Hill tracts textile backstrap loom Ethnic Community কোমর তাঁত পার্বত্য অঞ্চলের গাঁথা ইতিহাস ও সংস্কৃতি x bfa x fxyz

কোমর তাঁত: পার্বত্য অঞ্চলের গাঁথা ইতিহাস ও সংস্কৃতি

তাঁতটি কোমরের সঙ্গে বাঁধা থাকে বলে একে বলা হয় ‘কোমর তাঁত’। পাহাড়ি নারীরা উবু হয়ে বসে, কোমরে চাপ দিয়ে, হাতে সুতো টেনে টেনে . . .

রঙে রঙে কথা বলে, সুতো বুনে গান,
কোমর তাঁতের নকশায়—আজ পাহাড়িদের অভিমান।


এই অভিমান নিছক ব্যক্তিগত নয়, বরং তা এক নীরব সামাজিক ভাষ্য—যেখানে যুগের পর যুগ ধরে পাহাড়ি নারীরা তাঁদের হাতের শিল্পকে বুনেছেন, অথচ সমতলের চোখে সেই শিল্প রয়ে গেছে কেবল ‘স্মারক’, ‘শোভা’র সামগ্রী।
আমরা হয়তো কোমর তাঁতের সুতোয় বোনা নকশা দেখে বলি, “কি চমৎকার!”, তারপর সেটি কিনতে গিয়ে দামের মুলামুলি করে হয়তো একটি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে কিনেও নেই। কিন্তু সেই কাপড়ের পেছনে যে সময়, শ্রম, সংস্কৃতি আর শেকড় গাঁথা থাকে—তা আমাদের গ্রহণযোগ্যতার পরিধিতে খুব কমই জায়গা পায়। অভিমানটা সেখানেই। অভিমান এই যে, একসময়ের গৃহস্থালি প্রয়োজন, সামাজিক পরিচয়ের প্রতীক আজ রয়ে গেছে নিজেদের ব্যাবহার কিংবা হাটের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ; যা একান্ত নিজেদের উঠানে বন্দি।

ঐতিহ্যের কিনারা করা হয়তো আমাদের সাধ্যের বাইরে, কিন্তু তাকে রক্ষা করার সাধ্য ও দায়—তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। পাহাড় হোক বা সমতল, আদিবাসী হোক বা মূলধারার বাঙালি—সবাই মিলেই গড়ে তুলেছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক বাংলাদেশ। কিন্তু ব্যস্ততার অজুহাতে বহু মূল্যবান ঐতিহ্য আজও থেকে যাচ্ছে চোখের আড়ালে। আজ তবে ব্যস্ততাকে খানিকটা সরিয়ে রেখে জানি এমন একটি ঐতিহ্যকে, যেটি যুগের সাক্ষী হয়েও রয়ে গেছে পাহাড়ি উঠানে—কোমর তাঁত।

আজকের দিনে বাংলাদেশের মোট তাঁত উৎপাদনে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ কাজ করছেন, যার মধ্যে ৬৩% কাপড়ই আসছে হস্তচালিত তাঁতের মাধ্যমে। এর একটি বড় অংশ জুড়ে আছে এই পাহাড়ি কোমর তাঁত। তথাপি, দুঃখের বিষয় হলো, এ শিল্প আজও বাড়ির উঠানে বন্দি। না আছে স্থানীয় পর্যায়ে বিপণনের যথাযথ ব্যবস্থা, না আছে প্রশিক্ষণ ও ডিজাইন উন্নয়নের সমন্বয়। সাপ্তাহিক হাট বা স্থানীয় পর্যটন মার্কেট ছাড়া তেমনভাবে এদের পণ্য বাজারজাত হচ্ছে না। পর্যটকরা এসব অঞ্চলে বেড়াতে গিয়ে এই তাঁতপণ্য কিনে নিচ্ছেন স্মৃতি হিসেবে।

backstrap loom

কোমর তাঁত বা উঠান তাঁত

তাঁতটি কোমরের সঙ্গে বাঁধা থাকে বলে একে বলা হয় ‘কোমর তাঁত’। পাহাড়ি নারীরা উবু হয়ে বসে, কোমরে চাপ দিয়ে, হাতে সুতো টেনে টেনে বুনে চলেন জীবন ও ঐতিহ্যের গল্প।

Hill tracts textile backstrap loom Ethnic Community কোমর তাঁত-photo_noor
Photo source: Noor A Alam/ The Business Standard

কোমর তাঁত:
পাহাড়ি বুননের লয়, আত্মপরিচয়ের অংশ

পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন বাংলাদেশের রঙিন প্রাণভূমি। এখানে আছে ঝর্ণার জলের ছন্দ, পাহাড়ের ঢেউয়ে ভেসে আসা নৈঃশব্দ্য, সূর্যাস্তের লালচে আভা আর আছে আত্মনির্ভর এক শিল্প—কোমর তাঁত। এ শিল্প শুধু কাপড় তৈরির উপায় নয়, বরং পাহাড়ি নারীদের আত্মপরিচয়ের এক অভিব্যক্তি। বাংলাদেশের একমাত্র পার্বত্য অঞ্চল এই চট্টগ্রামে ১১টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বসবাস—চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খেয়াং, লুসাই, মুরুং, খুমি, পাংখোয়া এবং চাক। তাদের প্রায় প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নারীরা কোনও না কোনওভাবে কোমর তাঁতের সঙ্গে যুক্ত। বলা হয় প্রায় ৯০ শতাংশ নারীরা কোমরতাঁত বোনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই তাঁত তাদের জীবনের সঙ্গে যেমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে, তেমনি তা হয়ে উঠেছে পাহাড়ের সংস্কৃতি, গৃহস্থালি ও আর্থিক স্বনির্ভরতার ভিত্তি।

এক সময় পাহাড়ি সমাজে নারীদের বিয়ের আগে তাঁতের কাজ জানা বাধ্যতামূলক ছিল। মেয়েরা মা ও বোনদের কাছ থেকে শিখে নিত কোমর তাঁতের পদ্ধতি। এখন সে বাধ্যবাধকতা না থাকলেও ঐতিহ্যের টানে আজও অনেক মেয়ে ছোটবেলা থেকেই এই বুননের সঙ্গে পরিচিত হয়। যদিও আজকের প্রজন্মের অনেকেই এই পেশা বেছে নেয় না, তবুও অনেক নারী এখনও গৃহস্থালির পাশাপাশি তাঁতের কাজ করে সংসার চালান।

বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি কোমর তাঁত যন্ত্রটির নাম এসেছে তার ব্যবহারের ধরন থেকে। এ যন্ত্র কোমরে বেঁধে উবু হয়ে বসে নারীরা বুননের কাজ করেন, যেন তাঁতের প্রতিটি সুতোয় তাঁরা বুনে চলেছেন নিজেদের ইতিহাস, আবেগ, আর আত্মপরিচয়। পাহাড়ি বাড়ির উঠানে কিংবা বারান্দায় বসেই চলে এই বুননের কাজ, যেটা দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি এর ভেতর রয়েছে সময়, ধৈর্য আর পরিশ্রমের এক বিশাল গল্প।

প্রাচীনকালে তারা নিজেরাই তুলা উৎপাদন করতেন। শিমুল গাছের তুলা থেকে চরকার মাধ্যমে সুতা তৈরি হতো, তারপর সেই সুতো রঙ করে তৈরি হতো পিনন ও থামি। বর্তমানে যদিও স্থানীয় তুলা উৎপাদন কমে এসেছে, তবু তাঁতিরা আধুনিক মেশিনে না গিয়ে প্রাচীন কাঠামোকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।

এই অঞ্চলে শত শত বছর ধরে কোমর তাঁতের মাধ্যমে তৈরি হয়ে আসছে পিনন ( কোমর থেকে স্কাট এর মত ), খাদি (ওপরের চাদর বা ব্লাউজ), গামছা, লুঙ্গি, চাদর, ওড়না, টুপি, রুমাল, এমনকি বিছানার চাদর, ব্যাগ, গৃহসজ্জার সামগ্রীও। এক সময় এই তাঁতের পণ্য শুধুই নিজেদের ব্যবহারেই সীমিত ছিল। নারীরা ঘরের কাজ আর জুম চাষের ফাঁকে নিজের পোশাক নিজেরাই তৈরি করতেন। পুরুষরা পরত ধুতি, গামছা আর শার্ট; আর নারীরা পরতেন পিনন, থামি, ব্লাউজ। সময় বদলেছে, পোশাকেও এসেছে পরিবর্তন—পুরুষরা এখন প্যান্ট-শার্ট পরে, তবে নারীরা আজও বিশেষ দিনগুলোতে ঐতিহ্যবাহী তাঁতের পোশাকেই নিজেদের তুলে ধরেন।

এ যেন শুধুই শিল্প নয়, এটি আত্মপরিচয়ের এক সংগ্রাম। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, রাঙামাটির রাজস্থলী, বান্দরবানের থানচি কিংবা রুমা—সব জায়গাতেই দেখা মেলে কোমর তাঁতে বস্ত্র বুননরত নারীদের। মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা কিংবা খুমি নারীরা এই কাজের পেছনে যে নিষ্ঠা দেখান, তা নিছক অর্থনৈতিক চাহিদা নয়—তাতে জড়িয়ে থাকে সংস্কার, ঐতিহ্য আর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।



দীঘিনালার ত্রিপুরা-চাকমা নারীরা যেমন পারদর্শী এই শিল্পে, তেমনি বান্দরবানের সুয়ালক ইউনিয়নের গেৎশিমানি পাড়া, বেতনী পাড়া, রুমা উপজেলার মুনলাই, আর্তা, তিনদৌলতি পাড়াসহ বহু পাহাড়ি গ্রামে এখনও নারীরা নিজের ঘরের উঠানে তাঁত পেতে কাপড় বুনে চলেছেন। প্রতিটি থামি বুনতে সময় লাগে ৪–৭ দিন। একজন নারী প্রতি মাসে ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। কাপড় তৈরির খরচ যেখানে তিনশো থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে, সেখানে এসব পিনন বা থামি বিক্রি হয় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায়। অর্থাৎ এ শিল্পে রয়ে গেছে আত্মমর্যাদা, কল্পনা, আর্থিক স্বাধীনতা—সবই।


উঠান থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে—
সম্ভাবনার পথ খোঁজা


আজও এই তাঁত বেঁচে আছে শুধু পাহাড়ি নারীদের ব্যক্তিগত চেষ্টায়—কোনো বাণিজ্যিক কোম্পানি নয়, কোনো বড় লগ্নি নয়, শুধু নীরব অধ্যবসায় আর সাংস্কৃতিক ভালোবাসা এই শিল্পটিকে টিকিয়ে রেখেছে। কোমর তাঁতে তৈরি পোশাকগুলো পাহাড়ি নারীরা স্থানীয়ভাবে সাপ্তাহিক হাটে বা গ্রামীণ পরিসরে সীমিত পরিসরে বিক্রি করে থাকেন। কিন্তু এই শিল্পের জন্য নেই কোনো নির্দিষ্ট বিপণন কেন্দ্র, নেই বড় কোনো বাজারজাতকরণের সুযোগ। ফলে সীমিত ক্রেতার মধ্যে আটকে যায় তাদের শ্রম ও সৃজনশীলতার মূল্য।

এই শিল্পের উন্নয়নে সরকার বা বেসরকারি পর্যায়ে যদি উপজেলা পর্যায়ে বিপণন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়, তাহলে পাহাড়ি নারীদের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যাবে। তারা স্বাবলম্বী হতে পারবেন শুধুমাত্র পোশাক বিক্রির মাধ্যমে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক চক্রের অংশ হয়ে।

তবে আশার কথা হলো, তাঁদের বোনা কাপড় আজ মিয়ানমার ও ভারতেও রপ্তানি হচ্ছে। বান্দরবানের শৈলপ্রপাত, চিম্বুক, নীলাচলের মতো পর্যটন স্পটগুলোতে নারীরা নিজেরাই তৈরি করেছেন অস্থায়ী বাজার। স্থানীয় পর্যটন মার্কেটেও বিক্রি হচ্ছে এই হস্তবয়নশিল্পের ঐতিহ্য।

তবে এখানেই থেমে গেলে চলবে না। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর উচিত ডিজাইনিং, ব্র্যান্ডিং, প্রশিক্ষণ এবং অনলাইন বিপণনের সুযোগ সৃষ্টি করা। পরিকল্পিত উদ্যোগ থাকলে এই শিল্প কেবল রক্ষা পাবে না—বরং নতুন প্রাণ পাবে। কোমর তাঁতের শিল্প শুধু কাপড় বোনে না, এটি বোনে জীবনের ছন্দ, বংশপরম্পরার নিঃশব্দ ধারাবাহিকতা।
এই শিল্প যেন হারিয়ে না যায় কেবল কোনো নিঃসঙ্গ উঠানে—বরং তা ছড়িয়ে পড়ুক নগরের ফ্যাশন র‍্যাম্পে, আন্তর্জাতিক হস্তশিল্প প্রদর্শনীতে। এটাই হোক আমাদের সক্রিয় অঙ্গীকার।

Wardrobe Sozpodor by Tenzing Chakma

আধুনিক ফ্যাশনে কোমর তাঁতের ব্যবহার: তেনজিং চাকমার উদ্যোগ

চাকমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁতের কাপড় শুধু নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—বর্তমানে তা শহরের ফ্যাশন জগতেও জায়গা করে নিচ্ছে। এর অন্যতম প্রমাণ হলেন তরুণ ফ্যাশন ডিজাইনার তেনজিং চাকমা

তিনি মূলত চাকমা নারীদের পরিধেয় দুইটি ঐতিহ্যবাহী পোশাক—পিননহাদি—নিয়ে কাজ করেন। এই পোশাকগুলো কোমর তাঁতে বোনা হয় এবং এতে থাকে নিজস্ব বর্ণ ও নকশার পরিচয়। তেনজিং এই ঐতিহ্যবাহী কাপড়কে আধুনিক পোশাকে রূপ দিয়েছেন, যেমন—জাম্পস্যুট, কোট, ড্রেস ইত্যাদি।

তিনি শুধু শহরের তরুণদের কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করেননি, বরং ফ্যাশন শোতেও অংশগ্রহণ করেছেন। Fashion Design Council of Bangladesh (FDCB) আয়োজিত খাদী উৎসব-এ তিনি তাঁর সংগ্রহ উপস্থাপন করেন। ঐতিহ্যবাহী কাপড়কে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরার এই প্রচেষ্টা অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে।

তেনজিং চাকমার কাজ প্রমাণ করে, পার্বত্য অঞ্চলের তাঁতশিল্প শুধু অতীতের অংশ নয়—এটি বর্তমানেও নতুন করে ব্যবহার ও চিন্তার জায়গা তৈরি করছে।


তেনজিং চাকমার লেবেল এর ফেসবুক লিংক নিচে দেয়া হলো।

Sozpodor by Tenzing Chakma


আপনার একটি শেয়ার এবং মন্তব্য আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা ❤️



তথ্যসূত্র: পার্বত্য নিউজ, The Daily Star, The Business Standard


September 6, 2025
jute industry-jute handicraft of Bangladesh-পাটশিল্পের পুনর্জাগরণ-পাট কারুশিল্প- x bfa x fxyz

পাটশিল্পের পুনর্জাগরণ: গ্রামীণ কারুশিল্প থেকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং

fayze hassan
পাটশিল্প এখন শুধু অতীতের ঐতিহ্য নয়; বরং ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির নতুন ক্যানভাস—যেখানে ঐতিহ্য, উদ্ভাবন আর টেকসই…
September 6, 2025
August 31, 2025
Jute industry of Bangladesh বাংলাদেশের পাটশিল্প x bfa x fxyz V2

বাংলাদেশের পাটশিল্প: ঐতিহ্য, বর্তমান অবস্থা ও সোনালি আঁশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

bdfashion archive
‘সোনালি আঁশের সোনার দেশ/পাট পণ্যের বাংলাদেশ’ -এ স্লোগানে ২০১৭ সালে দেশে প্রথমবারের মতো পালিত হয়…
August 31, 2025

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial

Warning: Undefined array key "sfsi_threadsIcon_order" in /home/bdfashio/public_html/wp-content/plugins/ultimate-social-media-icons/libs/controllers/sfsi_frontpopUp.php on line 165

Warning: Undefined array key "sfsi_blueskyIcon_order" in /home/bdfashio/public_html/wp-content/plugins/ultimate-social-media-icons/libs/controllers/sfsi_frontpopUp.php on line 170
error

Your share and comment are an inspiration to us