শাড়ি উল্টে দেখতে হবে। আসল বেনারসির পিছন দিকে ঘন সুতো দেখা যায় যেটা নকল বেনারসিতে থাকে না।  বেনারসি চেনার আরও একটি উপায় হল যে আসল বেনারসিতে সব সময় আঁচলের দিকে ছয় থেকে আট ইঞ্চি লম্বা প্লেন সিল্কের প্যাচ থাকে। এটা নকল বেনারসিতে থাকে না। 

মিরপুর বেনারসি শাড়ি -র বর্তমান অবস্থা

কোনো বিয়ে বা জমকালো অনুষ্ঠানে মেয়েদের প্রথম পছন্দের তালিকায় থাকে বেনারসি শাড়ি নাম। তবে বর্তমানে বিভিন্ন বিদেশী পোশাক ও পশ্চিমা রুচির কারণে বেনারশী শিল্প কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ। জানা যায় ভারতীয় কিছু মানহীন শাড়ি  বেনারশী শাড়ির বাজার নষ্ট করছে। ওই শাড়িতে লাভ বেশি, কিন্তু সুতা ভাল না। ফলে ক্রেতারা কম দামে পেলেও প্রত্যাশা অনুসারে ব্যবহার করতে পারছেন না। এ জন্য আস্থা নষ্ট হচ্ছে।

Mirpur Katan By Aarong

বেচাকেনা

১৯৯০ সাল পর্যন্ত গদি ঘর তেমন ছিলনা বললেই চলে। গদি ঘরগুলোতে বেনারসি শাড়ির খুচরা ও পাইকারি কেনাবেচা হত সাধারণত। পরবর্তীতে চাহিদা বাড়তে থাকায় এগুলোর সংখ্যা বাড়তে থাকে। পুরনোদের সাথে নতুন নতুন উদ্যোক্তা যোগ দেয়। পরবর্তীতে কারখানাগুলো অন্য জায়গায় সরে যায় ও গদিঘরগুলো আধুনিক শোরুমে পরিণত হয়

বেনারসি শাড়ি প্রাপ্তি স্থান এবং দরদাম

বর্তমানে মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ মিলিয়ে মোট ২ হাজারের মতো কারখানা রয়েছে। আগে আরও বেশি ছিল। এছাড়া মিরপুর-১০ এ ১২০টি এবং মিরপুর-১১ ও ১২ মিলে আরও শতাধিক বেনারসির দোকান রয়েছে।। এখানে ২০-৩০ প্রকারের ডিজাইনের শাড়ি পাওয়া যায়। এসব শাড়ির গুণগত মানও যেমন উন্নত তেমনি দামও চড়া। যেমন –  মসলিন বেনারসি ৮ থেকে ১৭ হাজার টাকা, কাতান বেনারসি ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা, ব্রোকেট বেনারসি ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা, কার্পেট বেনারসি ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা, মসলিন ২-৩ হাজার টাকা, নেট জুট সাড়ে ৪ থেকে ৮ হাজার টাকা, বিয়ের গর্জিয়াস শাড়ি ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা, সফট সিল্ক ৪ থেকে ৪২০০ টাকা, ঢাকাই জামদানি ৪ থেকে ৩০ হাজার টাকা, রেডি কোচা ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা, জুট হাফ সিল্ক আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া হানিকোট বেনারসি সাড়ে ৪ হাজার টাকা, রাজকোট বেনারসি ৫ হাজার টাকা, সুতি বালুচুরি ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, টিস্যু জুট সিল্ক জামদানি ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা, পিয়ান ও খাদি বেনারসি ৭ থেকে ১২ হাজার টাকা, কাঁথা স্ট্রিচ ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা, টাঙ্গাইল সুতি জামদানি ১ থেকে ১৫ হাজার টাকা, মাসলাইস কাতান ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা, শাটিন বেনারসি ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

সমৃদ্ধকরন
  • বেনারসি শাড়ি মূল উৎপত্তিস্থল হিসেবে ভারতের বেনারশ  শহরের নাম চলে আসে ।
  • বেনারস শহরের সিংহভাগ তাঁতী  আনসার সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন বলে জানা যায় ।
  • ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ভারতের বেনারসের প্রায় ৩৭০টি মুসলমান তাঁতি পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় এরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ব্যবসা শুরু করে।
  • এই শাড়ি মানবচালিত একটি যন্ত্রের সাহায্যে তৈরি করা হয়। যাকে বলা হয় তাঁত। আর কারিগরদের বলা হয় তাঁতী ।
  • এই শাড়ি তৈরির মূল উপাদান হলো  কাঁচা রেশম সুতা। এর পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় জরি সুতা।
  • বর্তমানে দেশী রেশম সুতার দাম বৃদ্ধির কারণে তাঁতীরা সস্তা চায়না সিল্ক সুতা ব্যবহার করে থাকেন।
  • ধরন বা ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে  শাড়ির বিভিন্ন  নাম। এখানে ২০-৩০ প্রকারের ডিজাইনের শাড়ি পাওয়া যায়।
  • বর্তমানে মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ মিলিয়ে মোট ২ হাজারের মতো কারখানা রয়েছে।
  • বেনারসি শাড়ি স্থানীয় কারিগরদের হাতে দেশে তৈরি হলেও এর কাঁচামাল আসে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, চীন থেকে। আর আমাদের দেশে বানানো এইসব শাড়ি রফতানি হয় ভারত, পাকিস্তান, চীন ও আমেরিকায়।
মিরপুর বেনারসি পল্লী

তথ্যসূত্র :

wikibangla

banglanews24

dailyjanakantha

image : Google Search engine


আরো পড়ুন :

ঐতিহ্যময় হস্ত ও কারুশিল্প মানচিত্র >>>

ঢাকা বিভাগ  >>>

চট্টগ্রাম বিভাগ >>>

খুলনা বিভাগ >>>

বরিশাল বিভাগ >>>

ময়মনসিংহ বিভাগ >>>

রংপুর বিভাগ >>>

রাজশাহী বিভাগ >>>

সিলেট জেলার >>>


Spread the love

Leave a Reply

%d bloggers like this: