Haripada Pal প্রতিমা শিল্পী হরিপদ পাল x bfa x fxyz cover wp - Copy

বাংলার প্রতিমাশিল্প ও হরিপদ পালের শিল্পজীবন

Haripada Pal

প্রতিমা শিল্পী হরিপদ পাল

“আমি শুধু চাই, যতদিন হাত চলে, ততদিন যেন মাটির মাধ্যমে ঈশ্বরের অনুভূতি মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে পারি”— 

মৃৎশিল্পের আরেক ধারা:
প্রতিমা নির্মাণ

মাটি দিয়ে কিছু তৈরি করার অভ্যাস মানুষের বহু পুরোনো। দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন মেটাতে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, সরা, কলস ও নানা ধরনের পাত্র তৈরির মধ্য দিয়ে মৃৎশিল্পের চর্চা গড়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে এই কাজ শুধু প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মাটির পুতুল, খেলনা, অলংকার ও নানা ধরনের শৈল্পিক বস্তু তৈরির মধ্য দিয়ে মৃৎশিল্প পেয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

বাংলার মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কুমার ও পাল সম্প্রদায়ের দীর্ঘ কারুশিল্প-পরম্পরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা মাটি, জল ও আগুনকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করেছেন নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী থেকে শুরু করে নানা ধরনের শিল্পবস্তু। এই কাজের মধ্যেই গড়ে উঠেছে উপকরণ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা, হাতের দক্ষতা এবং নিজস্ব নির্মাণরীতি।

মাটি দিয়ে দেবদেবীর প্রতিমা নির্মাণ বাংলার মৃৎশিল্পের একটি স্বতন্ত্র ধারা। এখানে মাটি দেবদেবীর রূপ নির্মাণের প্রধান মাধ্যম। প্রতিমা তৈরির কাজে প্রয়োজন হয় কাঠামো নির্মাণ, খড় দিয়ে অবয়ব তৈরি, মাটির বিভিন্ন প্রলেপ দেওয়া, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গড়ন নির্ধারণ এবং সবশেষে রং ও সাজসজ্জার কাজ।

প্রতিমা নির্মাণের প্রতিটি ধাপে শিল্পীর অভিজ্ঞতা ও হাতের দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মুখের গড়ন, চোখের অভিব্যক্তি, হাতের ভঙ্গি এবং শরীরের অনুপাত একটি প্রতিমার স্বতন্ত্র রূপ তৈরি করে। 

দুর্গাপূজার প্রতিমা এই শিল্পধারার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। তবে প্রতিমাশিল্পীদের কাজ দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়। কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মী, বিশ্বকর্মা, মহাদেবসহ বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতিমা নির্মাণের মধ্য দিয়ে এই শিল্পের পরিসর তৈরি হয়েছে।

হরিপদ পাল: বংশপরম্পরায় একজন জাত শিল্পী

বাংলাদেশের প্রতিমাশিল্পের কথা বলতে গেলে হরিপদ পালের নাম আসে বিশেষভাবে। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি প্রতিমা নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত। ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার কুড়লিয়া গ্রামের একটি শিল্পী পরিবারে তাঁর জন্ম। দাদু ও বাবার কাজ দেখতে দেখতেই শৈশবে এই শিল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। পরে পারিবারিক পেশার ধারাবাহিকতায় নিজেও প্রতিমা নির্মাণে যুক্ত হন।

প্রতিমা নির্মাণের কাজে আরও অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তিনি কলকাতার কুমারটুলিতে কাজ শিখেছেন। সেখানকার শিল্পচর্চার অভিজ্ঞতা নিয়ে স্বাধীনতার আগে দেশে ফিরে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে নিজের কর্মশালা গড়ে তোলেন। তাঁর কর্মশালার নাম শিমুলিয়া ভাস্কর শিল্পালয়।

হরিপদ পালের
কাজের পরিসর

হরিপদ পালের কাজের পরিসর বাংলাদেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গেও পৌঁছেছে। তাঁর হাতে নির্মিত প্রতিমার মধ্যে দুর্গাপ্রতিমা বিশেষভাবে পরিচিত। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় মাটির বৈশিষ্ট্য বোঝা, প্রতিমার অবয়ব তৈরি এবং মুখাবয়বের সূক্ষ্মতা ফুটিয়ে তোলার দক্ষতা অর্জন করেছেন তিনি।

হরিপদ পালের প্রতিমা নির্মাণের কাজকে বুঝতে হলে নির্মাণের ধাপগুলো লক্ষ করা প্রয়োজন। প্রথমে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর খড় দিয়ে শরীরের প্রাথমিক অবয়ব গড়ে তোলা হয়। তার ওপর পর্যায়ক্রমে মাটির প্রলেপ দিয়ে শরীর, মুখ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আকৃতি তৈরি করা হয়। মাটির কাজ শেষ হলে আসে রং ও অন্যান্য সাজসজ্জার পালা।

এই প্রক্রিয়ায় প্রতিমার মুখাবয়ব নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। দেবদেবীর পরিচিত রূপ বজায় রেখেও মুখের অভিব্যক্তি ও শরীরের গড়নে শিল্পীর নিজস্ব দক্ষতা প্রকাশ পায়। হরিপদ পালের দীর্ঘদিনের চর্চা এই সূক্ষ্ম কাজের সঙ্গে যুক্ত।

তাঁর কাজের মাধ্যম মূলত মাটি ও খড়। তবে তিনি সিমেন্ট, প্লাস্টার ও ব্রোঞ্জের মতো উপকরণ দিয়েও ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন। দেবদেবীর প্রতিমার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য নির্মাণের অভিজ্ঞতা তাঁর কাজের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে।

হরিপদ পালের শিল্পচর্চা পূজার প্রতিমা নির্মাণের মধ্যেই থেমে থাকেনি। বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তির পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ভাস্কর্যও তৈরি করেছেন। তাঁর নির্মিত প্রতিমা ও ভাস্কর্য দেশের বিভিন্ন মন্দির এবং জাদুঘরে রয়েছে। তাঁর কাজের মধ্যে ধর্মীয় প্রয়োজনের জন্য নির্মিত প্রতিমা এবং স্বতন্ত্র ভাস্কর্য—দুই ধরনের শিল্পচর্চার পরিচয় পাওয়া যায়।



হরিপদ পালকে আজীবন সম্মাননা প্রদান

২০২৬ সালে  বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ (NCCB) ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে হরিপদ পালকে ক্রাফটস ভিলেজেস আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয় । প্রতিমাশিল্পে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা দেওয়া হয়।
সম্মাননা মঞ্চে তাঁর সেই আবেগময় উচ্চারণ— 

“আমি শুধু চাই, যতদিন হাত চলে, ততদিন যেন মাটির মাধ্যমে ঈশ্বরের অনুভূতি মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে পারি”—উপস্থিত সবাইকে বাকরুদ্ধ করেছিল।

টেপা পুতুল tepa putul craft of bangaldesh x bfa x fxyz

Tepa
putul

টেপা পুতুল

টেপা পুতুল চিরায়ত বাংলার একটি অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প, যা বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এই পুতুল তৈরির পদ্ধতিতে নরম এঁটেল মাটিকে হাতে টিপে টিপে বিভিন্ন আকারে পরিণত করা হয়, এজন্যই একে “টেপা পুতুল” বলা হয়। এই মাটির পুতুলগুলো সাধারণত আদিম এবং সরল ডিজাইনে তৈরি হয়, যেখানে প্রাণী, দেব-দেবী, পুরাণের চরিত্র, বা গ্রামের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিফলন দেখা যায়।


তথ্যসূত্র: এই নিবন্ধের তথ্যাবলী বিভিন্ন গবেষণা প্রবন্ধ, পত্রিকা প্রতিবেদন ও বিশ্বকোষ থেকে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে। বিশেষত উইকিপিডিয়া (bn.wikipedia.org), প্রথম আলো (prothomalo.com), দ্য ডেইলি স্টার (thedailystar.net), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (tbsnews.net) সহ দেশি-বিদেশি উৎস থেকে এবং অপেন এআই এর মাধ্যমে তথ্য নেওয়া হয়েছে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial