Khadi-Weaving-খাদি-পুরাণ-x-bfa-x-fxyz-web

খাদি পুরাণ

দেখতে যেন বাঙালির অন্দরমহলের মতোই। সিদেসাধা, আটপৌরে– তবু একটা মায়া লেগে আছে এর প্রতিটি কোণে।

“চরকা কাটা খাদি কাপড়

সাদাসিধা বেশ

দেশের শিকল ছিঁড়তে হলো–

গোরা শাসন শেষ।”

খুব বেশি চটকদার নয়, দেখতে যেন বাঙালির অন্দরমহলের মতোই। সিদেসাধা, আটপৌরে– তবু একটা মায়া লেগে আছে এর প্রতিটি কোণে। আর এ মায়া অতিক্রম করে যাওয়ার উপায় কারো নেই। গায়ে জড়িয়ে নেয়া এক টুকরো ওম, সকালের মুখ দিয়ে বের হওয়া ধোঁয়া কিংবা বিকেলের ঘুরতে যাওয়া; সবের সাথেই ভীষণ মানিয়ে যায় এই কাপড়টি। যার কথা কবিতা হয়ে উঠলো এই লেখার ভূমিকায়– অরূপ গোস্বামীর কবিতায়।

বলছিলাম আমাদের ঘরেরই আপন একজনার আলাপ, খাদি কাপড়ের কথা। ভারতীয় বস্ত্রশিল্পের অন্যতম স্তম্ভ হচ্ছে এই ‘আদ্যিকালের খাদি’। এর সাথে জড়িয়ে আছে একসময়ের যুগী বা দেবনাথ পরিবার, স্বরাজ আন্দোলন এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ধ্বজাধারী মহাত্মা গান্ধীর নাম। একটি সাদামাটা কাপড় কীভাবে একটি জাতির মুক্তি ও স্বনির্ভরতার পথে অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে– কুমিল্লার খাদি তারই জ্বলজ্যান্ত এক দৃষ্টান্ত।

‘খাদি’র আদিকথা

সবার আগে জেনে নেওয়া যাক এর নামকরণের পেছনের গল্পটা। কথায় আছে, প্রয়োজনীয়তাই উদ্ভাবনের জনক। খাদির ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই ঘটেছে। আসলে খাদিশিল্প যখন রমরমা ব্যবসা হয়ে উঠছে, তখন তো আর আজকের মতো প্রযুক্তি এতটা এগিয়ে যায়নি। যে সময়ের কথা বলছি, তখন কারখানা বা মেশিন বলতেও কিন্তু ঐ হাতে টানা তাঁত। কিন্তু তাঁতে যে কাপড় বেরোত, সেই তাঁত খুব বেশি জোরে চালানো যেত না। সেই থেকে বুদ্ধি এলো তাঁতীদের মাথায়। কেমন হয়, যদি একটা মাটির গর্ত করে রাখা হয় তাঁতের প্যাডেলের নিচে? তাহলেই অনেকটা জোরে চালানো যাবে তাঁত। আর সেই খাদগুলো থেকে এ কাপড়ের জন্ম বলেই নাম হলো ‘খাদি’। স্থানীয় ভাষায় যাকে ‘খদ্দর’ নামেও ডাকা হয়। তবে ‘খদ্দর’ শব্দটি আবার গুজরাটের সাথে যুক্ত বলে অনেকের ধারণা, এটি গান্ধীজীর গুজরাটি শেকড়েরই ছাপ। খাদির সাথে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস। মহাত্মা গান্ধী যখন অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন, তখন বহু লোকেই ঝুঁকে পড়ে দেশীয় পণ্যের ব্যবহারের দিকে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল খাদি কাপড়। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রিয় এই খাদিকে তারা বলতেন ‘মায়ের দেয়া মোটা কাপড়’। দেশকে মায়ের স্থানে বসিয়ে তারা সেই মায়ের নিজস্ব পণ্যকেই সাথে রেখেছিলেন, দেশকে মুক্ত করার সময়ে।

সে সময় খাদি কাপড় তৈরি করতেন যারা, তাদেরকে বলা হতো যুগী বা দেবনাথ। বেশিরভাগ যুগী পরিবারই তখন বাস করতেন কুমিল্লার বিভিন্ন থানায়। আর তাই খাদির জন্মকথার সাথে স্বাভাবিকতই জুড়ে যায় কুমিল্লার ঠিকানা। এ সময়ে গান্ধীজীর প্রতিষ্ঠিত অভয় আশ্রম নামক সংগঠনটি কম দামে চরকা ও সুতার যোগান দিত তাঁতীদের। শুধু তাই নয়, কাপড় বিক্রির ক্ষেত্রেও তারা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। এই পৃষ্ঠপোষকতার ফলে কুমিল্লার বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা খাদি কাপড়

ছড়িয়ে পড়ে দেশের বহু স্থানে। আর পরবর্তীতে দেশান্তরেও। হাতে বোনা সুতায় তৈরি কাপড়ে সুতার বন্ধনগুলো একটু ঢিলেঢালা থাকে, কাপড় অমসৃণ হয়– তাই হাওয়া চলাচলের সুবিধা হয়। সেইসাথে খাদিতে ব্যবহৃত সুতাগুলো তাপ সুপরিবাহী হওয়ায় যেকোনো ঋতুতেই পরতে অনেক আরাম লাগে। একে অনেকটা এয়ার-কন্ডিশনড কাপড় বললেও ভুল হবে না।

আজকের খাদি যেমন

পাঞ্জাবির উপর গায়ে জড়িয়ে রাখা একখানা সাদাটে চাদর, কাঁধে ঝুলতে থাকা বোহেমিয়ান ধাঁচের কবি-ব্যাগ আর উস্কোখুস্কো চুলদাড়ি। এই তো ছিল এক সময়ের প্রগতিশীল বাঙালি শিক্ষিত যুবক আর তার আবহমান বাংলার ফ্যাশন। এখনকার যুগে এসেও সেই স্টাইল সিগনেচার কিন্তু অনেকের কাছেই বেশ প্রেফারেবল! বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গায়ের চাদরটি হতো খাদি কাপড়ের। খাদি শাড়ি পরা স্বদেশী নারীর সংখ্যাও কম ছিল না। বিলিতি ফ্যাশনে গা না ভাসিয়ে অনেকেই একে নিজস্ব জায়গা থেকে বিপ্লবের ভাষা বলে মেনে নিতেন। খাদি পরনের অর্থ তখন একদিক দিয়ে ছিল কৃচ্ছ্রসাধনও। বিদেশী পণ্য বর্জন, সাথে নিজেদের পণ্যকে সরাসরি তুলে ধরা, আর সব মিলিয়ে সময়ানুসারে পুরো ব্যাপারটা ক্যারি করে যাওয়া যাকে বলে। আর সেই জায়গা থেকে খাদি কাপড় শুরু থেকে শুরু করে আজতক নিজের সেই জায়গা কিন্তু ধরে রাখতে পেরেছে।

তবে সময়ের সাথে রূপ পালটায় সবকিছুই। চাহিদার সাথে যোগানও তার চেহারা বদলে হয়ে ওঠে চাহিদাসম্পন্ন। খাদির ক্ষেত্রেও তার অন্যথা ঘটেনি। একসময় যখন বৈচিত্র্যের কমতি আছে বলে খাদি হারিয়ে যেতে বসে, তখনই যেন তার নতুন জন্ম ঘটে। খাদি তার আদি রূপ থেকে তাই এখন অনেকটাই আলাদা, আরো অনেক বেশি ফ্যাশনেবল। কোমল ও স্নিগ্ধ চেহারার খাদি কাপড় সেই চিরাচরিত রূপ ছেড়ে এখন শহুরে ছাঁচে নিজেকে ঢেলে নিতে শিখেছে। কুর্তি, টপস, ফতুয়া ইত্যাদি বিভিন্ন পোশাকেই এখন খাদির দেখা মেলে। আর শুধু সেই সাদা, বাদামি কিংবা ঘিয়ে রঙেই নয়; প্রযুক্তির কল্যাণে খাদিতে যোগ হয়েছে বহু বাহারি রঙের মেলা। খাদি মানেই এই দু-তিনটে রঙ কিংবা ‘রঙবিহীন কারবার’– এই ধারণা ডিঙিয়ে খাদি পেরিয়ে এসেছে অনেকটা দীর্ঘ পথ। যে পথের শেষে আছে এক অধুনা গন্তব্য, তবে শেকড় থেকে দূরে গিয়ে নয়। নিজের শেকড়ের খুব কাছে থেকেও ভবিষ্যতের অংশ হয়ে উঠেছে বাঙালি প্রিয় কাপড়– খাদি।


ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব বাংলাদেশ (এফডিসিবি) আয়োজনে ২০১৫ সাল থেকে খাদি উৎসব দেশের একটি বৃহৎ সৃজনশীল উৎসবে পরিণত হয়েছে। আমাদের তাঁতিদের তৈরি খাদি কাপড় এরই মধ্যে নতুনভাবে জেগে উঠতে শুরু করেছে। তরুণেরা আবার ঝুঁকছেন খাদির পোশাকে। দেশের কারুশিল্পের জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে সহায়ক হবে এই আয়োজন।’
এফডিসিবির সভাপতি মাহিন খান

খাদি উৎসব ২০১৫

KHADI FEST 2015

ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অফ বাংলাদেশ এবং ট্রেসেমি উদ্যোগে ঢাকার র‍্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনে এ উৎসবের আয়োজন করা হয় । এ উৎসবের টাইটেল ছিল ‘ট্রেসেমি খাদি উৎসব ’ | TRESemme KHADI FESTIVAL 2015

Khadi Fest 2016

খাদি উৎসব ২০১৬

KHADI FEST 2016

‘হেরিটেজ আর্কিটেকচার’ থিম নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত হয় ‘ KHADI FEST 2016 | খাদি উৎসব ২০১৬’।  

Tenzing Chakma | তেনজিং চাকমা

খাদি উৎসব ২০১৭

KHADI FEST 2017

লোকজ মোটিফ
থিম নিয়ে
তৃতীয় বারের মত, ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব বাংলাদেশ (এফডিসিবি) আয়োজন করে ‘ট্রেসেমে খাদি, দ্য ফিউচার ফেব্রিক শো ২০১৭’

এফডিসিবির ‘খাদি : ফিউচার ফেব্রিক শো’ ২০২৪ | FDCB

‘খাদি : ফিউচার ফেব্রিক শো’ ২০২৪

Khadi Fest 2024

ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশবান্ধব খাদি পোশাকের প্রসার নিশ্চিত করার উদেশ্যে আয়োজন করা হয়েছে ‘খাদি : দ্য ফিউচার ফেব্রিক শো’।


খাদি মানেই মোটা কাপড়, এই বিষয়টিও এখন মিথ পর্যায়ে চলে গেছে। কেননা এর জায়গা করে নিয়েছে পাতলা খাদি। আগে যেমন খাদি তৈরিতে শুধু কার্পাস তুলাই ব্যবহার করা হতো, বিশেষ করে রাঙামাটি থেকে আনা কার্পাস তুলা। কিন্তু এখন খাদির বুননে যোগ করা হচ্ছে বিভিন্ন কাউন্টের অন্যান্য সুতো। এর মধ্যে রয়েছে এন্ডি, মুগা, তসর, উল ইত্যাদি তন্তু। তাই খুব সহজে পরা যায়, সহজে বহন করা যায় এই খাদি। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সকল পোশাকেই এই খাদি ব্যবহার করা হচ্ছে। নকশায় যোগ করা হচ্ছে বাহারি বোতাম, বর্ডার এবং বিভিন্ন জ্যামিতিক প্যাটার্ন। তবে মোটা খাদি, অর্থাৎ ২০ থেকে ৪০ কাউন্ট সুতায় তৈরি খাদির আবেদন যে একেবারে ফুরিয়ে গেছে, তা কিন্তু নয়। এটি দিয়ে তৈরি হচ্ছে জানালার পর্দা, বিছানার চাদর, শীতের শাল এবং অন্যান্য শীতবস্ত্র। জামা, শাড়ি বা পাঞ্জাবির উপর পরার জন্য মোটা খাদির তৈরি কটিও বেশ ফ্যাশনেবল পছন্দ বলেই ধরে নেয়া হয়। সুতার মিশ্রণে রেশম যোগ করায় হাল ফ্যাশনে যোগ হয়েছে খাদি সিল্কের মতো কাপড়ও, যাতে তৈরি শাড়ি নারীদের জন্য হয়ে উঠেছে একরকম আভিজাত্যের প্রতীক।

এখনো কুমিল্লায় খাঁটি খাদিপণ্যের বিভিন্ন দোকান রয়েছে, যেখান থেকে সহজেই সংগ্রহ করা যাবে খাদি গজ কাপড় বা তৈরী পোশাক। এসব দোকানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে খাদি হাউজ, খাদি আড়ং, গ্রামীণ খাদি ইত্যাদি। একেকটি খাদি শাড়ির মূল্য ডিজাইন ও মানের উপর ভিত্তি করে পড়তে পারে ৪০০-১২০০ টাকা। এছাড়া ফেসবুকে খাদি নামে একটি গ্রুপও রয়েছে, যেখানে খাদি শিল্পকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার– খাদি পণ্য বিক্রয় ও ব্যবহারের বিষয়ে কথা বলা হয়। ইনস্টাগ্রামের এমন একটি অনলাইন শপ হচ্ছে ‘কুমিল্লার খাদি শিল্প’। এছাড়াও বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজ ও অনলাইন শপ বর্তমানে খাদিকে নিজের মতো করে বিভিন্ন রঙে ও নকশাও তুলে ধরছেন ক্রেতাদের কাছে। ক্রেতারাও ফিরে যাচ্ছেন পুরাতন সেই খাদিতে, মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়ের নতুন রূপে। সাশ্রয়ী ফ্যাশন যাদের পছন্দের, তারা একবার হলেও খাদিপণ্য ব্যবহার করে দেখতে পারেন।



খাদি : ফিউচার ফেব্রিক

খাদি পুরাণ

দেখতে যেন বাঙালির অন্দরমহলের মতোই। সিদেসাধা, আটপৌরে– তবু একটা মায়া লেগে আছে এর প্রতিটি কোণে।

Read More..

চুরি হওয়া কোনো শাড়ির নাম, টাঙ্গাইল শাড়ি

টাঙ্গাইলের শাড়ি, টাঙ্গাইলেই হবে, ব্যস। আলাপ খতম।

Read More..

বাংলাদেশের জিআই পণ্যসমূহ – সমৃদ্ধময় বাংলাদেশ

কথা হচ্ছে নিদৃষ্ট কিছু স্থান নয়, আমাদের এগিয়ে আসতে হবে প্রতিটি পর্যায়ে- আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার, ঐতিহ্যবাহী স্থান, আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের আলোকিত পূর্ব পুরুষ, যাদের আত্নত্যাগে আমরা আলোকিত।

Read More..

নকশি কাঁথা: বাংলাদেশের লোকশিল্পের একটা অংশ

একটি নকশী কাথাঁ সেলাইয়ের পিছনে থাকে আনেক হাসি-কান্নার কাহিনী। জীবনের গল্প। বিচ্ছেদের গল্প।

Read More..

জামদানি | মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী

ভোরবেলা সুতো প্রস্তুতের সবচেয়ে ভালো সময়। কেননা, এসময় বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকে। এ কারণে দেশের অন্য কোথাও জামদানি তৈরি সম্ভব হয় না।

Read More..

লুঙ্গি কথন | LUNGI CONVERSE

দেশ ভাগের পর পূর্ববাংলায় হিন্দুদের থেকে মুসলমানরা যে আলাদা তা প্রমান করতে কাকাকে চাচা, জলকে পানি বলা কিংবা হাত জোড় করে নমস্কার পরিহার করার মতই ধুতির জায়গা দখল করে নেয় লুঙ্গি। বলা যায় বাংলায় লুঙ্গির প্রচলন মুসলমানদের হাত ধরেই।

Read More..

About Post Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

আপনার একটি শেয়ার আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা

X (Twitter)
Post on X
Pinterest
fb-share-icon
Instagram
FbMessenger
Open chat
1
Scan the code
Hello
How can i help you?
Skip to content