Ikat textile ইকাত x bfa x fxyz

ইকাত: ‘পারফেক্টলি ইমপারফেক্ট’ নকশার পেছনের গল্প

Ikat

ইকাত

জানেন কি এমনও ইকাত আছে যা বুনতে  ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লেগে। তেমনই জেরিংসিং’ নামক এক ধরনের বিশেষ ডাবল ইকাত যা তৈরি হয় বালির তঙ্গানান (Tenganan) গ্রামে।

আরও একটা তথ্য হলো ভারতের (পাটোলা), জাপানের (তাতেসুরা) এবং বালির এই একটি গ্রাম ছাড়া পৃথিবীতে আর কোথাও ডাবল ইকাত তৈরি হয় না।

থাইল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ‘মুদমি সিল্ক’ কিংবা  উজবেকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী ‘আব্রবান্দি‘ , ওড়িশার ‘বান্ধা‘ বা সাম্বলপুরি ইকাত , গুজরাটের বিশ্ববিখ্যাত ‘পাটোলা‘ এবং অন্ধ্রপ্রদেশের ‘পোচম্পল্লী‘। আর  ইন্দোনেশিয়ায় ‘ইকাত’ সবই একই টেকনিকে তৈরি ইক্কাত। ইন্দোনেশিয়ায় একে সরাসরি ‘ইকাত’ বলা হয়, কারন ইন্দোনেশিয়া থেকে এই নামটির উৎপত্তি। 

ইকাত’ (Ikat) শব্দটি মূলত মালয়-ইন্দোনেশীয় ভাষা ‘mengikat’ (মেঙ্গিকাট) থেকে এসেছে, যার অর্থ “বাঁধা” (to tie বা bind)। অর্থাৎ সুতা বেঁধে রঙ করার এই পুরো প্রক্রিয়াটির নামই এসেছে এই ইন্দোনেশীয় থেকে! বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ওলন্দাজ (Dutch) গবেষকরা ইন্দোনেশিয়ার এই বুননশৈলী দেখে অভিভূত হয়ে বিশ্ব টেক্সটাইল ডিকশনারিতে ‘Ikat’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করেন। 

ইকাত ৩ ধরনের হয়

  
 ১. ওয়ার্প ইকাত (Warp Ikat) যা  কেবল টানার দিকে / লম্বালম্বি সুতায় রঙ করে নকশা তৈরি করা হয়।
২. ওয়েফ্ট ইকাত (Weft Ikat) যা ভরনার দিকে মানে  আড়াআড়ি সুতায় রঙ করা হয়।
৩. আর  ডাবল ইকাত (Double Ikat) যা ইকাতের সবচেয়ে জটিল ও বিরল রূপ! এখানে টানায় এবং ভরনায় উভয় দিকের সুতাকেই আলাদাভাবে মেপে রঙ করা হয় এবং তাঁতে নিখুঁতভাবে মিলিয়ে কাপড় বোনা হয়।

ইকাতের
বুননশৈলী

ইকাতের বুননশৈলী বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হবে, কাপড় বোনার আগে সুতা রঙ করার পদ্ধতি। সাধারণত কাপড়ে নকশা তোলার দুটি প্রচলিত পদ্ধতি রয়েছে। জামদানি বা কাতানের মতো কাপড় বোনার সময়ই নকশা তৈরি করা হয়। আবার অনেক কাপড় বোনার পর প্রিন্ট বা এমবেলিশমেন্টের মাধ্যমে নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়।

কিন্তু ইকাতের ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু আলাদা। এখানে কাপড় বোনার আগেই নকশা অনুযায়ী সুতা মেপে মেপে নির্দিষ্ট জায়গায় শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর সেই সুতার গোছাগুলো রঙে ডুবিয়ে নেওয়া হয়। সুতার যে অংশগুলো বাঁধা থাকে, সেখানে রং পৌঁছাতে পারে না। ফলে বাঁধা অংশগুলো রয়ে যায় আগের রঙে, আর বাকি অংশে বসে যায় রং। জটিল ও বহুরঙা নকশা তৈরি করতে এই বাঁধা ও রং করার প্রক্রিয়া একাধিকবার করা হয়।

রং করা সুতা শুকিয়ে নেওয়ার পর সেগুলো তাঁতে বসানো হয়। নকশা অনুযায়ী সুতাগুলো টানা কিংবা ভরনায় সাজিয়ে বোনা হয়। আর এভাবেই বুননের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কাপড়ে ফুটে ওঠে ইকাতের  নকশা।
ইকাত কাপড়ের দিকে তাকালে একটি বিষয় সহজেই চোখে পড়ে—এর নকশাগুলো সাধারণত খুব বেশি স্পষ্ট নয়। বরং নকশার প্রান্তে একধরনের আবছা, কোমল ও ঢেউখেলানো ভাব থাকে। সুতা বাঁধা, রং করা এবং তাঁতে বসানোর সময় সামান্য এদিক-ওদিক হওয়ার কারণে এমনটা হয়। আর  এই সামান্য অস্পষ্টতাই এর বিশেষ সৌন্দর্য। 

নিখুঁতভাবে তৈরি নকশার মধ্যেও যে স্বাভাবিক, কোমল একটা অসম্পূর্ণতা থাকে, সেটিই ইকাতকে অন্য বুননশৈলী থেকে আলাদা করে তোলে। টেক্সটাইল গবেষকদের মতে, এই ‘পারফেক্টলি ইমপারফেক্ট’ আবছা ভাবই আসল ইকাত চেনার সবচেয়ে বড় নিদর্শন এবং এর প্রধান সৌন্দর্য।



ইকাতের সহজ ও আধুনিক পদ্ধতি :

তবে ইকাত তৈরির একটি সহজ ও আধুনিক পদ্ধতিও রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ইকাতে প্রতিটি সুতা নকশা অনুযায়ী আলাদাভাবে বেঁধে রং করতে হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। তাই তুলনামূলক সহজ ও দ্রুত উপায়ে ইকাতের মতো নকশা তৈরি করার পদ্ধতিও চালু হয়েছে।

এই পদ্ধতিতে প্রথমে টানার সুতাগুলো একটি ফ্রেমে শক্ত করে টানটান করে সাজানো হয়। এরপর সুতা বাঁধার পরিবর্তে সরাসরি সুতার ওপর ব্লক বা ব্রাশের সাহায্যে রং লাগিয়ে নকশা তৈরি করা হয়। রং শুকিয়ে গেলে সুতাগুলো তাঁতে বসিয়ে কাপড় বোনা হয়। বুননের পর কাপড়ে ফুটে ওঠে ইকাতের মতো নকশা।

এই পদ্ধতিতে প্রতিটি সুতা আলাদাভাবে বেঁধে রং করার প্রয়োজন হয় না। ফলে সময় ও শ্রম দুটোই কম লাগে। উৎপাদন খরচও তুলনামূলক কম হওয়ায় অল্প সময়ে বেশি কাপড় তৈরি করা সম্ভব হয়।

এ ছাড়া ব্লক ও ব্রাশের সাহায্যে নকশা তৈরির সুযোগ থাকায় প্রচলিত ইকাতের পাশাপাশি নতুন নতুন জ্যামিতিক ও ফ্লোরাল মোটিফও ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে শাড়ি, স্কার্ফ, থ্রি-পিসসহ বিভিন্ন ফ্যাশন পোশাকে ইকাতের মতো নকশা তৈরিতে এই ব্লক-প্রিন্টেড ওয়ার্প পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রিন্টেড ইকাত: চিনবেন কীভাবে?

আজকাল ডিজিটাল এবং ম্যানুয়াল প্রিন্টিং প্রযুক্তির কল্যাণে মূল ইকাতের নকশা হুবহু কাপড়ের ওপর ছেপে তৈরি করা হচ্ছে ‘ইকাত প্রিন্ট’। দামে বেশ সাশ্রয়ী ও দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও অনেক।

কাপড়ের উল্টো পিঠে তাকালেই বুঝবেন—নকশাটি পেছনের দিকে অতটা স্পষ্ট নয় বা আবছা দেখায়।


তথ্যসূত্র: এই নিবন্ধের তথ্যাবলী বিভিন্ন গবেষণা প্রবন্ধ, পত্রিকা প্রতিবেদন ও বিশ্বকোষ থেকে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে। বিশেষত উইকিপিডিয়া সহ দেশি-বিদেশি উৎস থেকে এবং অপেন এআই এর মাধ্যমে তথ্য নেওয়া হয়েছে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial