বায়োস্কোপ-BIOSCOPE-আমাদেরই-লোকজ-ঐতিহ্য-x-bfa-x-fxyz

বায়োস্কোপ | আমাদেরই লোকজ ঐতিহ্য। 

তবে জেন-জি দের কাছে বায়োস্কোপ হয়তো হাস্যকর এক বোকা বাক্স মনে হবে। কিন্তু বায়োস্কোপ মোটেও হাস্যকর কোনো বস্তু ছিল না

‘কী চমৎকার দেখা গেল এইবারেতে আইসা গেল, ঢাকার শহর দেখেন ভালো। কী চমৎকার দেখা গেল।’- এ সুর আর ছন্দের তালে তালে ধারা বিবরণী দিয়ে আর চড়কা আগাচ্ছে না। এগিয়ে যাচ্ছে নগর উন্নয়ন আর থেমে গেছে বাংলার আর এক ঐতিহ্য বায়োস্কোপ।

বায়োস্কোপের সঙ্গে বাঙালিকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। বিশেষ করে গ্রাম বাংলার জনপদে বেড়ে ওঠা মানুষকে তো বটেই। তবে জেন-জি দের কাছে বায়োস্কোপ হয়তো হাস্যকর এক বোকা বাক্স মনে হবে। কিন্তু বায়োস্কোপ মোটেও হাস্যকর কোনো বস্তু ছিল না, কিংবা ছিল না কোনো বোকা বাক্সও! এই বোকা বাক্সের ফুটো দিয়ে কাচের জানালায় চোখ রাখলে ছবি আর বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠত অজানা পৃথিবী। আর গ্রামের সেই ছোট শিশু বা কিশোরের কাছে সেটা এক নতুন পৃথিবী। জানতে পারত নতুন নতুন বিষয়ে। কারন ওই সময় হাতের নাগালে ছিলো না টিভি, ইন্টারনেট কিংবা স্মার্ট ফোন। বায়োস্কোপ, বাংলাদেশের চিরচেনা হারিয়ে যাওয়া একটি লোকজ ঐতিহ্যের নাম যা এক সময় ছিল গ্রাম বাংলার শিশুদের চিত্ত বিনোদনের মাধ্যম।

BIOSCOPE

বায়োস্কোপ

বায়োস্কোপ মূলত কাঠ ও টিনের তৈরি একটি কাঠের বাক্স, যার ৬টি আয়না যুক্ত চোখ বা ছিদ্র থাকে । বায়োস্কোপওয়ালা এক হাতে হাতে খঞ্জনি বাজিয়ে অন্য হাতে চড়কা ঘুরাতে থাকে আর গানের তালে তালে পাল্পাতে থাকে বাক্সের ভেতর ছবি। বাক্সের আয়নাতে চোখে লাগিয়ে গানের তালে ছবি দেখার মাধ্যম হলো বায়োস্কোপ। বায়োস্কোপে সর্বোচ্চ ৬ জন একসাথে একটি প্রদর্শনী উপভোগ করতে পারেন। রিল হিসেবে টিকেট মূল্য নির্ধারিত হয়। প্রদর্শনীর সময়সীমা অনুযায়ী টিকেট মূল্য কম-বেশিও হয়ে থাকে। আবার শহর অঞ্চল-গ্রামাঞ্চল ভেদে প্রদর্শনী মূল্যের তারতম্য আছে। যদিও আগে চালের বিনিময় মূল্য দেয়া হতো।

কাঠের বাক্সে করে আর্ট কাগজের মাধ্যমে লোকজীবন চিত্র প্রদর্শণ ও বিনোদনের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম এটি। প্রকৃতপক্ষে বায়োস্কোপ সেই সময়ে গ্রাম বাংলার সিনেমা হল। রং-বেরঙের কাপড় পরে, হাতে ঝুনঝুনি বাজিয়ে বিভিন্ন রকমের ধারা বর্ণনা করতে করতে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মত করে গ্রামে গ্রামে ঘুড়ে বেরাতো সেই সিনেমা হল অর্থ্যাত বায়োস্কোপওয়ালা। আর তার পেছন পেছন নিয়ে দৌড়াত গ্রামের ছেলেমেয়েরা। বায়োস্কোপওয়ালার এমন ছন্দময় ধারা বর্ণনায় আকর্ষিত হয়ে ঘর ছেড়ে গ্রামের নারী পুরুষ ছুটে আসত বায়োস্কোপের কাছে। একসঙ্গে সবাই ভিড় জমালেও চার কি ছয় জনের বেশি একসঙ্গে দেখতে পারত না। সিনেমা হলের মতো এক শো এরপর নতুন করে ‘কি চমৎকার দেখা গেল’ বলে ফের শুরু করত বায়োস্কোপওয়ালার সেই ছড়াগান।

প্রদর্শনের বিষয়বস্তু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে বিভিন্ন প্রেম কাহিনী, তারপর যুদ্ধ, বিশ্বের দর্শনীয় স্থান, ধর্মীয় বিষয় ও রাষ্ট্রনায়কদের নিয়ে বায়োস্কোপ প্রদর্শন করা হয়। এজন্য তাদের অনেক বেশি জানতে হয়। তারপর সেটা প্রদর্শনের সময় এক এক করে ছন্দ মিলিয়ে বলতে হয়।

যেমন-

‘কী চমৎকার দেখা গেল এইবারেতে আইসা গেল, ঢাকার শহর দেখেন ভালো। এইবারেতে দেখেন ভালো, দেশ স্বাধীনের যুদ্ধ এলো, ভীষন যুদ্ধ বাইদ্ধা গেছে, দেখতে কতো বাহার আছে। শেখ মুজিবর হুঙ্কার দিছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হইছে। এইবারেতে দেখেন ভালো, শেখ হাসিনা সামনে আছে, ইন্দিরা গান্ধী পাশে আছে। কানের দুল দুলতে আছে, দেখতে কতো বাহার আছে’ . . .

কিংবা

মক্কা-মদিনা, আজমির শরীফ ও ক্ষুদিরামের ফাঁসি, আমেরিকার একশ’ তলা ভবন, টুইন টাওয়ার ধ্বংস, দার্জিলিংয়ের পাহাড়, সোনারগাঁয়ের পানাম নগর, ঈসাখাঁর জমিদার বাড়ি, যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু বর্ননা দিয়ে দিয়ে গ্রামীণ জনপদে শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষকে সমান তালে একদিকে যেমন আনন্দ দিয়ে যেত তেমন পরিচয় করিয়ে দেয়া হতো ঘটনাবলির সাথে।

ব্যান্ড : দলছুট (সঞ্জীব ও বাপ্পা)

তোমার বাড়ির রঙ্গের মেলায়
দেখেছিলাম বায়স্কোপ
বায়স্কোপের নেশায় আমায় ছাড়েনা।

ডাইনে তোমার চাচার বাড়ি
বায়ের দিকে পুকুরঘাট
সেই ভাবনায় বয়স আমার বাড়েনা।

বায়োস্কোপ প্রদর্শনী

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পূজা-পার্বণে, গ্রাম-গঞ্জে, হাটে, মেলায়, অনুষ্ঠান ছাড়াও পাড়া-মহল্লায় বায়োস্কোপ দেখানো হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিকায়নে বায়োস্কোপ এখন বিলীন। তবে পুরোনো স্মৃতি ধরে রাখতে এখনো কেউ কেউ বায়োস্কোপ দেখিয়ে বেড়ায়। উদ্যোক্তা মেলা, লোকশিল্প মেলা, কারুশিল্প মেলায় প্রায় সময় বায়োস্কোপ দেখানো লোকেদের ডাক পড়ে। তখন বর্তমান প্রজন্মের কেউ কেউ শখের বসে বায়োস্কোপ দেখে। আর প্রবীণরা খোঁজেন শৈশবের স্মৃতি।


আপনার একটি শেয়ার আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা


Tale of ABDUL JALIL MANDOL

একজন আবদুল জলিল মণ্ডল

টিভি আর আকাশ সংস্কৃতি স্যাটেলাইট ও স্মার্ট মোবাইলের সহজলভ্যতার কারণে আপনা-আপনিই উঠে গেছে বায়োস্কোপ। তবুও কোথাও না কোথাও একজন থাকে। তেমনি একজন আবদুল জলিল মণ্ডল।

রাজশাহী জেলার বাঘমারা থানার চায়ের শারা গ্রামের মৃত বকশি মণ্ডলের ছেলে জলিল মণ্ডল। বাবা বকশি মণ্ডল দীর্ঘ ৪৪ বছর এ পেশায় জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বাবার উত্তরসূরি হিসেবে ১২ বছর বয়সে জলিল মণ্ডল এ পেশায় আসেন। এরই মধ্যে এ পেশায় দীর্ঘ ৪০ বছর পার করে দিয়েছেন তিনি। একযুগ আগেও বায়োস্কোপের যে জৌলুস ছিল, প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় তা আজ বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু জলিল মণ্ডল আর আগের মতো অকেজো জিনিস হিসেবে ছুড়ে দেননি বায়োস্কোপকে। জড়িয়ে ধরে রেখেছেন সন্তানের মতো। অবশ্য তার বাবা ও দাদা যে বাক্সে বায়োস্কোপ দেখিয়েছেন সেটি নষ্ট হয়ে গেছে অনেক আগেই। তারপর নতুন করে বানিয়ে নেয়া এ বাক্সটি নিয়েই চলছে তার জীবন ও জীবিকা।

মানুষ এ বায়োস্কোপ না দেখলেও যখনই তার মনে চায়, তিনি গ্রামের সরু রাস্তা ধরে বায়োস্কোপ নিয়ে ছুটে চলেন। জলিল মণ্ডল জানেন বায়োস্কোপ এখন আর কেউ টাকা দিয়ে দেখবে না, তারপরও তিনি বায়োস্কোপ নিয়ে বের হয়ে পড়েন। জলিল মণ্ডলের এ বায়োস্কোপ দেখতে লাগে মাত্র ১০/২০ টাকা। তবু আধুনিক মাল্টি মিডিয়ার যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বায়োস্কোপেও ছবি পাল্টান, নতুনত্ব আনেন। চেষ্টা করেন দর্শকের মনোরঞ্জনের। এ পেশার আয় রোজগার দিয়েই ২ মেয়ে, ১ ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে কোনো রকমে তার দিন চলে যাচ্ছে।

আবদুল জলিল মণ্ডল যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর –
০১৭৯৪ ৯১২১৮৬
01794 912186

বায়োস্কোপ আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্য বহন করে। ইতিহাস ঐতিহ্যের পাতায় গ্রামীণ এই বায়োস্কোপের বেশ প্রশংসা থাকলেও কালের বিবর্তনে শুধুমাত্র পৃষ্ঠপোষকতার অভাব থাকায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ বিনোদনের অন্যতম এই মাধ্যম।


আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম লিংক


তথ্যসূত্র:

www.jugantor.com

sangbad.net.bd


December 9, 2025
pabna jora bangla mandir পাবনার জোড়বাংলা মন্দির x bfa x fxyz

পাবনার জোড়বাংলা মন্দির—এক ঐতিহাসিক স্থাপনা

fayze hassan
বাংলার জোড়বাংলা মন্দির বলতেই মনে আসে— দিনাজপুরের কান্তনগর/কান্তজীউ মন্দির, পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর জোড়বাংলা মন্দির। পাবনার এই মন্দির সেই ঐতিহ্যের…
December 9, 2025

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial