সাইদা খানম

Sayeeda Khanam was the first female professional photographer of Bangladesh.

সাইদা খানম : বাংলাদেশের আলোকচিত্রের ইতিহাসে যিনি এক অনস্বীকার্য অংশ

সালটা ১৯৫০!  এক কিশোরী  সবাইকে অবাক করে দিয়ে ক্যামেরা হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ঢাকা শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা ।  সে সময় মুসলিম পরিবারের নারীরা পড়াশোনা করার সুযোগই ঠিকমতো পেতেন না। বলছিলাম বাংলাদেশের প্রথম নরী আলোকচিত্রী সাইদা খানম এর কথা ।

যার শৈশব কেটেছে ইছামতির তীরে পাবনার মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে। পাবনার বাড়িতে জানালার পাশে শুয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে ভাবতেন, সব দৃশ্য কী চিরকালের জন্য ধরে রাখা যায় না?

এ রকম ভাবনা তাকে ক্যামেরায় ছবি তোলার বিষয়ে আগ্রহী করে তোলে। বারো বছর বয়স থেকে ছবি তোলা শুরু। তার জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর পাবনায় ।

ছবি তোলার প্রথম দিকে নিজের ক্যামেরা ছিল না। সামাজিক পরিবেশও ছিল মেয়েদের ছবি তোলার অন্তরায়। পর্দার কড়াকড়ি আর অবরোধ প্রথার মধ্যে ক্যামেরায় ছবি তোলা ছিল বিপজ্জনক। লুকিয়ে চুপিসারে বাড়ি থেকে বের হতেন তিনি। সখের ছবি তোলা বন্ধ হয়নি।

পেশাদার আলোকচিত্রী হয়ে ওঠার জন্য উৎসাহ পেয়েছেন বোনের কাছ থেকে পাওয়া প্রথম রোলিকর্ড ক্যামেরা থেকে । তখনকার সময় পেশাদাররা এই রোলিকর্ড ক্যামেরা ব্যবহার করতেন। সে কথা মনে করতে গিয়ে সাইদা খানম হাসতে হাসতে বলেন,

‘পেশাদার ক্যামেরাটা দেখলেই ভয় লাগতো ছোটবেলায়, আর সেই ক্যামেরাটাই আমার সারাজীবনের সাথী হল’।

সাইদা খানম : বাংলাদেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী

একবার এমন হল, তাদের বাসায় কাজকর্মে সাহায্য করত তার মতই এক কিশোরী। একদিন সেই কিশোরীর তোলার জন্য প্রস্তুতি নিলেন কিশোরী সাইদা খানম । সদ্যস্নাত বালিকার স্নিগ্ধ রূপ ছবিতে ফুটিয়ে তুলতে মেয়েটির মাথায় বালতির পানি ঢেলে ভিজিয়ে দিলেন। ছবিতে পানিতে ভেজা বালিকার অপরূপ রূপ লাবণ্য ফুটে উঠেছিল।  ছবিটি ‘বেগম’ পত্রিকায় ছাপা হিয়েছিল ।

পেছনের কিশোরীর ছবিটিই তাঁর তোলা প্রথম ছবি
‘বেগম’ পত্রিকায় ছাপা হওয়া সেই ছবিটির সামনে সাইদা খানম ; Image Source: কবির হোসেন

ইতিহাসের ছবি ধরে রাখার প্রত্যয়ে যে মানুষটি কাজ শুরু করেছিলেন, বাংলাদেশের আলোকচিত্রের ইতিহাসে তিনি এখন পরিণত হয়েছেন এক অনস্বীকার্য অংশে। আলোকচিত্রে অনন্য অবদানের জন্য সরকার ২০১৯ সালে শিল্পকলা শাখায় সাইদা খানমকে একুশে পদকে ভূষিত করেছেন । 

২০১৯ সালে শিল্পকলা শাখায় সাইদা খানমকে একুশে পদকে ভূষিত
২০১৯ সালে শিল্পকলা শাখায় সাইদা খানমকে একুশে পদকে ভূষিত

সাইদা খানম ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স করার পর ১৯৭২ সালে লাইব্রেরি সায়েন্সে আরেকটি মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করেছেন।

‘বেগম’ পত্রিকার  হিসেবে কাজ করেছেন ১৯৫৬ সাল থেকে।  ১৯৫৬ সালে তিনি প্রথম আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। এরপরে জাপান, ফ্রান্স, সুইডেন, পাকিস্তান, সাইপ্রাস প্রভৃতি দেশের আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে তার ছবি প্রদর্শিত হয়। ঢাকায় কয়েকবার একক ও দলীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন।  ১৯৭৩ সালে কলকাতায় ‘অল ইন্ডিয়া ফটো জার্নালিজম কনফারেন্সে’ বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। বিভিন্ন বছরে দিল্লী, কলকাতা, নিউইয়র্কে বিভিন্ন সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮২ সালে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ এশিয়ান গেমস-এ তিনি বেগম পত্রিকার প্রতিনিধিত্ব করেন।

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, শিল্প ও সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনের বহু বরেণ্য ব্যক্তিদের ছবি তোলার সুযোগ হয়েছে। তাদের সান্নিধ্য পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করেছেন ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, ইন্দিরা গান্ধী, রাণী এলিজাবেথ, মাদার তোরেসা, মার্শাল টিটো, জিয়াউর রহমান, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, কবি সুফিয়া কামাল, মৈত্রেয়ী দেবী, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, আশাপূর্ণা দেবী, উত্তম কুমার, অড্রে হেপবার্ন, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কণিকা বন্দোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চাঁদের দেশে প্রথম যারা নেমেছিলেন সেই নীল আর্মস্ট্রং, এ্যাড্রিয়ান অলড্রিন, মাইকেল কলিন্সের ছবিও তুলেছেন।

সাইদা খানম কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন অনেক দিন ধরে। ৮৩ বছর বয়সী  গুণী আলোকচিত্রী সাইদা খানম ১৮ আগষ্ট ২০২০ সোমবার রাত ৩টায় মৃত্যু বরন করেন । তার প্রতি রইল শ্রদ্ধা  


তথ্যসূত্র : https://www.jugantor.com/ https://bangla.bdnews24.com/ http://www.neonaloy.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial