borshakal ১লা আষাঢ় বর্ষাকাল x bfa x fxyz

আষাঢ়ের প্রথম দিনে বর্ষার বন্দনা

বর্ষা শুধু কাব্যের বিষয় নয়, জীবনেরও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্ষা—বাংলা ঋতুচক্রের এক অনন্য অধ্যায়।

পহেলা আষাঢ়

বৃষ্টি, কাব্য, আর জীবনের মেঘলা দিন

বর্ষা—বাংলা ঋতুচক্রের এক অনন্য অধ্যায়। আষাঢ়ের প্রথম দিনে মনের মাটিতে যেন বৃষ্টি পড়ে। দীর্ঘ দাবদাহের শেষে প্রকৃতি ঝরঝরে হয়ে ওঠে, প্রাণ ফিরে পায় সবুজের রঙে। এই ঋতুকে নিয়ে কবিরা কাব্য রচনা করেছেন, সুর তুলেছেন সানাইতে, আর আমরা বুনেছি জীবনের গল্প।

কদম ফুল বর্ষার দূত x bfa x fxyz at SC Dhaka universitty (16)

আজ, পহেলা আষাঢ়

আষাঢ় এলো। বাংলার হৃদয়ে সেই চিরন্তন ঋতু, যে ঋতু কবিদের কলমে অমর হয়েছে, প্রকৃতির ক্যানভাসে রঙ ছড়িয়েছে। দীর্ঘ দাবদাহে পুড়ে যাওয়া ধরিত্রী যেন এক নিশ্বাসে জেগে ওঠে বর্ষার প্রথম ফোঁটায়। আজ, পহেলা আষাঢ়, বাংলা পঞ্জিকার হিসেবে বর্ষার প্রথম দিন। কিন্তু প্রকৃতি তো ক্যালেন্ডার মানে না। গেল কয়েক দিন ধরেই মেঘের গর্জন, বৃষ্টির ঝিরিঝিরি আওয়াজ আর কদম ফুলের মৌতাত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। গ্রামবাংলার ক্ষেত-খামার, সবখানেই বর্ষার আগমনী বার্তা।

বাংলার ছয় ঋতুর মধ্যে বর্ষা যেন এক অনন্য কাব্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায়, “ঋতুর মধ্যে বর্ষাই কেবল একা একমাত্র। তার জুড়ি নাই।” কাজী নজরুল ইসলামের গানে বর্ষার মেঘমালা যেন প্রেমিকের বিরহবাণী বহন করে। এই ঋতু শুধু প্রকৃতির নয়, মানুষের মনেরও ঋতু। বৃষ্টির ফোঁটায় হারানো শৈশবের স্মৃতি জেগে ওঠে, মেঘের গর্জনে ময়ূরের পেখম মেলার দৃশ্য মনে পড়ে।

আষাঢ় মানেই কদম ফুলের গন্ধ, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, আর নদী-খালে শাপলার হাসি। গ্রামের মাঠে ধানের সবুজে রৌদ্র-হাওয়ার লুকোচুরি, নৌকাবাইচের হৈচৈ, আর খিচুড়ি-ইলিশের সুবাস। কিন্তু এই রোমান্টিক চিত্রের পাশাপাশি বর্ষার আরেক মুখও আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলার ষড়ঋতু যেন তিন ঋতুতে সংকুচিত হয়ে পড়ছে—দীর্ঘ গ্রীষ্ম, সংক্ষিপ্ত বর্ষা, আর আরও সংক্ষিপ্ত শীত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ তাপপ্রবাহের কারণে এবার অনেক কদমগাছ ফুলশূন্য। শহরের ট্রাফিক সিগন্যালে বৃষ্টিভেজা কদম ফুলের গুচ্ছ হাতে পথশিশুদের ছোটাছুটিও যেন কমে গেছে। তবু, গ্রামবাংলার পথে-প্রান্তরে, জলাশয়ের ধারে শাপলা আর হিজল ফুলের উৎসব চলছে। বর্ষার পানিতে মাছের ঝাঁক নতুন প্রাণ পাচ্ছে, আর প্রকৃতির শ্যামল রূপ যেন এক অপরূপ ক্যানভাস।

বর্ষায় রাজবাড়ির গড়াই নদীতে মাছ ধরার দৃশ্য, ছবিগুলো হাই রেজুলেশন ছবি পেতে যোগাযোগ করুন


আপনার একটি শেয়ার এবং মন্তব্য আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা ❤️


বর্ষায় প্রানবন্ত বরিশালের পদ্ম পুকুর

বরিশাল নগরীর গর্ব পদ্মপুকুর, যার রয়েছে ১১৫ বছরের গৌরবময় ইতিহাস। জানা যায়, বৃটিশ সাহেবরা পুকুরটিতে পদ্ম ফুলের চাষ করেন। ১৯৬৫ সালে বরিশাল মেরিন ওয়ার্কশপের তৎকালীন ম্যানেজার জার্মানির বাসিন্দা মি. ইলিগনর অন্যত্র থেকে শ্বেতপদ্মের মূল সংগ্রহ করে বিআইডব্লিউটিএ-এর হীম নীড় সংলগ্ন পুকুরে রোপণ করেন। সময়ের পরিক্রমায় পদ্মের শ্বেতশোভা ছড়িয়ে পড়ে পুরো ৬৯ শতাংশ আয়তনের পুকুর জুড়ে।
দেশের অন্য কোনো শহরে এভাবে পুকুর ভরা পদ্মের অপার্থিব দৃশ্য পাওয়া যায় না। বরিশালের পদ্মপুকুর তাই শুধু একটি জলাধার নয়; এটি নগরীর ঐতিহ্যের প্রতীক এবং গৌরবের উপমা।
এই পুকুরের পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক ‘চান বাংলো’ বা ‘চাড়ার বাংলো’। লোহার খুঁটির ওপর কাঠের পাটাতন ও টালির ছাদের ঘরটি কোম্পানির ব্রিটিশ কর্তাদের পরিদর্শন বাংলো হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বাংলো সংলগ্ন পুকুরটি সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে আছে যুগ যুগ ধরে।
পদ্মপুকুরে ফুটে থাকা হাজারো শ্বেতপদ্ম যেন প্রকৃতির এক শিল্পকর্ম। এটি কোনো দীঘি, বিল বা হাওর নয়; বরং একটি পুকুর যেখানে ফুল ও পাতার সমারোহ শুভ্রতার এক অপরূপ চিত্র আঁকে। এই জলজ ফুলের রানীর সমারোহে পদ্মপুকুর শুধুই একটি স্থান নয়; এটি বরিশালের এক নিখুঁত সৌন্দর্যের আধার।

বর্ষা ও সাহিত্য: রবীন্দ্র-নজরুলের মুগ্ধতা

বাংলা সাহিত্যে বর্ষার রূপ অপ্রতিম। রবীন্দ্রনাথের গানে বর্ষা যেন প্রকৃতির রাজকন্যা। তাঁর ‘আজি ঝরঝর মুখর বাদলদিনে’ কিংবা ‘এসেছি ভুলে দুখের মুখর রাতে’ বর্ষার সৌন্দর্য আর মানবমনের মিলনের গল্প বলে। এক হিসেবে দেখা গেছে, রবীন্দ্রনাথের বর্ষা নিয়ে লেখা গানের সংখ্যা অন্য সব ঋতুর তুলনায় বেশি। নজরুলের ‘যাও মেঘদূত দিও প্রিয়ার হাতে’ কিংবা ‘রিমঝিম রিমঝিম ঝরে বরষার জল’ বর্ষার সুরে প্রেম আর বিরহের মেলবন্ধন ঘটায়।

কবিরা বর্ষার বৃষ্টিতে শুনেছেন নূপুরের ধ্বনি, মেঘের গর্জনে শুনেছেন মৃদঙ্গের বোল। আকাশের ছাইরঙা মেঘ থেকে রংধনুর উঁকি—বর্ষার এই বৈচিত্র্য কবিদের কল্পনাকে মুক্তি দিয়েছে।

বর্ষা শুধু কাব্যের বিষয় নয়, জীবনেরও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রামে বর্ষা মানে অলস সময়, গল্প-আড্ডা, আর নৌকাবাইচের উৎসব। কিন্তু শহরে বর্ষা এনে দেয় জলাবদ্ধতা, যানজট, আর ছেঁড়া ছাতার দুশ্চিন্তা। ডেঙ্গুর প্রকোপ এখন বর্ষার গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা বছরের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বজ্রপাতের ঘটনাও বেড়েছে, যা প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠছে।
তবু, বর্ষার মাটির সোঁদা গন্ধে মন ভরে ওঠে। বৃষ্টির শব্দে হারানো শৈশবের স্মৃতি ফিরে আসে। শহরের উঁচু ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ছাট দেখতে দেখতে কত গল্প মনে পড়ে। গ্রামের পথে কদম ফুলের গুচ্ছ হাতে ছুটে বেড়ানো, কিংবা নদীর ধারে শাপলার হাসি—এসবই বর্ষার জাদু।

বর্ষা শুধু মানুষের মনেই নয়, প্রকৃতির সব প্রাণীর ওপর প্রভাব ফেলে। মেঘের গর্জনে ময়ূর পেখম মেলে, আর বর্ষার পানিতে মাছের ঝাঁক নতুন জীবন পায়। অনেক প্রাণীর মিলনঋতু এই বর্ষা। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, বর্ষা ‘ছুটির ঋতু’। কৃষকের ধানকাটা শেষ হলে বর্ষার অলস সময়ে গ্রাম জুড়ে জমে ওঠে গল্প-আড্ডা। তবে আধুনিক জীবনে এই ছুটির আমেজ কিছুটা হারিয়ে গেছে। নগরের ব্যস্ততায় বর্ষা যেন একটু বিরক্তির কারণও।


আজ পহেলা আষাঢ়ে, বর্ষার প্রথম দিনে, প্রার্থনা একটাই—কদম ফুলের সুবাসে, শাপলার হাসিতে, আর বৃষ্টির ছন্দে বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের মন নতুন প্রাণ পাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial