কোদলা মঠ kodla moth

A matha is a Sanskrit word and it also refers to a monastery in Hinduism.

বঙ্গীয় আভিজাত্যের প্রতীক: কোদলা মঠ

‘মঠ’ বলতে  এমন একটি অবকাঠামোকে বুঝায় যেখানে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ ধর্মীয় কারণে অবস্থান করেন এবং ধর্মীয় গুরুগণ উপদেশ ও  শিক্ষা প্রদান করেন। কিন্তু বেশীরভাগ মঠ ই সমাধি সৌধ।

ভৈরব নদী বিধৌত অঞ্চল জেলা বাগেরহাট যেন প্রত্নতত্ত্ব সম্পদে ঠাসা দেশের এক প্রাচীন জনপদ। পুরাতত্ত্ব-নৃতত্ত্ব বা মৃৎবিজ্ঞান বিষয়ে আমার জ্ঞানের পরিধি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। তবুও স্বল্প পরিসরে নিজের আয়ত্ত্ব বা সাধ্যের মধ্যে থেকে ঘুরছি, দেখছি আর জানতে পারছি নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির শিকড় সম্পর্কে। তারই ধারাবাহিকতায় এবার লিখতে বসলাম অযোধ্যা গ্রামের ‘ কোদলা মঠ ‘ নিয়ে।

ষাট গম্বুজ থেকে যাত্রাপুর হয়ে অযোধ্যা নামক যে জায়গাটি আছে, সেখানে পৌঁছাতে গেলে মোটামুটি ১০-১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। এক্ষেত্রে আমাদের ভাড়া করা অটো ভ্যানে চড়ে বাগেরহাট অঞ্চলের  চিরাচরিত গ্রামবাংলার রূপসৌন্দর্য্য, ছোট খাল বা নদীর ধার ঘেঁষে চলার সময় সুন্দরবনের শ্বাপদ অনুভূতি  জানান দিয়েছিল এ যেন বাংলার একটি বিশেষ বৈচিত্রের ভূখন্ড বা জনপদ।

মঠ | MATH / MUTTH

is a Sanskrit word that means ‘institute or college’, and it also refers to a monastery in Hinduism

যাহোক, গুগল ঘেঁটে কোদলা মঠ সম্পর্কে বেশ কিছুদিন আগে কিছু তথ্য উপাত্ত পেয়েছিলাম, আজ তার স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়ে গেলো। হিন্দু স্থাপত্যশৈলীর নান্দনিকতায় ভরপুর এই মঠ আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন,  যা ইতিহাস না অবকাঠামোর বিচারে দেশের সবচেয়ে সুন্দর ও বৃহত্তম মঠ। ‘মঠ’ বলতে  এমন একটি অবকাঠামোকে বুঝায় যেখানে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ ধর্মীয় কারণে অবস্থান করেন এবং ধর্মীয় গুরুগণ উপদেশ ও  শিক্ষা প্রদান করেন। কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি, বেশীরভাগ মঠ ই সমাধি সৌধ। কোদলা মঠ ও এর ব্যতিক্রম নয়। বলা হয়, কোদলা/ অযোধ্যা মন্দির কোনো দেব মন্দির নয়; সম্ভবত মৃত মহাত্মার সমাধি সৌধ বা স্তম্ভ। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগও তাই বলে।

‘মঠ’ বলতে  এমন একটি অবকাঠামোকে বুঝায় যেখানে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ ধর্মীয় কারণে অবস্থান করেন এবং ধর্মীয় গুরুগণ উপদেশ ও  শিক্ষা প্রদান করেন। কিন্তু বেশীরভাগ মঠ ই সমাধি সৌধ।

আগে জানতাম না, এই মঠ সম্পর্কে আইডিয়া নিতে গিয়ে জানলাম, স্থাপত্যশৈলীর তিনটি ধরনের একটি হলো  ‘নাগারা স্টাইল’, যাতে নির্মিত এই মন্দির গুলোতে বিশাল পাথরের প্ল্যাটফর্ম থাকে যেখানে অনেক সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। এই স্টাইলে একটি মাত্র চূড়া বা শিখর থাকে যা পিরামিড আকৃতির। নীচে থাকে গম্বুজ, এর নীচে স্তম্ভ এবং তার গভীরে গর্ভগৃহ। এর নীচে মন্ডপ ও করিডর।

ত্রিকোণাকৃতি পেডিমেন্ট ( ঝুলছাদ), ব্র‍্যাকেট (বাতিদান) ও আয়তাকার স্তম্ভ থাকে। বিগ্রহ স্থাপনের জন্য কুলুঙ্গি ও সেখানে থাকে। সাধারণত স্কয়ার ভূমিকে কেন্দ্র করে টেম্পল নির্মাণ করা হয়। এখানে কোনো নির্দিষ্ট সীমানাপ্রচীর থাকেনা। উঁচু স্তম্ভের নীচেই থাকে গর্ভগৃহের অবস্থান। অযোধ্যা মঠটি পুরোপুরি এই যোগসাযশেই স্থাপিত।

কোদলা মঠ | KODLA MATH

প্রবেশ পথেই  চোখে পড়লো বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, খুলনা ডিভিশনের আওতাধীন অবস্থায় এর তথ্য ও ইতিহাস সম্বলিত একটি স্বাক্ষরবোর্ড, যেখানে উল্লেখ আছে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য নাকি তার সভাসদ গৃহের পন্ডিত অবিলম্বা স্বরসতীর স্মৃতি রক্ষার্থে ইহা তৈরি করেন। মঠের ভেতরে প্রাপ্ত খোদাই করা লেখা পাওয়া যায়:” শর্মণা উদ্দিশ্য তারকং ( ব্রহ্ম) [প্রশা] দোহাং বিনির্মিত।” সংক্ষিপ্ত এই লিপিটির সঠিক পাঠোদ্ধার না করা গেলেও অনুমান করা হয় যে, জনৈক ব্রাহ্মণ কার্তিকের অনুগ্রহ লাভের জন্য কোনো এক শর্মণা ( ব্রাহ্মণ) এই মঠ নির্মাণ করেছিলেন। এ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে মতানৈক্যও নাকি আছে।

কোদলা / অযোধ্যা মঠ এর উচ্চতা প্রায় ১৮.২৯ মিটার যা লাল রঙের চিকন ইটের তৈরি। তিনটি প্রবেশ পথের খিলানগুলো নকশা কাটা। মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো। দক্ষিণ দিকের প্রবেশ পথের মুখেই সেই খন্ডলিপিটি পাওয়া গিয়েছিল। উত্তর দিকের প্রবেশপথের ভেতরে পোড়ামাটির সূক্ষ্ণ ফুল লতাপাতার ডিজাইন আছে। মঠের চারপাশে চমৎকার কারুকাজ করা। দেয়ালগুলো বহুভূজ এবং অনেকগুলো কুলুঙ্গি রয়েছে। মঠের ভেতরের দেয়াল লক্ষ্য করলে বুঝা যায়, ক্রমান্বয়ে চক্রাকার বলয় তৈরি করে উপরের দিকে  উঠে গেছে।

ইতিহাস ও  স্বাতন্ত্র্য গাঠনিক কৌশলের রোজনামচা ঘাঁটতে গেলে আমার লিখা কখনোই শেষ হবে না, কারণ আমি জানি ‘History Repeats Itself.’, হা হা…! ঘুরে ফিরে সেই কথারই পুনরাবৃত্তি হবে। এবার না হয় একে দেখে আমার অনুভূতির কথাই শেয়ার করি! শুরু বিকেলের কনে দেখা আলোয় বিস্মিত আমি দেখেছিলাম কোদলা / অযোধ্যা মঠ। খোলা একটা মাঠের ঠিক মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু আগাছা গা ফুঁড়ে বের হলেও তার আভিজাত্যে মোটেও চিড় ধরেনি। যে কোনো মঠের আকার খুব কৌতুহল উদ্দীপক। মনে হচ্ছিল, লম্বা একটা আকৃতি যেনো আকাশ ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘাড়টাকে সমকোণে রেখে উঁ….চিয়ে হা… করে দেখা লাগলো তাকে।

পরিশেষে একথা বলতেই হয়, পুরাকীর্তিটি সংরক্ষণের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আগাছা জন্মানো, উন্মুক্ত অবস্থায় থাকায় গবাদিপশুর চারণভূমি হয়ে যাওয়ায় এই মঠটি অনেকটা ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যাচ্ছে। আজ আমাদের নিজেদের প্রাপ্ত আধুনিক সভ্যতা ও যুগান্তরের পরিক্রমার ‘শেকড়’ কিন্তু এই ধ্বংসাবশেষ গুলোই। এর যথোচিত যত্ন ও সংরক্ষণের দায়িত্ব আমার, আপনার সবার।

ধন্যবাদ,
১৩ বৈশাখ ১৪৩০,
২৬ এপ্রিল, ২০২৩।
বাগেরহাট হতে, ফজলে ওয়াহিদ রাব্বি।


আরও পড়ুন

TAJHAT RAJBARI RANGPUR তাজহাট জমিদার বাড়ি x bfa x fxyz

তাজহাট জমিদার বাড়ি

জমিদার বাড়িটি দেখতে অনেকটা ঢাকার আহসান মঞ্জিল এর মত। 

Read More..

pabna jora bangla mandir পাবনার জোড়বাংলা মন্দির x bfa x fxyz

পাবনার জোড়বাংলা মন্দির—এক ঐতিহাসিক স্থাপনা

বাংলার জোড়বাংলা মন্দির বলতেই মনে আসে— দিনাজপুরের কান্তনগর/কান্তজীউ মন্দির, পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর জোড়বাংলা মন্দির। পাবনার এই মন্দির সেই ঐতিহ্যের অংশ।

The Sura Mosque সুরা মসজিদ x bfa x rajon

মুঘল স্থাপত্যের মায়াবি ছোঁয়া: সুরা মসজিদ

জনশ্রুতি বলে, জিনেরা এক রাতে এটি গড়েছিল! সত্যি না কল্পনা?

পুরান ঢাকার তারা মসজিদ Tara Masjid x bfa x rajon - Copy

তারা মসজিদ: পুরান ঢাকার ঝলমলে তারার ঐতিহ্য

তারা মসজিদStar Mosque পুরান ঢাকার আরমানিটোলার আবুল খয়রাত সড়কে দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য—তারা মসজিদ। সাদা মার্বেলের গম্বুজে নীল তারায়…

কাপ্তাই লেক: বাংলাদেশের প্রকৃতির এক অপরূপ নিদর্শন

কাপ্তাই লেকKaptai Lake প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে মোড়ানো রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই লেক এমন একটি স্থান, যেখানে গেলে মনে হয় যেন সবকিছু…

BFA

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial