বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের দ্বিতীয় প্রজন্মের চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে। তাঁর জন্ম ১৯৩২ সালে ১৭ আগস্ট ঢাকায়। স্বাভাবিকভাবেই এই দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতির অন্দরমহলে প্রবেশ ছিল তাঁর শৈশব থেকেই। অধ্যাপনা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। তার ক্যানভাসে বিষয় বদল করেছেন একের পর এক।
৮৯ তম জন্মদিন আজ | ২০২১
শুভ জন্মদিন

ক্যানভাস
বাংলাদেশে বিমূর্ত ধারার চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ মুর্তজা বশীরের ‘দেয়াল’, ‘শহীদ শিরোনাম’, ‘পাখা’, ‘রক্তাক্ত ২১শে’ শিরোনামের চিত্রকর্মগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পেইন্টিং ছাড়াও ম্যুরাল, ছাপচিত্রসহ চিত্রকলার বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। এছাড়া লিখেছেন বই এবং গবেষণা করেছেন মুদ্রা ও শিলালিপি নিয়েও।
শিল্পী মুর্তজা বশীর
পুরস্কার ও সম্মানণা
জাতীয় পুরস্কার (Prix National), চিত্রশিল্প উৎসব, ক্যাগনেস-সুর মের, ফ্রান্স (১৯৭৩)
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী কর্তৃক একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৫)
শ্রেষ্ঠ প্রচ্ছদ নকশা, জাতীয় বই কেন্দ্র, ঢাকা (১৯৭৬)
একুশে পদক (১৯৮০)
সুলতান পদক, নড়াইল (২০০৩)
স্টার লাইফটাইম পুরস্কার (২০১৬)
স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১৯)

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ ২০১৯.
ফটো জার্নালিস্ট মোহাম্মদ আসাদ এর ডায়েরি থেকে
১৯৯৮ সালের কথা। সকালে গিয়ে হাজির হলাম তাঁর বাসায়। ব্যক্তি মুর্তজা বশীর, শিল্পী বশীর সবই ধারণা দিলেন ছবি দেখিয়ে। অনেক সংগ্ররের সঙ্গে দেখালেন, প্রথম পড়েছেন সেই বইটি। আমি পুরনো ছবির এলবামটি থেকে ছবি তোলতে চাইলাম। রাজি হলেন, তবে তাঁর ভিনদেশী বান্ধবীর ছবি ব্যতিত। আমি তাই করলাম। অনেক গল্প হল, ঢাকা, ইতালি, চট্রগ্রাম আরো কত কি?
মুর্তজা বশীর চারুকলার দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র। সেই সময়ে এখানে পড়া শেষ করে উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার জন্য চলে গিয়েছিলেন ইতালি। মোটা দাগ দিয়ে বলে দিলেন ‘ইতালিতে যাওয়া হয়েছিল তাঁর বাবা’র টাকায়, স্কলারশীপে নয়’।

অনুরোধে দিলেন একটা ড্রইং করে। নানা বিষয়ে জ্ঞানের সমুদ্র, এই মানুষটির সামনে নিজেকে খুঁজে পেতাম না। তাই অনেক বছর দুরেই ছিলাম। দুরের থেকেও ছবি তুলেছি প্রতিনিয়ত।
২০১৩ সালে অসুস্থ্যতার পর স্যারের কাছকাছি যাওয়া। তারপর পরিবারের একজন হয়ে গেলাম।
চারুকলার প্রথম, দ্বিতীয় ব্যাচের শিল্পীদের মধ্যে মুর্তজা বশীরই বেঁচে আছেন। সম্ভবত তৃতীয় ব্যাচের শিল্পীরাও কেউ বেঁচে নাই। শুরু থেকে এখনও তিনি, দিনরাত হরহর করে ছবি আঁকেন ।
তাঁর প্রতিটি কাজে আছে চিন্তা ও গবেষণা। মুর্তজা বশীর ‘বিমূর্ত বাস্তবতা’ শিল্পধারার প্রবর্তক। তাঁর দুর্ভাগ্য এই দেশে জন্মেছেন। ইউরোপ-আমেরিকায় হলে এই শিল্পধারা নিয়ে হুলুস্তুর হয়ে যেত।
জীবনে যত ছবি এঁকেছেন, যত কাজ করেছেন। সেই বিষয়ের উপর আগে পড়াশোনা করেছেন, গবেষণা করেছেন, তারপর কাজ।
তাঁর শিল্পকর্ম, সংগ্রহ, লেখালেখি নিয়ে অনেকেই জানেন। চলচ্চিত্র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সেটাও জানে অনেকে। কিন্তু সেই চলচ্চিত্রে কি ছিল দেখেছেন কত জন?
মুর্তজা বশীর ‘নদী ও নারী’ সিনেমার চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন। এই সিনেমার ছিলেন সহকারী পরিচালক। লকডাউনে সিনেমাটি দেখলাম। গল্প-গাথুনিতে মুন্সিয়াণা আছে। পুরো সিনেমায় বাংলার রূপ তুলে এনেছেন। সিনেমাটি দেখে মনে হয়েছে তিনি সিনেমা করলেই ভালো করতেন। সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৬৫ সালে।
সকালে স্যারকে ফোন দিয়েছিলাম। ভালো আছেন। আল্লাহর মহত্ব নিয়ে কাজের গবেষণা চলছে। কোরআন শরীফের ৩০ পারা পড়ে নোট নিয়েছেন। কি ভাবে ক্যানভাসে আসবে সেটা নিয়ে চিন্তার শেষ করেছেন। এখন ক্যানভাসে উপস্থাপন বাকি। স্যার আরও কয়েকটা কাজ হাতে নিয়েছেন। প্রার্থনা করি ‘ কাজগুলো দ্রুতই সম্পূর্ণ হয়ে উঠুক’। (২৪ মে ২০২০ )
সংগ্রাহক : মোহাম্মদ আসাদ

আলোকচিত্র

শিল্পী মুর্তজা বশীর
আলোকচিত্রটি ১৯৯৮ সালে তোলা
আলোকচিত্রী : মোহাম্মদ আসাদ
Artist Facebook Id : Murtaja Baseer
লেখা : শিল্পী মুর্তজা বশীর এর মেয়ে মুনিরা বশীর
-এর ফেসবুক থেকে নেয়া
অভিজাত পরিবারের এক যুবকের সাথে অতি সাধারন ঘরের এক যুবতীর পথ চলার গল্প – পর্ব -১
মে মাস…আনন্দের…মে মাসে আমার বাবা আর আম্মার বিয়ে বার্ষিকী…আমার আর সুজাতের ও বিয়ে বার্ষিকী…
মে মাস…শোকের…আম্মার মৃত্যুবার্ষিকী…আনন্দ আর শোক… পাশাপাশি…এটাই জীবন…
মরার উপর খরার ঘা…এই আনন্দ আর শোকের মাসে করোনা ভাইরাসের কারনে গৃহবন্দী ঈদ উদযাপন… রোজার মাস আসলো…চলেও গেলো…ঈদ আসলো… চলেও গেলো… রান্না করলাম…কোনো কিছুই থেমে থাকলো না…আগামী বছর আবারও রোজার মাস আসবে…ঈদও হবে… রান্নাও হবে…শুধু আম্মা আর কোনো দিনও আসবেন না..
আম্মাকে ছাড়া চতুর্থ রোজার ঈদ…আমি সব সময় বলি কেন যে এই সব উৎসব-টুৎসব হয়…পুরানো সব স্মৃতি বড় কষ্ট দেয়…আগে আমাদের ঈদ ছিল আম্মার হাতের খোরমা দিয়ে দুধ সেমাই আর বেশী করে বাদাম কিশমিশ দেয়া শুকনো সেমাই… মাদ্রাজী মুরগী…পরোটা… গরুর ঝাল গোস্ত… টিকিয়া …এবারও এই সবই থাকবে…শুধু আম্মা থাকবেন না…চোখের পানি আটকিয়ে রেখে রান্না করবো বাবা… সুজাত…কুটটুর জন্য…
আম্মা…আপনি চলে গেছেন ৩ বছর…রক্তাক্ত হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আজও থামেনি…আজও থামেনি আপনার জন্য ফেলা দীর্ঘশ্বাস…আজও হাতড়ে বেড়াই আপনাকে আমার স্মৃতিতে…ভাবনাতে…অনেক কষ্ট আম্মা…
আমি সব সময়ই দোয়া করি, আল্লাহ যেন আমার আম্মার গুনাহগুলো মাফ করে ভালো কাজগুলোর মর্যাদা দেন…আর আমার যদি কোনো নেককাজ থাকে, এর প্রতিদানও যেন আল্লাহ আম্মাকে দান করেন… আল্লাহ আম্মাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করো…এ ঈদে আমরা পাবো না আমার আদরের সেজ চাচী, প্রিয় রহিম আংকেলকে…হে আল্লাহ তুমি তাদের জান্নাতুল ফেরদৌস দান করো…
আল্লাহ তুমি বড়ই ক্ষমাশীল…ক্ষমা করতে ভালোবাস…তাই আমাদেরকে ক্ষমা করে দিও…
আজকে একটা গল্প বলবো…অভিজাত পরিবারের এক যুবকের সাথে অতি সাধারন ঘরের এক যুবতীর বিয়ের গল্প…আজকে তাদের ৫৮তম বিয়ে বার্ষিকী…যুবক মুর্তজা বশীর আর যুবতী আমিনা খাতুন…
একসাথে তাদের পথ চলা শুরু ১৯৬২, ২৭শে মে…একসাথে পথ চলা শেষ হলো ২০১৭, ১৩ই মে… যুবতী হাত ছেড়ে চলে গেলো অনন্তলোকে…কিন্তু রেখে গেলো অনেক স্মৃতি…
মুর্তজা বশীর এর বাবা উপমহাদেশের প্রখ্যাত ভাষাবিদ জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ও মা মরগুবা খাতুন। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি সপ্তম পুত্র ও কনিষ্ঠ সন্তান। যে শিশুটি জন্ম নেয় ১৯৩২ সালের ১৭ই আগস্ট, বুধবার ঢাকায়। পিতৃপরিচয়েই তিনি খ্যাতিমান হতে পারতেন অনায়াসে। মুর্তজা বশীর সে পথে হাঁটেননি। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ নবজাতকের নাম রাখলেন আবুল খয়ের মুর্তজা বশীরুল্লাহ। পরে বাবার পরিচয়ে পরিচিত হবেন না বলেই তিনি নামের সামনের ও পেছনের অংশ ছেঁটে নাম ধারণ করলেন মুর্তজা বশীর।
জন্মের আগেই তাঁর একটি হাত মায়ের গর্ভবাস থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ফলে তাঁর মাকে দু’রাত খাটের স্ট্যান্ড ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। এজন্য মা বলতেন, তুই জন্মের আগেও জ্বালিয়েছিস, এখনো জ্বালাচ্ছিস। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ কে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন এতগুলো সন্তান জন্মদানের বিষয়ে। তিনি এর উত্তরে বলতেন, শেষেরটা যে জিনিয়াস হবে না, কে জানে?
বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব, একাধারে চিত্রকর, কবি, শিক্ষক, লেখক, চলচ্চিত্রনির্মাতা, শিল্পনির্দেশক, গবেষক ও মুদ্রাবিশারদ। এত পরিচয় নিয়েই মুর্তজা বশীর বাংলাদেশের শিল্পকলার আকাশে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র।
সেই নক্ষত্র পারিবারিক জীবনে বকুল নামে পরিচিত। ১৯৬১সালের শেষের দিকে চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর লাহোর থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫৯ এর ডিসেম্বরে চিত্র প্রদর্শনী করার জন্য তাকে লাহোরে নিয়ে গিয়েছিলেন খ্যাতিমান উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ। ঢাকায় আসার পর মুর্তজা বশীরের সাথে চিত্রশিল্পী দেবদাস চক্রবর্তীর মাধ্যমে আমিনা খাতুনের পরিবারের সাথে পরিচয় হয়। গ্রীন রোড এ দেবদাস চক্রবর্তীর বাসার উল্টো দিকের বাসায় আমিনা খাতুনের পরিবার বসবাস করতেন। দেবদাস চক্রবর্তীর বাসা থেকে মুর্তজা বশীর দূরবীন দিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলায়রত আমিনা খাতুনকে দেখতেন। ফর্সা, হালকা লালচে চুল, ধূসর সবুজ চোখের মনি দেখে এবং যখন তিনি জানলেন আমিনা খাতুন বিক্রমপুরের মেয়ে তখনি মনস্থির করলেন তাকেই বিয়ে করবেন। কেননা মুর্তজা বশীর ১০ম শ্রেনীতে পড়ার সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি পড়ে বিক্রমপুরের আঞ্চলিক ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন।
১৯৬২ সালে ২৭শে মে গাটছড়া বাঁধলেন ১৯৪০ সালের ৩০শে মার্চে কলকাতায় জন্ম নেয়া অতি সাধারণ পরিবারের মেয়ে আমিনা খাতুনের সঙ্গে। ১৯৬২ আমিনা খাতুন তখন মেট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। গ্রীন রোড এ আমার নানির বাসায় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নিজে তাকে আর্শীবাদ করতে গিয়েছিলেন। পারিবারিক জীবনে তিনি তুলু নামে পরিচিত ছিলেন। চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীরের হাত ধরে আমিনা বশীর হয়ে একান্নবতী অভিজাত পরিবারের ছোট বউ হয়ে আসলেন।
মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলায় কাহেতারা গ্রামে আমিনা খাতুনের পৈত্রিক নিবাস। পিতা গিয়াসউদ্দিন আহমেদ এবং মাতা করিমুননেসা বেগমের তিন পুত্র ও পাঁচ কন্যার মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। আমিনা খাতুনের পিতা গিয়াসউদ্দিন আহমেদ রেল কর্মকর্তা ছিলেন।তিনি ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রামে রেলওয়েতে যোগদান করেন। পিতার রেলওয়ের চাকরি সুবাদে তিনি চট্টগ্রামে ড. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন।
১৯৫২ সালে চট্টগ্রাম রেলওয়েতে কর্মরত অবস্থায় পিতার মৃত্যু হলে আমিনা খাতুনের মাতা করিমুননেসা বেগম নাবালিকা সন্তানদের নিয়ে তার বড় পুত্র (পরবর্তীকালে বিচারপতি নঈমুদ্দিন আহমেদ) এবং বড় কন্যার জামাতা মোশারফ হোসেন চৌধুরীর (পরবর্তীকালে ম্যানেজার সাভার ডেইরি ফার্ম) সহায়তায় ঢাকায় চলে আসেন এবং গ্রীন রোড এ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।দুজনের পারিবারিক অবস্থান উত্তর ও দক্ষিণ মেরু। মনের মেরুকরনেও একজন পূর্ব তো আরেকজন পশ্চিম। তারপরেও দুইজনের রসায়নে কোথায় যেন অব্যক্ত আবেগ, অব্যক্ত প্রেম ছিল যা তাদের একসাথে বেঁধে রেখেছিল ৫৫ বছর। কলকাতার শুদ্ধ উচচারণে কথা বলা মুর্তজা বশীর আর বিক্রমপুরের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা আমিনা বশীরের যুগলবন্দীতে একে অপরের প্রতি মমত্ববোধের অভাব ছিল না।
অ্যালবাম থেকে
ছবিসূত্র : মুনিরা বশীর এর ফেসবুক থেকে




















































