KILIMS FROM BALKAN Fashion School knowing art x bfa x fxyz

বলকান কিলিম ও শতরঞ্জি: রং, নকশা ও বুননের গল্প

KILIMS FROM
BALKAN

বলছি কিলিমের কথা

আমাদের উত্তরবঙ্গের রংপুর আর হাজার হাজার মাইল দূরের দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান উপদ্বীপ। ভৌগোলিক দূরত্ব, জলবায়ু কিংবা সংস্কৃতির অনেক পার্থক্য। তবু এই দুই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের দিকে তাকালে চোখে পড়ে আশ্চর্য কিছু মিল। রঙের ব্যবহার, জ্যামিতিক নকশা, বুননের ধরন—অনেক ক্ষেত্রেই যেন একই শৈল্পিক ভাবনার প্রতিফলন। কারিগরি পদ্ধতিতে কিছু পার্থক্য থাকলেও, দুই অঞ্চলের এই হস্তশিল্প একই সুতোয় বাঁধা।

প্রথম দর্শনেই বলকানের কিলিম এবং রংপুরের শতরঞ্জির মধ্যে এক অদ্ভুত মিল চোখে পড়বে। উভয় শিল্পই প্রধানত মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার ও নান্দনিক চাহিদা থেকে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প। । সবচেয়ে বড় মিলটি হলো এদের টেকনিক্যাল বুনন পদ্ধতিতে—কিলিম এবং শতরঞ্জি দুটিই মূলত ফ্ল্যাট-ওয়েভ টেকনিকে তৈরি, যাতে কার্পেটের মতো কোনো নরম লোম বা পাইল থাকে না। রিভার্সিবল হওয়ায়  দুই পিঠই সমানভাবে ব্যবহার করা যায়  অর্থাৎ, এর পেছনের দিকে কোনো জট বা উল্টো পিঠ থাকে না।

শতরঞ্জি, রংপুরের ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প
শতরঞ্জি, রংপুরের ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প

বলকান কিলিমের
ইতিহাস ও উৎপত্তি

বলকান অঞ্চলে কিলিম বুননের ইতিহাস শতাব্দী প্রাচীন। প্রধানত ১৫ শতকে অটোমান সাম্রাজ্যের বিস্তার ও রাজনৈতিক সংযোগের মধ্য দিয়ে এই এলাকায় কার্পেট ও কিলিম শিল্পের ব্যাপক প্রচার ও বিস্তার ঘটে। অটোমানদের পার্সিয়ান-তুর্কি বুননশৈলী আর বলকানের স্থানীয় স্লাভিক সংস্কৃতির সংমিশ্রণে তৈরি হয় এক অনন্য আঞ্চলিক ধারা। বিশেষ করে সার্বিয়ার পিরোত , বুলগেরিয়ার চিপরোভতসি এবং বসনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল কিলিম বুননের ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তখনকার দিনে উপহার, রাজকীয় সম্মাননা, কিংবা শুভ বিবাহের যৌতুক হিসেবেও রাজপরিবার থেকে সাধারণ ঘরে এই কিলিমের কদর ছিল অপরিসীম।



কিলিমের বুননশৈলী

বলকান কিলিম তৈরিতে ঐতিহ্যগতভাবে স্থানীয় খাড়া তাঁত (vertical loom) ব্যবহার করা হয়। কিলিম বুননের মূল ভিত্তি হলো সুতার টানা-ভরনার সামঞ্জস্য। সাধারণ কার্পেটের মতো এতে আলাদাভাবে গিট দেয়া হয় না; বরং টানা বা বরনারর সুতাগুলোকেই একটির ওপর দিয়ে অন্যটি টেনে এমনভাবে শক্ত করে বোনা হয় যেন শক্ত সমতল তল তৈরি হয়। 

শতভাগ খাঁটি ভেড়ার উল থেকে তৈরি সুতা দিয়ে হাতে বোনা এই কিলিমগুলোর বুনন এতটাই ঘন হয় যে, এক বর্গমিটারের একটি কিলিম তৈরি করতে একজন অভিজ্ঞ কারিগরের কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। যদিও আমাদের রংপুর অঞ্চলের তাত গুলো সমতল বরাবর। 

কিলিমের নকশা এবং রঙের ব্যবহার

বলকান কিলিম ব্যবহৃত প্রতিটি জ্যামিতিক নকশা বা মোটিফের পেছনে একটি নির্দিষ্ট বার্তা লুকিয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, কোণাকুণি ‘রম্বস’ বা জ্যামিতিক নকশা প্রায়শই উর্বরতা ও পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো।  

কচ্ছপ বা পাখির প্রতিকৃতি দীর্ঘায়ু ও সুরক্ষার বার্তা বহন করত, আর বিশেষ কিছু কাঁটাযুক্ত বা প্রতিরক্ষামূলক জ্যামিতিক চিহ্ন বোনা হতো পরিবারকে অমঙ্গল বা ক্ষতিকর চোখ থেকে মুক্ত রাখার জন্য।

রঙের ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুই অঞ্চলের প্রাধান্য পায় গাঢ় লাল, নীল, কালো, এবং প্রাকৃতিক মাটির রং । ঐতিহ্যগতভাবে এই সুতাগুলো প্রাকৃতিক রং—যেমন গাছের ছাল, শিকড়, বুনো ফল ও পাতার ব্যবহার করা হতো।

SHOTRANJI শতরঞ্জি, রংপুরের ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প x bfa x fxyz web

শতরঞ্জি, রংপুরের ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প

শতরঞ্জি বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী কারুপণ্য। প্রায় ৭০০ বছরের প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে এই কারুপণ্যের। জানা যায়, রংপুর জেলার তাঁতিরা ৭০০ বছর আগে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে একধরনের মোটা কাপড় তৈরি করতেন যা ওই সময়ে অভিজাত শ্রেণির গৃহে বা খাজাঞ্চিখানায় বিশেষ আসন হিসেবে ব্যবহৃত হতো যা বিবর্তনের মধ্যো দিয়ে আজ রংপুরের শতরঞ্জি নামে পরিচিত।


তথ্যসূত্র: এই নিবন্ধের তথ্যাবলী বিভিন্ন গবেষণা প্রবন্ধ, পত্রিকা প্রতিবেদন ও বিশ্বকোষ থেকে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে। বিশেষত উইকিপিডিয়া (bn.wikipedia.org), প্রথম আলো (prothomalo.com), দ্য ডেইলি স্টার (thedailystar.net), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (tbsnews.net) সহ দেশি-বিদেশি উৎস থেকে এবং অপেন এআই এর মাধ্যমে তথ্য নেওয়া হয়েছে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial