কোমর তাঁত:
পাহাড়ি বুননের লয়, আত্মপরিচয়ের অংশ
পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন বাংলাদেশের রঙিন প্রাণভূমি। এখানে আছে ঝর্ণার জলের ছন্দ, পাহাড়ের ঢেউয়ে ভেসে আসা নৈঃশব্দ্য, সূর্যাস্তের লালচে আভা আর আছে আত্মনির্ভর এক শিল্প—কোমর তাঁত। এ শিল্প শুধু কাপড় তৈরির উপায় নয়, বরং পাহাড়ি নারীদের আত্মপরিচয়ের এক অভিব্যক্তি। বাংলাদেশের একমাত্র পার্বত্য অঞ্চল এই চট্টগ্রামে ১১টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বসবাস—চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খেয়াং, লুসাই, মুরুং, খুমি, পাংখোয়া এবং চাক। তাদের প্রায় প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নারীরা কোনও না কোনওভাবে কোমর তাঁতের সঙ্গে যুক্ত। বলা হয় প্রায় ৯০ শতাংশ নারীরা কোমরতাঁত বোনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই তাঁত তাদের জীবনের সঙ্গে যেমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে, তেমনি তা হয়ে উঠেছে পাহাড়ের সংস্কৃতি, গৃহস্থালি ও আর্থিক স্বনির্ভরতার ভিত্তি।
এক সময় পাহাড়ি সমাজে নারীদের বিয়ের আগে তাঁতের কাজ জানা বাধ্যতামূলক ছিল। মেয়েরা মা ও বোনদের কাছ থেকে শিখে নিত কোমর তাঁতের পদ্ধতি। এখন সে বাধ্যবাধকতা না থাকলেও ঐতিহ্যের টানে আজও অনেক মেয়ে ছোটবেলা থেকেই এই বুননের সঙ্গে পরিচিত হয়। যদিও আজকের প্রজন্মের অনেকেই এই পেশা বেছে নেয় না, তবুও অনেক নারী এখনও গৃহস্থালির পাশাপাশি তাঁতের কাজ করে সংসার চালান।
বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি কোমর তাঁত যন্ত্রটির নাম এসেছে তার ব্যবহারের ধরন থেকে। এ যন্ত্র কোমরে বেঁধে উবু হয়ে বসে নারীরা বুননের কাজ করেন, যেন তাঁতের প্রতিটি সুতোয় তাঁরা বুনে চলেছেন নিজেদের ইতিহাস, আবেগ, আর আত্মপরিচয়। পাহাড়ি বাড়ির উঠানে কিংবা বারান্দায় বসেই চলে এই বুননের কাজ, যেটা দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি এর ভেতর রয়েছে সময়, ধৈর্য আর পরিশ্রমের এক বিশাল গল্প।
প্রাচীনকালে তারা নিজেরাই তুলা উৎপাদন করতেন। শিমুল গাছের তুলা থেকে চরকার মাধ্যমে সুতা তৈরি হতো, তারপর সেই সুতো রঙ করে তৈরি হতো পিনন ও থামি। বর্তমানে যদিও স্থানীয় তুলা উৎপাদন কমে এসেছে, তবু তাঁতিরা আধুনিক মেশিনে না গিয়ে প্রাচীন কাঠামোকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।
এই অঞ্চলে শত শত বছর ধরে কোমর তাঁতের মাধ্যমে তৈরি হয়ে আসছে পিনন ( কোমর থেকে স্কাট এর মত ), খাদি (ওপরের চাদর বা ব্লাউজ), গামছা, লুঙ্গি, চাদর, ওড়না, টুপি, রুমাল, এমনকি বিছানার চাদর, ব্যাগ, গৃহসজ্জার সামগ্রীও। এক সময় এই তাঁতের পণ্য শুধুই নিজেদের ব্যবহারেই সীমিত ছিল। নারীরা ঘরের কাজ আর জুম চাষের ফাঁকে নিজের পোশাক নিজেরাই তৈরি করতেন। পুরুষরা পরত ধুতি, গামছা আর শার্ট; আর নারীরা পরতেন পিনন, থামি, ব্লাউজ। সময় বদলেছে, পোশাকেও এসেছে পরিবর্তন—পুরুষরা এখন প্যান্ট-শার্ট পরে, তবে নারীরা আজও বিশেষ দিনগুলোতে ঐতিহ্যবাহী তাঁতের পোশাকেই নিজেদের তুলে ধরেন।