saree of Bangladesh বাংলাদেশি সেরা ১০ শাড়ি web

Saree of Bangladesh | The Bearer of Tradition .

 বাংলাদেশি সেরা দশ শাড়ি

দেশিয় সংস্কৃতির এক অনন্য অনুষঙ্গ হলো শাড়ি। যা বাংলাদেশের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক । একেকটি শাড়ি যেন একেকটি ভালোবাসার গল্প ।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  

বাঙালি নারীর কাছে শাড়ি শুধুমাত্র পোশাক নয়। একেকটি শাড়ি যেন তাদের কাছে একেকটি ভালোবাসার গল্প । কোনটি হয়তো সদ্য কৈশোরে পা রাখা মেয়ের আবদার পূরণে মায়ের কিনে দেয়া শাড়ি। আবার কোন শাড়িতে হয়তো জড়িয়ে আছে বিয়েতে পাওয়া প্রথম উপহারের আবেগ। দেশিয় সংস্কৃতির এক অনন্য অনুষঙ্গ হলো শাড়ি। যা বাংলাদেশের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক ।

বলা চলে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে শাড়ির প‍্রচলন শুরু হয়েছে যা বলতে একখণ্ড বস্ত্র বা কাপড় বোঝাতো। এই বস্ত্র খানা আবার পুরুষে পড়লে হতো ধুতি। শাড়ির ইতিহাস ঘেটে জানা যায় শাড়ি শব্দ টি এসেছে সংস্কৃত শব্দ শাটি থেকে। শাড়ি শব্দের অস্তিত্ব সংস্কৃত ছাড়াও অন্য ভাষায় ও ছিলো তবে অন্য নামে। যেমন মধ্য ভারতীয় আর্যরা শাড়ি কে বলত সাটক বা সাটিকা

ষাটের দশকের কবি আবুল হাসানের কবিতায় কবি বলেছেন –

‘তুমি তো নও আম্রপালী,

বর্তমানের নারী

তোমার লাগে লিনোলিয়াম

 সিফনঘেরা শাড়ি’।

  

বাংলাদেশি সেরা দশ শাড়ি | SAREE OF BANGLADESH

SAREE MAP OF BANGLADESH

saree map of Bangladesh-bfa X fxyz-2022

টাঙ্গাইলের শাড়ি

ঢাকা বিভাগের মধ্যে টাঙ্গাইলের শাড়ি দেশ খ্যাত। টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি গুলো অত্যন্ত মানসম্মত ও রুচিশীল। যেমন- খেশ শাড়ি, জুম শাড়ি, গ্যাস কটন শাড়ি, কটকি শাড়ি, মাসলাইস শাড়ি, কোটা শাড়ি।

টাঙ্গাইল তাঁতশিল্প বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো কুটিরশিল্প। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই ঐতিহ্যবাহী শাড়ি টাঙ্গাইল জেলায় তৈরী হয় এবং এই জেলার নামেই এর নামকরণ করা হয়েছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে টাঙ্গাইল তাঁত শিল্পের ব্যাপ্তি পপ্রসারিত হয়। টাঙ্গাইল শাড়ির তাঁতিরা মূলত ঐতিহ্যবাহী মসলিন তাঁতশিল্পীদের বংশধর। তাদের আদি নিবাস ছিল ঢাকা জেলার ধামরাই ও চৌহাট্টায়। তারা দেলদুয়ার, সন্তোষ ও ঘ্রিন্দা এলাকার জমিদারদের আমন্ত্রনে টাঙ্গাইল যায় এবং পরবর্তিতে সেখানে বসবাস শুরু করে। শুরুতে তারা নকশাবিহীন কাপড় তৈরী করত।

১৯০৬ সালে মহাত্মা গান্ধী স্বদেশী আন্দোলনের ডাক দেন। এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ইংল্যান্ডের ল্যাঞ্চাশায়ারের তৈরী কাপড় বর্জন করা। এই সময়ে তৎকালীন পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) এর তাঁত শিল্পের প্রসার লাভ করে। ১৯২৩-২৪ সালে তাঁতের কাপড়ে নকশা প্রবর্তন করা হয়। ১৯৩১-৩২ সালে শাড়ি তৈরীর জন্য জাকুয়ার্ড তাঁত প্রবর্তন করা হয়।

টাঙ্গাইল শাড়ির প্রকারভেদ

  • সুতি শাড়ি
  • আধা রেশমি শাড়ি।
  • হাফ সিল্ক শাড়ি।
  • সফট সিল্ক শাড়ি।
  • সুতি জামদানি শাড়ি।
  • বালুচুরি শাড়ি।
  • ডাংগ্য শাড়ি।
  • গ্যাস মারচেন্ডাইজড শাড়ি।
  • টুইস্টেড সুতি শাড়ি।

টাঙ্গাইলের জামদানী

ঢাকায় জামদানি মটিফ গুলোকে সুতি ও হাফসিল্ক শাড়িতে ফুটিয়ে তুলে টাঙ্গাইলের বসাক তাঁতিরা যে শাড়ি তৈরী করে পাওয়ালুমে সেটাই টাঙ্গাইলের জামদানী।

টাঙ্গাইলের জামদানি দুই ভাবে তৈরি করা হয়।এক ধরনের শাড়ি হয় পাওয়ার লুমে আর এক ধরনের শাড়ি তৈরি হয়  তাত যন্ত্রে।সুতার মধ্যেও রয়েছে ভিন্নতা,হাফ সিল্ক সুতা এবং রেশম সুতা দুই ধরনের সুতা দিয়ে জামদানি তৈরি করা হয়।

টাঙ্গাইল জামদানি তাঁত যন্ত্রে তৈরি করতে ডিজাইন  প্রথমে কাগজে একে নিতে হয়।এরপর তাত যন্ত্রের কলে বসানো হয় । তাঁতি যখন শাড়ি বোনা তৈরি করে  পায়ের সাহায্যে চাপে দিয়ে শাড়ির ডিজাইনের ছাপ বসায় এরপর হাতের সাহায্যে বুনে থাকেন। শাড়ীর তৈরির পর কাটিং করতে হয়। এইভাবে টাঙ্গাইল জামদানি শাড়ী তৈরি হয়।আমি ছোট করে বলেছি আরো অনেক  প্রক্রিয়া রয়েছে।

খেশ শাড়ি

খেশ শাড়ির মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, পুরাতন কাপড় ছাড়া এই শাড়ী তৈরি করা সম্ভব নয়। পুরোনো সুতির কাপড় ছিড়ে ছিড়ে চিকন চিকন দরির মত বানিয়ে তা দিয়ে ভরনার অংশে বিভিন্ন জায়গায় ব্যাবহার করে খেশ শাড়ী তৈরী করা হয় । এক একটি পুরোনো কাপড় থেকে বের হয় ৮০ থেকে ৮৫ টি লাছি সুতা । তারপর এই লাছি সুতা কে রং করে চরকায় ফেলে কাপড়ের ফালি তৈরি করা হয়।

তারপর এই ফালি দিয়ে তাতের সাহায্যে তৈরি করা হয় কাপড়। বিভিন্ন ধরনের কাপড়ের জন্য বিভিন্ন রকম কাপড়ের ফালি দরকার হয়।

এই শাড়ী টির মূল উৎপত্তি স্থল কলকাতার বীরভূমে। এই শাড়ী টির সাথে জড়িত আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম। ভারতের বীরভূম জেলার তাঁতীরা মূলত এই শাড়ী টি তৈরি শুরু করে। তাদের মতে তাদের পূর্ব পুরুষদের এই শাড়ী তৈরির হাতেখরি হয়েছিলো শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিদ্যালয়ে, শিল্পসনদে। শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবিন্দ্রনাথের জন্যই সেখানকার শিল্পীরা কাঁথা সেলাইয়ের কায়দাকে কাজে লাগিয়ে পুরাতন কাপড় দিয়ে খেস শাড়ি তৈরি করেন।

পাবনাই শাড়ি

কন্যা কইরো নাগো মন ভারি;

পাবনা থিইক্যা আইনা দিমু ট্যাহা দামের মটুরি’

পাবনার তাঁত, পাবনার ঐতিহ্য.

তাঁতশিল্পে সমৃদ্ধিশালী পাবনা জেলা। মুগল আমলে হিন্দু ও মুসলিম উভয়ই তাঁত পেশার সাথে জড়িত ছিলেন।  । বর্তমানে বাংলাদেশের পাবনা জেলার মুসলিম তাঁতিরা যেসকল শাড়ি বুনে থাকে তাই পাবনাই শাড়ি। পাবনার অন্যতম তাঁত প্রধান এলাকা হচ্ছে দোগাছী, সুজানগর, বেড়া, সাঁথিয়া এবং আটঘরিয়া। সস্তা উপকরণ তুলা এখানে প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হতো। স্বদেশি আন্দোলনের পর থেকে তুলার চাষ আরও বেড়ে যায়। এখানকার তুলার এবং তাঁতিদের বেশ সুনাম। ১৯২৩ খৃষ্টাব্দে এ জেলায় তাঁতের সংখ্যা দাঁড়ায় সাড়ে নয় হাজারে। ১৯৪৭ এর শেষ দিকে এ শিল্পে পুনঃ বিকাশ ঘটতে থাকে। ১৯৫৬ তে সরকারি হিসাবে প্রকাশ, জেলায় হাতে চালানো তাঁত রয়েছে সাড়ে ৪২ হাজার। ১৯৭৮ এ হ্যান্ডলুম সেন্সাস অনুযায়ী তাঁতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৬ হাজার। এর মধ্যে নিস্ক্রিয় তাঁত ৩০ হাজার। কারিগর রয়েছে লক্ষাধিক।

বস্ত্র শিল্পের যখন রমরমা অবস্থা তখন অন্য প্রান্তের তাঁত ব্যবসায়ীদের ঈর্ষার বিষয় হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িয়ে যায় এই শিল্পের সাফল্য। দেশ ভাগ (১৯৪৭) হতেই শিল্পের চেহারাটা বদলে যেতে থাকে। অনেক উদ্যোগী মানুষ ও কারিগর চলে যান পশ্চিম বাংলায়। শুরু হয় প্রতিযোগিতা পর্ব।


পাবনা জেলায় বর্তমানে তিন রকমের তাঁত আছে। পাওয়ার লুম, পিটলুম, আর চিত্তরঞ্জন তাঁত 

বর্তমানে পাবনাই শাড়ি নিন্ম ও নিন্মমধ্যবিত্ত নারীদের জন্যই বেশী বুনা হয়। তবে পাবনাতে কিছু বেনারসি তৈরী হয়।

নরসিংদী মালা শাড়ি

নরসিংদী জেলার মালা শাড়ির নাম আমি এবছরই প্রথম জেনেছ। অনেক আগের থেকেই জনপ্রিয় শাড়ি এটা। জ্যাকেট শাড়িও বলা হয়। জ্যাকব মেশিনে তৈরী হয় এই শাড়ি।

রাজশাহী সিল্ক শাড়ি

ঔপনিবেশিক আমল থেকেই বাংলায় শুরু হয় রেশম চাষ। ১৯০৫ সালে রেশম শিল্পের বিকাশের প্রতিষ্ঠা করা হয় দুটি বীজভান্ডার। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ সরকার রেশমের শিল্পকে তদারক করার জন্য আলাদা একটি বিভাগ চালু করে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় বাংলার রেশমপ্রধান অঞ্চল ভারতের অংশে চলে যায়। অল্প কিছু অঞ্চল পড়ে এপার বাংলায়। এর মধ্যে পাকিস্তান সরকারের উদাসীনতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের রেশমশিল্প প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় ব্যক্তিমালিকানায় কিছু উদ্যোক্তা রেশম শিল্পের হাল ধরতে এগিয়ে এলে লোকসানের মুখে পড়তে হয় তাদের। পরে অবশ্য পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থার অধীন রংপুর, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে ১০টি রেশম বীজভান্ডার স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম আমাদের রাজশাহী সিল্ক ফ্যাক্টরি।

রাজশাহী জেলার এক বিশাল  তাঁতি গোষ্ঠী হাতে রেশম সুতার বুননে রাজশাহী সিল্ক বুনা হয়। দোয়েল সিল্ক, মটকা সিল্ক ও আরও অনেক সিল্কের শাড়ি বানানো হয় রাজশাহীতে।

রাজশাহীর সিল্ক মানেই অনিন্দ্য সুন্দর একটি শাড়ি। তুঁত গাছ থেকে পাওয়া সূক্ষ্ম রেশম সুতো দিয়ে তৈরি রাজশাহীর সিল্কের শাড়ির জনপ্রিয়তা ছিল বিদেশেও। সিল্ক কাপড়ের প্রধান উপাদান রেশমকে ঘিরে এ অঞ্চলের রয়েছে সুদীর্ঘ আর উজ্জ্বল অতীত।

মনিপুরী শাড়ি

খেশ, জামদানীর মতোই একটা ঐতিহ্যবাহী শাড়ি। সিলেটের মনিপুরী উপজাতিদের দ্বারাই সাধারণত এই শাড়ি বোনা হয়। মনিপুরী আমাদের নিজস্ব একটা ঐতিহ্য হওয়া সত্বেও এটা ভারতের জিআই পণ্য অথচ আমাদের নয়। কেননা আমাদের নিজস্ব ডিজাইন নেই, নেই এর পরিচর্যা বা প্রচার। তবে এখন অনেকেই মনিপুরীর দিকে আগ্রহী হচ্ছেন।

মনিপুরী  ভাষায় তাঁত কে বলা হয় ইয়োং। এই ইয়োং আাবার দুই ধরনের  একটি মোয়াং ও অপরটি পাং। মোয়াং তাঁত দিয়ে মোটা ধরনের কাপড় বয়ন করা হয়। আর পাং দিয়ে পাতলা সুতার কাপড় বয়ন কর হয়।।

মনিপুরী  শাড়ি  হস্তচালিত  তাঁতে তৈরি  করা হয়। মনিপুরী তাঁতের বৈশিষ্ট্য  হলো এর পাড় এবং এর রং। মনিপুরী  শাড়ি র পারে মৈরাং বা টেম্পল  এর নকশা করা থাকে। এবং শাড়ির মাঝেও নানান রকম নকশা থাকে। মনিপুরী  শাড়ি  নকশা কখনো  এক রকম হয় না কিছু টা জামদানী  শাড়ির মন।। তাঁতি প্রতিটি শাড়িতে মনের মাধুরী মিশিয়ে  নকশা করে থাকে। মনিপুরী শাড়ি  রং এরটা উজ্জ্বল  থাকে বলে নারীরা বেশী পছন্দ  করে। যে কোন অনুষ্ঠানে  বা গরমের মাঝেও মনিপুরী  শাড়ি  গুলো বেষ্ট।

একটি মনিপুরী  শাড়ি  তৈরি  করতে ৩  থেকে ৫ দিন লাগে। ভাল মানের শাড়ি তৈরি  করতে আরো বেশী সময় লাগে।। ভাল মানের শাড়ি গুলো দাম ও একটু বেশী পড়ে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ  উপজেলা  সবচেয়ে  বেশী  মনিপুরী  তাঁতিদের  বসবাস এবং এ এলাকায়  তাঁতে সংখ্যা ও অনেক বেশী এ ছাড়া  তিলকপুর আদমপুর,মাধবপুর  এলাকায় ও মনিপুরী  শাড়ি তৈরি  হয়।।

মনিপুরী কে বিভিন্ন ইনোভেশন ও ফিউশনের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। মনিপুরী শাড়ির পাশাপাশি তৈরী হচ্ছে গামছা, ওড়না, টু পিস, শাল ইত্যাদি। এছাড়াও ফিউশন করে তৈরি করা হচ্ছে মনিপুরী ব্যাগ, কটি যা শাড়ি কিংবা থ্রি পিসের সাথে মানানসই। আবার শাড়িতে ব্লক করেও দেওয়া হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

পাটের শাড়ি

দেশের লোকগীতির কবিতায় পাটের শাড়ির কথা উল্লেখ থাকলেও এই আধুনীকতার জোয়ারে কেন জানি নতুন করে শুনতে হচ্ছে পাটের শাড়ি । পাট কে রিফাইন করে পাটের সুতা তৈরি করে তবেই এই পাটের শাড়ি তৈরী হচ্ছে । যদিও টাঙ্গাইলের কিছু কিছু তাঁতে পাটের শাড়ি  তৈরী হয় যা আমদানিকৃত সুতি এবং জুট সুতার সমন্বয়ে পাটের শাড়ি তৈরী হয়।

তুলা থেকে সুতা তৈরির কাঁচামালে আমাদের দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় তাই বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু পাটের সুতার কাঁচামাল আমাদের দেশেই তৈরি হয়। তাই পোশাক তৈরিতে এই সুতার ব্যবহার আমাদের জন্য বেশ লাভজনক হবে যা আমাদের বিলুপ্তর পথে ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে নিতে হবে উদ্দ্যোগ ।

খাদি শাড়ি

বৃটিশ ভারতে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে ঐতিহাসিক কারণে কুমিল্লা জেলায় খাদি শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ ও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। রাঙ্গামাটির তূলা থেকে সেই সময়ে খাদি কাপড় তৈরী হতে শুরু করে। জেলার চান্দিনা, দেবিদ্বার, বুড়িচং ও সদর থানায় সে সময় বাস করতো প্রচুর যুগী বা দেবনাথ পরিবার। যারা খাদি কাপড় বুনতো তাদের বলা হতো যুগী বা দেবনাথ। দেশীয় বস্ত্রের ব্যবহার এবং বিদেশি বস্ত্র বর্জনে গান্ধীজীর আহ্বানে সে সময় কুমিল্লায় ব্যাপক সারা জাগে এবং খাদি বস্ত্র উৎপাদনও বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে কুমিল্লার খাদি বস্ত্র। জনপ্রিয়তা অর্জন করে কুমিল্লার খাদি। গান্ধীজী প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লার অভয় আশ্রম সেই সময়ে খাদি শিল্প প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

খাদি শাড়ি মূলত হাতে তৈরী সুতা দিয়ে বানানো হয় । তাই সুতা গুলো মোটা হয়ে থাকে । তাই খাদি শাড়ি গুলো পুরোটা খাদি সুতা দিয়ে বানানো হয় না । টানায় সাধারন কটন সুতা এবং ভরনায় খাদি সুতা ব্যবহার করা হয় । নকশার প্রয়জনে কম বেশি হতে পারে ।

কাতান

কাতান শাড়ীর উৎপত্তি হয় বেনারাস শহরে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ভারত থেকে ৩৭০ টি মুসলিম পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস শুরু করে। সেই থেকেই কাতান শাড়ীর দিন শুরু হয় বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের তাঁতীরা তাদের  নিজস্ব সৃজনশীলতা,নান্দনিক ডিজাইন মাধ্যমে উন্নত রুচির পরিচয় দিচ্ছে বহু বছর ধরে। বিয়ের অনুষ্ঠানে কাতান শাড়ীর জনপ্রীয়তা আছে, যে কোন জমকালো অনুষ্ঠানে কাতানই থাকে প্রথম পছন্দ। কাতান তৈরীর কাচামাল  সুতা, আসে ভারত,পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা আর চীন থেকে আর বাংলাদেশের বানানো শাড়ী রপ্তানি হয় ভারত, পাকিস্তান, চিন ও আমেরিকায়।

বেনারসি

মূলত ভারতবর্ষের বেনারস পল্লি থেকে শুরু হয়। ওখানকার কিছু কিছু মানুষ এই বেনারসি শাড়ি তৈরি করে খুবই নামকরণ করে নেয়।

বগুড়ার তাঁতিরা নিজেরা একেকটি শাড়ির ডিজাইন করে তারপর তা তাঁতে বোনা শুরু করে। কিন্তু তাঁতে বোনা শাড়ি গুলো পলিশ এবং ফিনিশিং করার জন্য শাড়ি গুলোকে মিরপুরে নিয়ে যেতে হয়। কারণ বগুড়ায় পলিস এবং ফিনিশিং করার মেশিন নেই।  তাই তাঁতে বোনা শাড়ি গুলো পলিস এবং ফিনিশিং ছাড়া মিরপুরের মহাজনদের নিকট পাইকারি বিক্রি  করে। সেই কারণে বগুড়ায় তৈরি হলেও শাড়ি গুলো মিরপুরের বেনারসি শাড়ি নামে সকলে জানে।

বেনারসি শাড়ির অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো- জড়ানে ফুল ও পাতাযুক্ত নকশা, কলকা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে সোনালী জরির কাজ, ঘন বুনন, পুংখানুপুঙ্খ নকশা, ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট, আঁচল এবং জটিল কাজ। এই শাড়ি কনের বিয়েতে সাজ সজ্জার অংশ বলে বিবেচিত।

বেনারসি শাড়ি নিয়ে আরও জানতে

বেনারসি আর কাতানের মধ্যে পার্থক্য

সুতার ধরন/ বুননের রীতি অনুযায়ী শাড়িগুলোর জমিন দু’ ধরনের হয়ে থাকেঃ

১)সার্টিন

২)কাতান

  • সার্টিন জমিনের শাড়িগুলোর জমিন মখমলের মত মোলায়েম হয়।যেমন: জামে বাহার শাড়ি। বুননে সুতা বেশি লাগে, শাড়িগুলো ওজনে একটু বেশি হয়। বিয়ের বেনারসিগুলো সবই সার্টিন ধরনের।
  • কাতান জমিনের থেকে সার্টিন জমিনের শাড়ি তৈরি করতে প্রায় দ্বিগুণ সুতা প্রয়োজন হয়। কাতান জমিন তৈরি করতে যদি ৩০ হাজার সুতা দরকার হয়, সাটিন জমিন তৈরিতে সুতা লাগবে ৬০ হাজার।
  • সাধারণত, সার্টিন জমিনের শাড়িতে অন্য কোন সুতা মিলিয়ে বুনন হয় না।
  •  কিন্তু, কাতান জমিন তৈরিতে অন্য সুতা মিলিয়ে জমিনে ভিন্নতা আনা হয়। যেমনঃ  তসর কাতান, রেশমি কাতান, মাস্লাইস কাতান ।
  • কাতান জমিনের শাড়িগুলো ওজনে হাল্কা, মোলায়েম / নরম হয়। প্রায় গায়ের সাথে মিশে থাকে। অন‍্যদিকে সার্টিন বুননের শাড়িগুলোর জমিন কাতান অপেক্ষা কিছুটা মোটা হয়।

জামদানি

জামদানি হচ্ছে আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য। যা মূগল আমল থেকেই তার ঐতিহ্য বহন করে আসছে। জামদানির নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মতবাদ রয়েছে। একটি মত অনুসারে ‘জামদানি’ শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে এসেছে। ফার্সি জামা অর্থ কাপড় এবং দানা অর্থ বুটি, সে অর্থে জামদানি অর্থ বুটিদার কাপড়। একারণে মনে করা হয় মুসলমানেরাই ভারত উপমহাদেশে জামদানির প্রচলন ও বিস্তার করেন। আরেকটি মতে, ফারসিতে জাম অর্থ এক ধরনের উৎকৃষ্ট মদ এবং দানি অর্থ পেয়ালা। জাম পরিবেশনকারী ইরানি সাকীর পরনের মসলিন থেকে জামদানি নামের উৎপত্তি ঘটেছে।


জামদানি শাড়ি কেনার আগে তিন টি বিষয় গুরুত্ব দিতে হয়ে – শাড়ির দাম, সূতার মান এবং কাজের সূক্ষতা। জামদানি হল কার্পাস তুলা দিয়ে প্রস্তুত একধরনের পরিধেয় বস্ত্র যার বয়ন পদ্ধতি অনন্য। আসলে জামদানি শাড়ি তাঁতীরা হাতে বুনন করে বলেই অনেক কষ্ট সাধ্য ও সময় সাপেক্ষ। তাই এগুলোর দামও অন্যান্য শাড়ির তুলনায় বেশি হয় থাকে।

ঐতিহ্যবাহী নকশা ও বুননের কারনে ২০১৬ সালে জামদানি কে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পন্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো।

জামদানি নিয়ে আরও জানতে


সমৃদ্ধকরন

  • টাঙ্গাইল শাড়ি টাঙ্গাইল জেলায় তৈরী হয় এবং এই জেলার নামেই এর নামকরণ করা হয়েছে।
  • ১৯০৬ সালে মহাত্মা গান্ধী স্বদেশী আন্দোলনের ডাক দেন
  • খেশ শাড়ির মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, পুরাতন কাপড় ছাড়া এই শাড়ী তৈরি করা সম্ভব নয়।
  • পাবনা জেলায় বর্তমানে তিন রকমের তাঁত আছে। পাওয়ার লুম, পিটলুম, আর চিত্তরনজন 
  • মনিপুরী  ভাষায় তাঁত কে বলা হয় ইয়োং। এই ইয়োং আাবার দুই ধরনের  একটি মোয়াং ও অপরটি পাং।
  • মনিপুরী  শাড়ি র পারে মৈরাং বা টেম্পল  এর নকশা করা থাকে। 
  • যারা খাদি কাপড় বুনতো তাদের বলা হতো যুগী বা দেবনাথ
  • বেনারসি শাড়ীর উৎপত্তি হয় বেনারাস শহরে।
  • ঐতিহ্যবাহী নকশা ও বুননের কারনে ২০১৬ সালে জামদানি কে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পন্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো

-কন্ট্রিবিউটর | Partho Pratim Mazumder

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  

Leave a Reply