Mrinal Haque was a Bangladeshi sculptor ভাস্কর মৃণাল হক x bfa x fxyz

ভাস্কর মৃণাল হক । রাজপথের শিল্পী

মৃণাল হকের জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ সালে রাজশাহীতে। ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইন্সটিটিউট ভর্তি হন। ১৯৮৪ সালে তিনি মাস্টার্র সম্পন্ন করেন।

মৃণাল হকের গল্প

ঢাকার রাস্তায় কখনো কি হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছেন? হয়তো গাড়ির জানালার পাশ দিয়ে হেঁটে গেছে এক রাজকীয় ঘোড়ার গাড়ি—পাথরে বাঁধা, অথচ জীবন্ত। অথবা চোখে পড়েছে বাংলা বর্ণমালার বুকফাটা আহ্বান, যেখানে জননী কোলে তুলে রেখেছে তার শহীদ সন্তানকে। তখনও আপনি হয়তো জানতেন না, এই মূর্তিগুলোর পেছনে আছেন একজনই—মৃণাল হক

রাজসিক বিহার (Rajosik Bihar) মৃণাল হকের ভাস্কর্য x bfa x fxyz (2)

মৃণাল হকের গল্প শুরু হয়েছিল রাজশাহীতে। ১৯৫৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছোট থেকেই কাদামাটি নিয়ে খেলা করতে ভালোবাসতেন। কেউ কেউ খেলতো মার্বেল, কিংবা ডাংগুটি, আর মৃণাল গড়তেন হাতের ছাঁচে মানুষ, ঘোড়া, পাখি।

রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ ও কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষালাভের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পা রেখে তিনি শিল্পকে রীতিমতো জীবনের ধর্ম বানিয়ে ফেলেন। ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট-এ ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন

প্রাথমিকভাবে মৃণাল কাদা, মার্বেল, টেরাকোটা, কাঠ, ব্রোঞ্জ, সিমেন্ট, এবং প্লাস্টার কাজে পারদর্শী ছিলেন পরে তিনি শিল্পের পরিসর বাড়িয়ে নেন: মজাইক, ঢালাই লোহার কাজ এবং পুনঃব্যবহৃত রিকশা চেইন থেকে শিল্পকর্ম তৈরি করতেও পারদর্শিতা অর্জন করেন।

১৯৯৫ সালে মৃণাল আমেরিকাতে পাড়ি জমান এবং সেখানে তার প্রথম কাজ শুরু করেন। নিউইয়ার্ক সিটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসে তার প্রথম প্রদর্শনী প্রদর্শিত হয়।  তিনি নিউইয়ার্কে এত বেশি কাজ করেন যে, নিউইয়ার্কের সরকারি টিভি চ্যানেলে তার একটি সাক্ষাৎকার ২৬ বার এবং সিএনএন চ্যানেলে ১৮ বার প্রচারিত হয়।

এছাড়া জাপান, ফ্রান্স, চীন, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়। বাংলাদেশের একক প্রদর্শনী সংখ্যা ছিল পাঁচ থেকে সাতটির মতো

কিন্তু নিউইয়র্কের ব্যস্ত শহরে মূর্তিগুলো গ্যালারিতে প্রদর্শিত হতো, কিন্তু তার মন টানতো খোলা আকাশ, জনতার চোখ। তাই ২০০২ সালে তিনি দেশে ফিরে এলেন—ঢাকার রাজপথকে শিল্পের ক্যানভাস বানাতে। ২০০২ সালে মৃণাল দেশে ফিরে আসেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। একই বছর তিনি নিজ উদ্যোগে নির্মাণ করেন মতিঝিলের বক ভাষ্কর্যটি । ২০০৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে নির্মিত গোল্ডেন জুবিলী টাওয়ার তারই শিল্পকর্ম।


তিনি বলতেন, “শিল্প গ্যালারিতে বন্দি থাকবে কেন? যে মানুষ রিকশা চালায়, তাকেও তো শিল্প স্পর্শ করতে পারে।”


তাই দেখা গেল—মিন্টু রোডে স্থাপিত হলো ‘রাজসিক বিহার’—একটি ঘোড়ার গাড়ি, যেন ঢাকার চারশো বছরের ঐতিহ্য পেছনে না থেকে সামনে ছুটে চলেছে। তারই ধারাবাহিকতায় তৈরি হলো ‘জননী ও গর্বিত বর্ণমালা’, ‘ইস্পাতের কান্না’, ‘কোতোয়াল’, ‘অপ্রতিরোধ্য চাটমোহর’সহ অসংখ্য ভাস্কর্য।

রাজসিক বিহার (Rajosik Bihar)

এটি ঢাকার পরিবাগে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ ও মিন্টু রোডের সংযোগস্থলের সড়কদ্বীপে শেরাটন হোটেলের সামনে horse‑drawn carriage‑এর মূর্তি “Rajosik” স্থাপন করেন ২০০৮ সালে ঢাকা ৪০০‑বছর পূর্তি উপলক্ষে। এটির মূল পটভূমি নবাব-জমিদারদের পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকা শহরের রাজসিক ভ্রমণ। ভাস্কর্যে নবাব সলিমুল্লাহ স্ত্রী, ছেলে এবং পেয়াদাসহ এমনই এক বিহারে বেরিয়েছেন শহর দেখতে। এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল।

ভাস্কর্য মানেই কংক্রিট না—মনে করা তাঁর কাজ

মৃণাল হক শুধু গড়তেন ভাস্কর্য না, গড়তেন গল্প। তিনি যখন প্লাস্টার বা ব্রোঞ্জ নিয়ে কাজ করতেন, তখনও ভাবতেন—“এই শহরের মানুষজন কীভাবে দেখবে এটাকে? স্পর্শ করবে? অনুভব করবে?”
তার ভাস্কর্য মানে শুধু একটি শৈল্পিক কাঠামো না—তা হয়ে উঠতো প্রশ্ন, প্রতিবাদ, বা কখনো নীরব ভালোবাসা।

ধানমন্ডি‑২৭ নম্বর সড়কের মোড়ে রিকশা চেইন ও লোহার অংশ দিয়ে গড়া মানবকন্ঠের কান্নার প্রতীকী ভাস্কর্য, ইস্পাতের কান্না (Ispater Kanna) যা শিল্পীর উদ্ভাবনী দক্ষতার নিদর্শন।
কখনো বা মাতৃভাষার স্মৃতিতে তুলে ধরতেন এক জননীর বুকফাটা যন্ত্রণা।

Golden Jubilee Tower

সুবর্ণ জয়ন্তী টাওয়ার বা গোল্ডেন জুবিলী টাওয়ার 

মৃণাল হক ইস্পাত ও লোহা দিয়ে সুবর্ণ জয়ন্তী টাওয়ার তৈরী করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ২০০৩ সালে ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়। এই ইস্পাত নির্মিত স্থাপনার উচ্চতা ৩৫ ফুট।

সুবর্ণ জয়ন্তী টাওয়ার বা গোল্ডেন জুবিলী টাওয়ার x bfa x fxyz x

মৃণাল হকের উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য

সুবর্ণ জয়ন্তী টাওয়ার বা গোল্ডেন জুবিলী টাওয়ার 

বাংলাদেশের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে অগ্রণী ব্যাংকের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। মৃণাল হক ইস্পাত ও লোহা দিয়ে সুবর্ণ জয়ন্তী টাওয়ার তৈরী করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ২০০৩ সালে ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়। এই ইস্পাত নির্মিত স্থাপনার উচ্চতা ৩৫ ফুট।


রাজসিক বিহার (Rajosik Bihar)
এটি ঢাকার পরিবাগে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ ও মিন্টু রোডের সংযোগস্থলের সড়কদ্বীপে শেরাটন হোটেলের সামনে horse‑drawn carriage‑এর মূর্তি “Rajosik” স্থাপন করেন ২০০৮ সালে ঢাকা ৪০০‑বছর পূর্তি উপলক্ষে। এটির মূল পটভূমি নবাব-জমিদারদের পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকা শহরের রাজসিক ভ্রমণ। ভাস্কর্যে নবাব সলিমুল্লাহ স্ত্রী, ছেলে এবং পেয়াদাসহ এমনই এক বিহারে বেরিয়েছেন শহর দেখতে। এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল।


জননী ও গর্বিত বর্ণমালা
২০১৬ সালে কৃষ্টি ও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিতে তিনি পরিবাগ মোড়ে এই মায়ের কান্না ও শহীদ ছেলের মৃতদেহ তুলে ধরেন ১৬ ফুট উচ্চতায়। এতে লাল–সবুজ বর্ণচিহ্ন ও বাংলা বর্ণমালার প্রতীক দেখানো হয়েছে

কোতোয়াল
ইস্কাটন এলাকার পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে দুই জন ঘোড়ায় চড়ে কোটওয়ালকে নিয়োজিত দেখানো হয়; এটি প্রাচীন পুলিশ ব্যবস্থার স্মৃতিফলক

ইস্পাতের কান্না (Ispater Kanna)
ধানমন্ডি‑২৭ নম্বর সড়কের মোড়ে রিকশা চেইন ও লোহার অংশ দিয়ে গড়া মানবকন্ঠের কান্নার প্রতীকী ভাস্কর্য, যা শিল্পীর উদ্ভাবনী দক্ষতার নিদর্শন

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য:
‘বলাকা’ (মতিঝিল), ‘রত্নদ্বীপ’ (প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়), ‘অতলান্তিকে বসতি’ (নৌবাহিনী সদর দপ্তর), ‘প্রত্যাশা’, ‘অপ্রতিরোধ্য চাটমোহর’ ইত্যাদি


সুপ্রিম কোর্ট-এর সামনে ‘Lady Justice’ অনুকরণে তৈরি ভাস্কর্য ধর্মীয় কিছু গোষ্ঠীর বিরোধের মুখে পড়ে এবং পরে সরিয়ে নেওয়া হয়— পরবর্তিতে সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনে লেডি জাস্টিসের ভাস্কর্য পুনঃস্থাপন করা হয়। এই বিতর্ক শিল্প ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি উভয়েরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে

শিল্পীর শেষ অধ্যায়

২০২০ সালের ২২ আগস্ট, গুলশানের নিজের বাসায় নিঃশব্দে থেমে যায় এক শিল্পীর জীবন। (অকালেই মৃত্যুবরণ করেন ৬২ বছর বয়সে)। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ডায়াবেটিসসহ নানা সমস্যা ভুগছিলেন; করোনাকালীন সময়ে অক্সিজেন স্বল্পতায় তার মৃত্যু হয়। শহরটা হঠাৎ যেন একটু ফাঁকা হয়ে যায়। যেন ঢাকার রাজপথের শিল্পী আর হাঁটছেন না, কিন্তু তার ছায়া রয়ে গেছে—ঘোড়ার চাকার শব্দে, মায়ের কান্নায়, বা বর্ণমালার ঠাস বুকে।

মৃণাল হক ছিলেন এমন একজন, যিনি ঢাকাকে শুধু ইট-কাঠের শহর বানিয়ে রাখেননি। তিনি এর শরীরে শিল্পের রঙ ছুঁয়ে দিয়েছিলেন। আমরা যারা প্রতিদিন ব্যস্ত হই, ক্লান্ত হই, সেই শহরের একেকটা মোড় আমাদের আবার থামিয়ে দেয়—আমরা তাকাই, বিস্ময়ে, ভালোবাসায়।
সেই বিস্ময়ের ভিতরেই আছেন মৃণাল হক।


তথ্যসূত্র:

  1. মৃণাল হক: এক স্বপ্নগাথার ভাস্কর – দ্য ডেইলি স্টার
  2. খ্যাতনামা ভাস্কর মৃণাল হক আর নেই – ঢাকা ট্রিবিউন
  3. ভাস্কর মৃণাল হকের মৃত্যু – নিউ এইজ
  4. Mrinal Haque (sculptor) – উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)
  5. ভাস্কর মৃণাল হক | RTV সাক্ষাৎকার
  6. মৃণাল হকের ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনার প্রতিবাদ – প্রথম আলো
  7. স্থানীয় পর্যবেক্ষণ: মৃণাল হকের স্থাপনাগুলোর সরেজমিন পরিদর্শন ও নোটস।


BFA

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial