ইতিহাস সংরক্ষণ শুধু ভবন রক্ষা করা না, মানুষকে যুক্ত করাটাও সমান জরুরি। আজ যেভাবে স্কুল–মাদরাসার বাচ্চারা এখানে এসে ইতিহাস দেখল, প্রশ্ন করল—এই চর্চাটাই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। হয়তো সবাই ইতিহাসবিদ হবে না। কিন্তু কেউ কেউ অবশ্যই হবে। আর সেই কয়েকজনই একদিন আমাদের গল্পটা পৃথিবীকে বলবে।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে রংপুর যাওয়া হয়েছিল। নতুন কোনো জেলায় গেলে ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখাই আমার বরাবরের প্রথম পছন্দ। সেই হিসেবেই রংপুর পৌঁছে প্রথম গন্তব্য ছিল তাজহাট জমিদার বাড়ি। শীতের নরম আলো, হালকা রোদ—মুহূর্তটা সত্যিই উপভোগ্য ছিল। যদিও এ বছর খুব একটা শীতের আমেজ পাওয়া যায়নি, তবুও সকালের সেই আরামদায়ক আবহে তাজহাটের সাদা মার্বেলের প্রাসাদটাকে বেশ আলাদা লাগছিল। শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে ইতিহাসের এক টুকরো সময়ের সামনে এসে দাঁড়ানোর অনুভূতিটা তখন ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল।
জমিদার বাড়ি পৌঁছানোর মুহূর্তটাই ছিল আলাদা। গেটের সামনে গিয়ে দেখি—পরপর তিনটা বাস দাঁড়িয়ে আছে। বাস থেকে নামছে ছোট ছোট বাচ্চারা। কেউ স্কুল ইউনিফর্মে, কেউ মাদরাসার পোশাকে। সঙ্গে শিক্ষকরা। দৃশ্যটা দেখে অজান্তেই ভালো লেগে গেল। সবাই লাইন ধরে, খুব ডিসিপ্লিন মেনে গেট দিয়ে ঢুকছে। শিক্ষকরা সামনে–পেছনে থেকে গাইড করছে। কেউ দৌড়াদৌড়ি করছে না, কেউ চেঁচাচ্ছে না। একটা ঐতিহাসিক স্থানে ঢোকার সময় এমন শৃঙ্খলা—এটা সত্যিই চোখে পড়ার মতো।
আরেকটা বিষয় খেয়াল করলাম—বাচ্চাদের কোনো টিকিট কাটতে হচ্ছে না। যদিও সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ টিকিট ৩০ টাকা। পরে জেনে ভালো লাগল, শিক্ষার্থীদের জন্য টিকিট লাগে না। এটা খুবই ইতিবাচক উদ্যোগ। ইতিহাস দেখার সুযোগ যেন টাকার কারণে আটকে না যায়—এই ভাবনাটা ভালো।
ভেতরে ঢুকে দেখি, বাচ্চারা ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে ঘুরছে। কেউ দেয়ালের কারুকাজ দেখছে, কেউ বড় সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছে— “এই বাড়িতে কে থাকত?” “এটা কি আসল মার্বেল?” “এখানে আগে কী হতো?”
শিক্ষকরা ধৈর্য নিয়ে বোঝাচ্ছেন। আবার অনেক সময় বাচ্চারাই একে অন্যকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে। ওদের চোখে কৌতূহল ছিল। ইতিহাস যে শুধু বইয়ের পাতায় না—এই জায়গাটা ওরা বুঝতে পারছে, সেটা দেখেই ভালো লাগছিল। আমি ভাবছিলাম—এই দেড়শো বাচ্চার মধ্যে হয়তো সবাই ইতিহাসপ্রেমী হবে না। কিন্তু যদি ৪–৫ জনও আজকের এই দেখা থেকে ভাবতে শেখে, বড় হয়ে হেরিটেজ নিয়ে কাজ করতে চায়, আমাদের ইতিহাসকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে চায়—তাহলেই এই সফর সার্থক। এবার তাজহাট জমিদার বাড়ির কথায় আসি
তাজহাট জমিদার
বাড়ির ইতিহাস
.
জানা যায়, জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা মান্না লাল রায় পাঞ্জাব থেকে রংপুরে এসে বসতি গড়েন। তিনি মাহিগঞ্জ এলাকায় স্বর্ণের তৈরি তাজ বা রত্নখচিত মুকুট বানানো ও কেনাবেচার প্রচলন শুরু করেন। ধারণা করা হয়, এই ‘তাজ’ থেকেই এলাকাটির নাম হয় তাজহাট। জমিদার মান্না লাল রায় মারা যাবার পর তার দ্ত্তক পুত্র গোপাল লাল রায় বাহাদুর জমিদারি পরিচালরা শুরু করেন। মতান্তরে বলা হয়, ১৯০৮ সালে রাজা কুমার গোপাল লাল রায় এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করেন।
জমিদার বাড়িটি দেখতে অনেকটা ঢাকার আহসান মঞ্জিল এর মত। এর মুল কারন মাথার ওপর বড় একটা গম্বুজ—যেটা পুরো স্থাপনাটাকে আলাদা একটা চরিত্র দিয়েছে। প্রাসাদের ভেতরের পুরো ভাগে আছে ৩ মিটার প্রশস্ত বারান্দা। প্রাসাদটি পূর্বমুখী, দৈর্ঘ্যে প্রায় ৭৬ মিটার, প্রস্থে ১৫ মিটার। পুরোটা সাদা মার্বেলে তৈরি। এছাড়াও ওপরের তলায় ওঠার জন্য দুটি কাঠের তৈরি সিঁড়িও আছে। এ প্রাসাদে ছোট বড় মোট ২২টি কক্ষ আছে। মাঝখানে বড় সিঁড়ি, ওপরে উঠে গেছে দ্বিতীয় তলায়। এক সময় এই সিঁড়ির দু’পাশে ইটালীয় মার্বেলের তৈরি রোমান দেবদেবীর মূর্তি ছিল। এখন সেগুলো ভেতরের জাদুঘরে রাখা হয়েছে। প্রাসাদটির নিচতলায় রয়েছে দরবার হল ঘর।
দরবার হল থেকে হাইকোর্টথেকেজাদুঘর
দরবার হল থেকে হাইকোর্ট
প্রাসাদের নিচতলায় ছিল দরবার হল—যেখানে জমিদারি আমলে গুরুত্বপূর্ণ সভা বসত। ভাবতে অবাক লাগে, এই একই ভবন ১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বেঞ্চ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। একটা জমিদার বাড়ি—যেটা পরে আদালত হয়েছে—এই ইতিহাসটা তাজহাটকে আরও আলাদা করে তোলে।
জাদুঘর
১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রাসাদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করলে সে সময় থেকে প্রাসাদটি রক্ষণের কাজ শুরু হয়। ২০০২ সালে প্রাসাদের কিছু অংশে জাদুঘর তৈরির প্রস্তাবনা পাশ হয় এবং ২০০৫ সালে এখানে জাদুঘর চালু হয়। ভেতরে আছে পুরনো সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি, পিতল–কাঁসার জিনিসপত্র, জমিদার বংশের ইতিহাসের দলিল। এছাড়াও জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে মুঘল সম্রাট আওরাঙ্গজেবের সময়ের কুরান, মহাভারত ও রামায়নসহ বেশ কিছু আরবি এবং সংস্কিৃত ভাষায় লেখা প্রাচিন পান্ডুলিপি। কালো পাথরের বিষ্ণু মূর্তি ছাড়াও জাদুঘরে ৩০০টি মুল্যবান নিদশর্ন রয়েছে।
রংপুরে থাকা–খাওয়া
আমি রংপুরে থাকার জন্য ছিলাম ব্র্যাক বিএলসি (BRAC BLC)-তে। জায়গাটা আমার ভালো লেগেছে। নিরাপদ ও শান্ত পরিবেশ। ৩-স্টার মানের সুযোগ–সুবিধা। ভেতরেই ডাইনিং ব্যবস্থা আছে জায়গাটা বেশ বড়, খোলামেলা নিজের মতো করে হাঁটাহাঁটি করা যায়, ঘুরে বেড়ানো যায়। অফিসের কাজ হোক বা পরিবার নিয়ে থাকা—দুই ক্ষেত্রেই জায়গাটা বেশ আরামদায়ক মনে হয়েছে।
ঢাকা থেকে রংপুর যেতে হলে গাবতলী, কল্যাণপুর বা মহাখালী থেকে রংপুরগামী বাস পাওয়া যায়। সাধারণত ৮–৯ ঘণ্টার ভ্রমণ। রাতে বাসে গেলে সকালে রংপুর পৌঁছানো যায়। রংপুর শহর থেকে তাজহাট জমিদার বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়। অটো বা রিকশায় সহজেই যাওয়া যায়।
প্রবেশমূল্য
সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ টিকিট: ৩০ টাকা, শিক্ষার্থী ও শিশুদের জন্য: ফ্রি জাদুঘর পরিদর্শনের সময়সূচি সাধারণত সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটিতে সময়সূচি একটু পরিবর্তন হতে পারে।
লোকালদের সাথে কথা বলুন:
অনেক সময় আশেপাশের মানুষদের কাছ থেকে ছোট ছোট অজানা গল্প শোনা যায়, যা ভ্রমণটাকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।
সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা:
জায়গাটা একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি, তাই ঘোরার সময় একটু সচেতন থাকা দরকার। দেয়ালে হাত না দেওয়া, কোথাও না লেখা—এই ছোট বিষয়গুলো খেয়াল রাখলে জায়গাটার সৌন্দর্য অটুট থাকে। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না। মার্বেলের সিঁড়ি আর বারান্দা কিছু জায়গায় পিচ্ছিল হতে পারে, তাই ধীরে হাঁটা ভালো।
আপনার একটি শেয়ার এবং মন্তব্য আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা ❤️
Warning: Undefined array key "sfsi_threadsIcon_order" in /home/bdfashio/public_html/wp-content/plugins/ultimate-social-media-icons/libs/controllers/sfsi_frontpopUp.php on line 165
Warning: Undefined array key "sfsi_blueskyIcon_order" in /home/bdfashio/public_html/wp-content/plugins/ultimate-social-media-icons/libs/controllers/sfsi_frontpopUp.php on line 170