মহরম

Muḥarram is the first month of the Islamic calendar

মহরম | একাধারে পুণ্য অর্জনের ও শোকপালনের দিন

পবিত্র কোরানে বলা হয়েছে, এই আশুরার দিনেই কেয়ামত অনুষ্ঠিত হবে

হিজরি অব্দের প্রথম মাস মহরম। এই মাসের ১০ তারিখে  সমগ্র বিশ্বের মুসলিমরা  ‘আশুরা’ পালন করে থাকেন। মহরম, একাধারে পুণ্য অর্জনের ও শোকপালনের দিন। আরবিতে ‘আশুরা বা ’আশরা’ অর্থ ‘দশ’। মহরম মাসের ১০ তারিখটি  বিভিন্ন কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।  ধর্মমতে মহরম মাসের ১০ তারিখে আল্লাহ্‌তালা আসমান-জমিন, বেহেস্ত-দোজখ, চন্দ্র-সূর্য, সহ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছিলেন।  পবিত্র কোরানে বলা হয়েছে, এই আশুরার দিনেই কেয়ামত অনুষ্ঠিত হবে

ইসলামের ইতিহাস অনুসারে এ দিনটি যে সব কারনে গুরুত্বপূর্ণ  :

এই দিনে পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়েছে

১০ই মহররম আল্লাহ নবীদেরকে স্ব স্ব শত্রুর হাত থেকে আশ্রয় প্রদান করেছেন 

এই দিনে নবী মুসা (আঃ) এর শত্রু ফেরাউনকে নীল নদে ডুবিয়ে দেয়া হয়

হযরত নুহ (আঃ) এর নৈাকা ঝড়ের কবল হতে রক্ষা পেয়েছিল এবং তিনি জুদি পাহাড়ের নোঙ্গর ফেলেছিলেন এই দিনেই

এই দিনে হযরত দাউদ (আঃ) এর তওবা কবুল হয়েছিল

নমরুদের কবল থেকে হযরত ঈব্রাহীম (আঃ) উদ্ধার পেয়েছিলেন

হযরত আইয়ুব (আঃ) দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত ও সুস্থতা লাভ করেছিলেন

এদিনে হযরত ঈসা (আঃ) কে আল্লাহ তায়ালা উর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন

পরবর্তীতে এর সাথে যুক্ত হয়েছে কারবালার ঘটনা। হিজ্জরি ৬১ অব্দে ১০ মহরম রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর  আদরের দৌহিত্র, হযরত ফাতেমা (রাঃ)এর  পুত্র হযরত কারবালা প্রান্তরে এজিদের সঙ্গে যুদ্ধে শহিদ হয়েছিলেন।

কারবালার সেই মর্মান্তিক দৃশ্য  ।  ইসলামের ইতিহাসে এ এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।

হিজরী ৬০ সনে পিতা খলিফা মাবিয়ার  মৃত্যুর পর ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া নিজেকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসাবে ঘোষণা করে । শাসক হিসেবে তিনি ছিলেন স্বেচ্ছাচারী ও অত্যাচারী। সে এমনই পথভ্রষ্ট ছিল সে ইসলামে চিরতরে নিষিদ্ধ মধ্যপানকে সে বৈধ ঘোষণা করেছিল । অধিকন্তু সে একই সাথে দুই সহোদরাকে বিবাহ করাকেও বৈধ ঘোষণা করেছিল ।  এ সকল কারণে হযরত হোসাইন (রাঃ) শাসক হিসেবে ইয়াজিদকে মান্য করতে অস্বীকৃতি জানান এবং  ইসলামের সংস্কারের লক্ষ্যে পরিবার-পরিজন ও অনুগামীদের নিয়ে  মদীনা ছেড়ে মক্কা চলে আসেন ।

এই সময় ইরাকের অধিবাসীরা এজিদ ও ইরাকের শাসনকর্তা অবায়দুল্লার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বার বার হুসেনকে ইরাক যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে থাকে। ইরাকিদের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রেখে হুসেন সকলকে নিয়ে ইরাকের উদ্দেশে রওনা দিলেন। এ দিকে তখন এজিদের অধীনস্থ ইরাকের শাসনকর্তা হুসেনের অনুগামী মুসলিমদের খুঁজে বের করে হত্যা করতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় ইরাকিরা হুসেনকে খলিফা হিসেবে পেতে চাইলেও প্রাণভয়ে কেউ হুসেনের পাশে দাঁড়ানোর সাহস দেখাল না। এই সুযোগে ওবায়দুল্লা চার হাজার সৈন্য কারবালার প্রান্তরে দলবল সমেত হুসেনকে ঘিরে ফেলে ফেরাত নদীতে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল। পানি ছাড়া মানুষ কত ক্ষণ বাঁচবে? ছোট বাচ্চারা তৃষ্ণায় ছটফট করছে দেখে হুসেনের এক বিশ্বস্ত অনুগামী আব্বাস ফেরাত নদীতে পানি আনতে গেলেন। মশক ভরে পানি নিয়ে তিনি যখন শিবিরের উদ্দেশে দৌড়তে শুরু করেছেন, সেই সময় শত্রুপক্ষের তিরে তাঁর দুই হাত কাটা যায়। তিনি তখন মশকটি মুখে ধরে শিবিরের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন। শিবিরে যে তাঁর প্রিয় হজরতের সন্তানেরা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েছে। কিন্তু শিবিরে পৌঁছনোর আগেই বুকে তিরবিদ্ধ হয়ে শহিদ হয়ে গেলেন।

হুসেন এই অসহায় অবস্থায় বাধ্য হয়ে অবায়দুল্লার কাছে প্রস্তাব পাঠালেন, হয় তাঁদের মদিনায় ফিরতে দেওয়া হোক, তা না হলে এজিদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে দেওয়া হোক। অবায়দুল্লা এই প্রস্তাবে রাজি হলেন না।

এ দিকে পানির জন্য শিশুরা বার বার জ্ঞান হারাচ্ছে। হুসেনের কোনও অনুরোধ উপরোধ শত্রুপক্ষ শুনতে চাইল না। হুসেন তাঁর ছ’মাসের শিশুপুত্র আলি আসগরকে বুকে নিয়ে ফিরাত নদীর দিকে রওনা দিলে, পিতার কোলেই তিরের আঘাতে আসগর প্রাণ হারায়। এই অবস্থায় হুসেন যখন তাঁবুর বাইরে বসে সন্তানশোকে বিলাপ করছিলেন, সেই সময় তিরবিদ্ধ হয়ে তিনি শহিদ হয়ে গেলে শত্রুপক্ষ তাঁর মাথা কেটে এজিদের কাছে পাঠিয়ে দেয়।

ইসলামের ইতিহাসে এ কলঙ্কজনক অধ্যায়  সারা বিশ্বের মুসলিমরা বেদনার অশ্রু দিয়ে হৃদয়ে লিখে রেখেছেন। তাই আসুরার এই দিন  বিভিন্ন জায়গায় তাজিয়া মিছিল বের করা হয়। এটা কোন রকম শক্তি প্রদর্শন বা ভীতি প্রদর্শন উদ্দেশ্য নয়। এই মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা নিজেরা নিজেদের আঘাত করেন এবং তাদের বিশ্বাস নবী রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর  দৌহিত্র হোসাইনকে হত্যার সময় যে তিনি যে কষ্ট পেয়েছিলেন, তারাও নিজেদের পিঠে ছুরি মেরে সে কষ্ট অনুভবের চেষ্টা করেন। অশ্রুপাতের মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন।

যদিও এ ধরনের তাজিয়া মিছিল বা মাতম করার মত অনেক আচার ইসলামের মূল উৎস কুরআন ও সহিহ হাদীসে পাওয়া যায় না। বরং এগুলোর অনেকগুলোই বেদআত (নব উদ্ভাবিত কাজ) হিসেবে বিবেচিত। বরং এগুলো পরবর্তীকালে যোগ হওয়া লোকজ সংস্কৃতি ও আবেগঘন ধর্মীয় আচরণ, যা ইসলামের মূল আকিদা ও আমলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রকৃত মুসলিমের দায়িত্ব হচ্ছে হাদীস ও কুরআনের আলোকে সুন্নাহ মোতাবেক ধর্ম পালন করা।


করণীয় :

আশুরার দিন ইসলামী বিধানের আলোকে পালন করা উচিত – যেমন: রোজা রাখা, নফল সালাত, দোয়া করা।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে হুসাইন (র.)–এর মতো সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার আদর্শ গ্রহণ করাই প্রকৃত শিক্ষা।




তাজিয়া মিছিলের কিছু স্থিরচিত্র

আলোচিত্রী : সৌরভ চৌধুরী | সময়কাল : ২০১৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial